এবার চোখ অসি প্রোটিয়াদের দিকে

Printed Edition

ক্রীড়া প্রতিবেদক

পাকিস্তানের বিপে দেশের মাটিতে এবং তাদের ঘরের মাঠে টেস্ট সিরিজ জয়ের অর্জন বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়। এই সাফল্য কেবল দু’টি ম্যাচ জয়ের গল্প নয়, এটি আত্মবিশ্বাস, মানসিক দৃঢ়তা এবং দীর্ঘদিনের পরিশ্রমের প্রতিফলন। একসময় যে দল বিদেশের মাটিতে টেস্ট খেলতে নামলেই চাপে পড়ে যেত, সেই বাংলাদেশ এখন প্রতিপরে চোখে চোখ রেখে লড়তে শিখেছে। পাকিস্তানকে ধবলধোলাই করে টাইগাররা বুঝিয়ে দিয়েছে, তারা আর শুধু অংশগ্রহণ করতে মাঠে নামে না; জিততেও জানে।

এই অর্জন ভবিষ্যতের পথচলায় সবচেয়ে বড় প্রেরণা হয়ে উঠতে পারে। কারণ টেস্ট ক্রিকেটে ধারাবাহিকতা গড়তে হলে বড় দলগুলোর বিপে নিজেদের প্রমাণ করতেই হবে। এখন বাংলাদেশের ল্য হওয়া উচিত টেস্ট র‌্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ সারির দলগুলোকে চ্যালেঞ্জ জানানো। বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিন আফ্রিকার মতো শক্তিশালী প্রতিপরে বিপে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ক্রিকেট খেলাই হতে পারে পরবর্তী মিশন।

বর্তমান দলে পেস আক্রমণে গতি এসেছে, ব্যাটিংয়ে তৈরি হয়েছে ধৈর্য, আর স্পিন বিভাগও আগের মতো কার্যকর। তরুণদের সাথে অভিজ্ঞদের সমন্বয় বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। সবচেয়ে বড় কথা, ক্রিকেটারদের মধ্যে এখন জয়ের ক্ষুধা তৈরি হয়েছে। এই মানসিকতাই দলকে আরো ওপরে নিয়ে যেতে পারে।

তবে সামনে এগোতে হলে আত্মতুষ্টির কোনো সুযোগ নেই। পাকিস্তান সিরিজের সাফল্যকে ভিত্তি করে আরো পরিকল্পিত প্রস্তুতি, ঘরোয়া ক্রিকেটের উন্নয়ন এবং বিদেশের মাটিতে বেশি টেস্ট খেলার সুযোগ তৈরি করতে হবে। কারণ বড় দল হতে হলে বড় দলগুলোকেই নিয়মিত হারাতে হয়। পাকিস্তান অধ্যায় শেষ, এখন বাংলাদেশের চোখ হওয়া উচিত বিশ্ব টেস্ট ক্রিকেটের অভিজাত মঞ্চে নিজেদের স্থায়ী আসন গড়ে তোলার দিকে।

পাকিস্তান সিরিজ জয়ের পর একের পর এক সুখবর পাচ্ছে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে (২০২৫-২৭ চক্র) পয়েন্ট টেবিলে ভারতকে টপকে ৫ নম্বরে উঠে আসা, প্রথমবারের মতো আইসিসি র‌্যাঙ্কিংয়ে ৭ নম্বরে অবস্থান করা সবই নাজমুল হোসেন শান্ত, মেহেদী হাসান মিরাজ, লিটন দাস, মুশফিকুর রহীম, তাইজুল ইসলামদের দল হিসেবে পারফরম্যান্স করার ফসল।

৯-২১ জুন ঘরের মাঠে অস্ট্রেলিয়ার বিপে তিনটি করে ওয়ানডে ও টি-২০ খেলবে বাংলাদেশ। এক বছর ঘরের মাঠে সিরিজ খেলার পর জুলাইয়ে জিম্বাবুয়ে সফরে দুই টেস্ট ও ৫ ওয়ানডে খেলবে। আগস্টে অস্ট্রেলিয়ার মাঠে দুটি টেস্ট খেলবে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ-জিম্বাবুয়ে সিরিজ টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের অন্তর্ভুক্ত নয়। কারণ জিম্বাবুয়ে ৯ দলের মধ্যে নেই। তবে বাংলাদেশ-অস্ট্রেলিয়া সিরিজ টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের অন্তর্ভুক্ত।

