ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠায় কুরআনের শিক্ষা

Printed Edition
ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠায় কুরআনের শিক্ষা
ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠায় কুরআনের শিক্ষা

আকতার কামাল মহসিন

ইনসাফ বা ন্যায়বিচার ইসলামের মূল স্তম্ভগুলোর অন্যতম। কুরআনুল কারিম ইনসাফকে এমন এক অপরিহার্য নৈতিক ভিত্তি হিসেবে উপস্থাপন করেছে, যার মাধ্যমে সমাজে ভারসাম্য, শান্তি ও সৌহার্দ্য বজায় থাকে। ন্যায়ের অভাবে সমাজে অরাজকতা, অন্যায় ও বৈষম্য জন্ম নেয়। তাই ইনসাফ কেবল শাসকের দায়িত্ব নয়; বরং প্রতিটি মুসলমানের জন্য এটি ঈমানদারির প্রমাণ।

আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন- ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের আদেশ করেন, যে তোমরা আমানতসমূহ তাদের উপযুক্ত ব্যক্তির কাছে পৌঁছে দেবে, আর যখন মানুষের মাঝে বিচার করবে তখন ন্যায়ের সাথে বিচার করবে’ (সূরা নিসা-৫৮)। এ আয়াতে ইনসাফকে সরাসরি আল্লাহর নির্দেশ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে, অর্থাৎ এটি মুসলমানের উপর আবশ্যিক দায়িত্ব, কোনো ঐচ্ছিক কাজ নয়। আরেকটি আয়াতে আল্লাহ বলেন- ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা ন্যায়ের উপর কঠোরভাবে প্রতিষ্ঠিত থেকো, আল্লাহর জন্য সাক্ষ্য দাও, যদিও তা তোমাদের নিজেদের, বাবা-মা অথবা আত্মীয়-স্বজনের বিরুদ্ধে হয়’ (সূরা নিসা-১৩৫)। এই আয়াতে ইনসাফের এমন উচ্চতা বর্ণিত হয়েছে, যেখানে আত্মীয়তার টান বা ব্যক্তিগত স্বার্থও ন্যায়ের সামনে মূল্যহীন।

রাসূলুল্লাহ সা: ছিলেন ন্যায়ের জীবন্ত দৃষ্টান্ত। একবার এক সম্ভ্রান্ত কুরাইশি নারী চুরির অপরাধে অভিযুক্ত হলে, কিছু সাহাবি তার জন্য সুপারিশ করেন। তখন রাসূল সা: বলেছিলেন, ‘আল্লাহর শপথ! যদি আমার কন্যা ফাতিমাও চুরি করত, আমি তার হাত কেটে দিতাম’ (বুখারি-৩৪৭৫)। এই ঘোষণা কেবল আইনের কঠোরতা নয়; বরং ইনসাফের প্রতি রাসূলের অবিচল অবস্থানের প্রতিফলন। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ইসলামের সুবর্ণ যুগে ইনসাফ কেবল আদর্শ নয়, বাস্তব জীবনেও পরিপূর্ণরূপে প্রতিষ্ঠিত ছিল। খলিফা হজরত ওমর রা:-এর শাসনামলে এক বিধবার গরুর বাচ্চা হারিয়ে গেলে তিনি নিজে কাঁধে তুলে তা ফিরিয়ে দেন এমন মানবিক দৃশ্য কোনো সাধারণ প্রশাসনের নয়; বরং ইনসাফনির্ভর এক শাসনব্যবস্থার প্রতিচ্ছবি।

আজকের পৃথিবীতে ইনসাফ একটি প্রতীক্ষিত আদর্শে পরিণত হয়েছে। দুঃখজনক হলেও সত্য, মুসলিম সমাজ, রাষ্ট্র, বিচারব্যবস্থা এমনকি পারিবারিক জীবনে ইনসাফ অনেকাংশেই অনুপস্থিত। এর ফলেই আমরা আজ জুলুম, বৈষম্য ও অবিচারের ভয়াবহ পরিণতি প্রত্যক্ষ করছি।

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন কুরআনের ইনসাফভিত্তিক শিক্ষাকে জীবনের প্রতিটি স্তরে বাস্তবায়ন করা। ইসলাম কেবল রিচুয়ালভিত্তিক ধর্ম নয় এটি মানবতার মুক্তির বার্তা, যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ইনসাফ। আমাদের দায়িত্ব হলো নিজেদের চরিত্রে ন্যায়ের অনুশীলন এবং সমাজে তার বাস্তব দৃষ্টান্ত স্থাপন করা।

লেখক : স্টাফ, চট্টগ্রাম ইন্টারন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