গ্রাহক আস্থা ফিরছে ইসলামী ব্যাংকে

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দুই দিনে ৫ হাজার কোটি টাকার সহায়তা

দেশের বৃহত্তম শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির গ্রাহক আস্থা ফিরতে শুরু করেছে। চেয়ারম্যান নিয়োগকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিতর্ক, গ্রাহকদের আস্থাহীনতা এবং ব্যাপক আমানত উত্তোলনের ফলে তীব্র তারল্য সঙ্কটে পড়ে ব্যাংকটি। এমন পরিস্থিতিতে পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়ে নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ এবং পরপর দুই দিনে বাংলাদেশ ব্যাংকের পাঁচ হাজার কোটি টাকার তারল্য সহায়তা ব্যাংকটির পরিস্থিতিকে নতুন মোড়ে নিয়ে গেছে।

বিশেষ সংবাদদাতা
Printed Edition

দেশের বৃহত্তম শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির গ্রাহক আস্থা ফিরতে শুরু করেছে। চেয়ারম্যান নিয়োগকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিতর্ক, গ্রাহকদের আস্থাহীনতা এবং ব্যাপক আমানত উত্তোলনের ফলে তীব্র তারল্য সঙ্কটে পড়ে ব্যাংকটি। এমন পরিস্থিতিতে পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়ে নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ এবং পরপর দুই দিনে বাংলাদেশ ব্যাংকের পাঁচ হাজার কোটি টাকার তারল্য সহায়তা ব্যাংকটির পরিস্থিতিকে নতুন মোড়ে নিয়ে গেছে।

গতকাল সোমবার ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে যোগ দিয়ে নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ জহির হোসেন স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন- ইসলামী ব্যাংকের জন্য একটি সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ পরিচালনা পর্ষদ গঠন করা হবে। তিনি বলেন, ‘আমরা ইসলামী ব্যাংকে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ লোক দিয়ে বোর্ড গঠন করতে চাই। আমি সীমিত সময়ের জন্য চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করব।’ ইসলামী ব্যাংক জনগণের ব্যাংক। জনগণের ব্যাংক হিসেবেই থাকবে। নতুন চেয়ারম্যানও গ্রাহকদের উদ্দেশে আশ্বস্ত করে বলেছেন, ব্যাংকের সব ধরনের লেনদেন ও সেবা স্বাভাবিক এবং নিরবচ্ছিন্ন থাকবে। তিনি গ্রাহকদের কোনো ধরনের উদ্বেগ ছাড়াই নিয়মিত ব্যাংকিং কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান।

নতুন চেয়ারম্যানের এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এলো, যখন ব্যাংকটির গ্রাহক, কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং শেয়ারহোল্ডারদের একটি বড় অংশ ব্যাংকের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগে রয়েছেন। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ কর্মসূচি চলছিল। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ ছিল, বিতর্কিত ব্যক্তিদের ব্যাংকের শীর্ষ পদে বসানোর কারণে চলমান সংস্কার কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

সঙ্কটের সূত্রপাত ঘটে গত ২৪ মে। ওই দিন ব্যাংকের চেয়ারম্যান অধ্যাপক এম. জুবায়দুর রহমান পদত্যাগ করেন এবং একই দিনে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর মো: খুরশীদ আলমকে চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। তবে এই নিয়োগের পরপরই ব্যাংকের ভেতরে ও বাইরে অসন্তোষ দেখা দেয়। পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যেতে থাকে। গ্রাহকদের একটি অংশ তাদের আমানত তুলে নিতে শুরু করেন। কয়েক দিনের মধ্যে ব্যাংকটিতে ব্যাপক অর্থ উত্তোলনের ঘটনা ঘটে, যা তারল্য পরিস্থিতিকে নাজুক করে তোলে। এ অবস্থায় আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষায় এবং ব্যাংকিং কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে হস্তক্ষেপ করে বাংলাদেশ ব্যাংক।

গত রোববার বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ৪৭(৩) ধারার ক্ষমতাবলে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যানসহ পুরো পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেয়। একই সাথে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ জহির হোসেনকে পরিচালনা পর্ষদে বসানো হয়। এর ফলে তিনি পরিচালনা পর্ষদের সব ধরনের ক্ষমতা প্রয়োগ এবং দায়িত্ব পালন শুরু করেছেন।

পরিস্থিতি সামাল দিতে বাংলাদেশ ব্যাংক পরপর দুই দিনে মোট পাঁচ হাজার কোটি টাকার তারল্য সহায়তা দিয়েছে ইসলামী ব্যাংককে। ব্যাংকটির ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো: আলতাফ হোসেন জানান, রোববার দুই হাজার ৫০০ কোটি টাকা এবং গতকাল সোমবার আরো দুই হাজার ৫০০ কোটি টাকা সহায়তা দেয়া হয়েছে। তবে আশার বিষয় হলো, প্রথম দফায় পাওয়া অর্থ এখনো ব্যবহার করতে হয়নি বলে জানিয়েছেন তিনি। তার ভাষ্য, ‘গ্রাহকদের মধ্যে আস্থা ফিরতে শুরু করেছে। একটি বড় শাখার তথ্য অনুযায়ী, আগের তুলনায় হিসাব বন্ধের সংখ্যা ৭৫ শতাংশ কমে গেছে।’

ব্যাংকটির কর্মকর্তাদের মতে, গ্রাহকদের মধ্যে আতঙ্ক ও গুজবের কারণে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছিল। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সরাসরি হস্তক্ষেপ, চেয়ারম্যান নিয়োগ এবং নিরপেক্ষ পরিচালনা পর্ষদ গঠনের উদ্যোগ আমানতকারীদের মধ্যে ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো একটি গ্রহণযোগ্য ও নিরপেক্ষ পরিচালনা পর্ষদ গঠন এবং সুশাসন নিশ্চিত করা। একই সাথে ব্যাংকটির আর্থিক অবস্থার স্বচ্ছতা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং গ্রাহকদের সাথে কার্যকর যোগাযোগ বাড়ানো প্রয়োজন। ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের অন্যতম বৃহৎ প্রতিষ্ঠান। কোটি কোটি গ্রাহক, বিশাল আমানতভিত্তি এবং দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের কারণে এই ব্যাংকের স্থিতিশীলতা শুধু এর গ্রাহকদের জন্য নয়, পুরো আর্থিক ব্যবস্থার জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।

বর্তমানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নজরদারি, চেয়ারম্যানের নেতৃত্ব এবং অতিরিক্ত তারল্য সহায়তার মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা চলছে। এখন দেখার বিষয়, নিরপেক্ষ বোর্ড গঠন ও সংস্কার কার্যক্রমের মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংক আবারো গ্রাহকদের পূর্ণ আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারে কি না। ব্যাংকটির ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছে আগামী কয়েক সপ্তাহের সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপের ওপর।