এ বছরের নভেম্বরে দণি আফ্রিকায় দু’টি টেস্ট খেলতে যাবেন লিটন-মিরাজরা। দলের সহকারী কোচ গতকালই এইচপি চলে যাওয়া সালাউদ্দিন বলেন, ‘দেশের যতগুলা টেস্ট আছে, সেটাতে যেন আমরা না হারি। এটাও একটা ভালো ল্য হবে যদি আমরা এখানে সবগুলো টেস্ট ম্যাচ জিততে পারি এবং বাইরে যতগুলো সিরিজ আছে। যদিও প্রোটিয়াদের বিপক্ষে টাফ সিরিজ। এখান থেকে যদি আমরা দুই একটা টেস্ট জিততে পারি তাহলে হয়তো সেরা চারে থেকে শেষ করতে পারব।’

পাকিস্তানের বিপে সিলেট টেস্টে ১২৬ ও ৬৯ রানের ইনিংস খেলে লিটন হয়েছেন ম্যাচসেরা। ব্যাটিং করেছেন ৭৭.৬৮ স্ট্রাইকরেটে। সালাউদ্দিন বলেন, ‘দলের চাহিদা অনুযায়ী সে (লিটন) খেলেছে। দেখুন তারা অনেক পরিণত। তাদেরকে আসলে খুব বেশি শেখানোর কিছু নেই। আমার মনে হয় যে লিটন যেটা খেলেছে, তার নিজের ডিসিশনে খেলেছে।’

নাহিদ রানা প্রতিপকে নিয়মিত কাঁপিয়ে দিচ্ছেন। পাকিস্তানের বিপে দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজে নিয়েছেন ১১ উইকেট। ঘণ্টায় ১৫০ কিলোমিটার গতি পর্যন্ত তুলেছেন তিনি। কখনো কখনো গতি ও লেংথের পরিবর্তন করে উইকেট পেয়েছেন। রানার প্রশংসায় পঞ্চমুখ পাকিস্তানের ওয়াসিম আকরাম, বাসিত আলী, ওয়াকার ইউনিসরা। রানাকে নিয়ে সালাউদ্দিন বলেন, ‘ভালো করছে। ভবিষ্যতে ভালো করার সুযোগ আছে আরো।’

২০২৪ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশ জাতীয় দলের সিনিয়র সহকারী কোচের দায়িত্বে এসেছিলেন সালাউদ্দিন। দীর্ঘ ১৮ মাস অনেক উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে তাকে। বিশেষ করে ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে হিসাব করলে এখন পর্যন্ত ওয়েস্ট ইন্ডিজ, পাকিস্তান, নিউজিল্যান্ডের বিপে টানা তিনটি ওয়ানডে সিরিজ জিতেছে বাংলাদেশ। আর ২০২৪ সাল থেকে শুরু করে পাকিস্তানের বিপে এখন পর্যন্ত টানা চার টেস্ট জিতেছে বাংলাদেশ।

বোনাসের টাকা সুইমিং পুল ও জিমে

টেস্ট র‌্যাঙ্কিংয়ের ওপরের সারির দল পাকিস্তানকে হোয়াইটওয়াশ করায় ক্রিকেটারদের মোটা অঙ্কের বোনাস পাওয়ার কথা ছিল। তবে সেই টাকা ব্যক্তিগতভাবে না নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সুবিধার কথা ভেবেছেন শান্ত-লিটনরা। তারা ক্রিকেটারদের প থেকে খুব চমৎকার একটা প্রস্তাব দিয়েছেন। সেরা সুযোগ-সুবিধা দিয়ে জিম আর সুইমিংপুল করার প্রস্তাব দিয়েছেন বিসিবি সভাপতি তামিম ইকবালের কাছে। তামিম জানান, ‘ভালো ও সুন্দর উদ্যোগ। ওদের বোনাসের টাকাতেই অবশ্য পুরো খরচ মিটবে না, বিসিবিকে আরো অনেক টাকা খরচ করতে হবে। তবে নিজেদের কথা না ভেবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এই ত্যাগ সত্যিই প্রশংসনীয়।’