কচ্ছপ গতিতে চলছে পায়রা সেতুর কাজ

হামিদুল ইসলাম সরকার
Printed Edition

  • ২৫ শতাংশ কাজ করতেই প্রকল্পের মেয়াদ শেষ
  • চলমান রাখতে প্রয়োজন ২ কোটি ৮৫ লাখ টাকা

উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর বেশির ভাগই অনুমোদন পাওয়ার পর ধীরগতিতে বাস্তবায়ন চলে। মেয়াদ পার হয়ে গেলেও দেখা যায় প্রকল্পের সিকি ভাগ কাজও বাস্তবায়ন হয় না। একই দশা কচুয়া-বেতাগী-পটুয়াখালী-লোহালিয়া-কালাইয়া সড়কে ১৭তম কিলোমিটারে (জেড ৮০৫২) পায়রা নদীর ওপর সেতু নির্মাণ প্রকল্পের। এক হাজার ৪২ কোটি টাকা ব্যয়ের এই সেতুর কাজ ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা; কিন্তু ছয় বছরে প্রকল্পের অগ্রগতি মাত্র ২৫ শতাংশ। প্রকল্পে খরচ হয়েছে গত জানুয়ারি পর্যন্ত ১৯.২৮ শতাংশ। সেতু বিভাগ বলছে, ২০২০ সালে একনেকে অনুমোদিত হলে প্রকল্পের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নিয়োগকালীন সময়ে কোভিড-১৯ মহামারী চলমান থাকায় টেন্ডার প্রক্রিয়া প্রায় ৯ মাস বিলম্বিত হয়। অর্থসঙ্কটের কারণে আউটসোর্সিংয়ের জনবল ও পরামর্শকের টাকা দেয়া যাচ্ছে না তিন মাস ধরে। মেয়াদ বাড়ানোর আগ পর্যন্ত প্রকল্পটি চলমান রাখতে দুই কোটি ৮৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা অতিরিক্ত বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে।

সেতু বিভাগের সূত্র থেকে জানা গেছে, পায়রা নদীর ওপর প্রস্তাবিত সেতুটি নির্মিত হলে মির্জাগঞ্জ উপজেলার সাথে পটুয়াখালী সদরের ভ্রমণ সময় প্রায় দেড় ঘণ্টা হ্রাস পাবে এবং লেবুখালী ও পদ্মা সেতুর মাধ্যমে মির্জাগঞ্জ উপজেলার সাথে ঢাকার সরাসরি ও নিরবচ্ছিন্ন সড়ক যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হবে। কচুয়া-বেতাগী-পটুয়াখালী-লোহালিয়া-কালাইয়া সড়কের ১৭তম কিলোমিটারে (জেড ৮০৫২) পায়রা নদীর ওপর সেতু নির্মাণ শীর্ষক প্রকল্পটি তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০২০ সালের ১০ মার্চ একনেক সভায় অনুমোদিত হয়। মূল ডিপিপি অনুযায়ী প্রকল্পের মেয়াদ ছিল মার্চ ২০২০ থেকে ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত। পাঁচ বছর ১০ মাসে প্রকল্পটির কাজ সমাপ্ত করার কথা। খরচ ধরা হয়েছিল এক হাজার ৪২ কোটি ২৭ লাখ ৭৯ হাজার টাকা। পরবর্তী সময়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় কর্তৃক ব্যয় বৃদ্ধি ব্যতিরেকে মেয়াদ এক বছর অর্থাৎ মার্চ ২০২০ থেকে ৩১ ডিসেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়। এ ছাড়াও মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রথমবার আন্তঃখাত সমন্বয় প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়। বর্তমানে প্রকল্পটির কিছু অঙ্গের আন্তঃখাত ব্যয় সমন্বয় করে দ্বিতীয় আন্তঃখাত ব্যয় সমন্বয় প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে।

সেতু প্রকল্পের কাজ : সেতুর প্রাথমিক ডিজাইন অনুযায়ী বিআইডব্লিউটিএ-এর শ্রেণিবিন্যাস অনুযায়ী এই রুটটি প্রথম শ্রেণীর হওয়ায় নৌযান চলাচলের সুবিধার্থে সেতুর ভার্টিক্যাল ক্লিয়ারেন্স ধরা হয়েছে ১৮.৩ মিটার। সেতুর মোট দৈর্ঘ্য ১৬৯০ মিটার। এর মধ্যে মাঝের ১০০ মিটার দৈর্ঘ্যরে ৯টি স্প্যান এবং উভয় প্রান্তে ৫০ মিটার দৈর্ঘ্যরে দু’টি স্প্যান ও ৩০ মিটার দৈর্ঘ্যরে ২৩টি স্প্যান।

অগ্রগতি কম হওয়ার কারণ : সেতু বিভাগের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সেতু নির্মাণ প্রকল্পটি ২০২০ সালে একনেকে অনুমোদিত হয়। তবে প্রকল্পের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নিয়োগকালীন সময়ে কোভিড-১৯ মহামারী চলমান থাকায় টেন্ডার প্রক্রিয়া প্রায় ৯ মাস বিলম্বিত হয়। প্রায় দুই বছর পর ২০২২ সালের মার্চ মাসে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সাথে নির্মাণকাজ সম্পাদনের জন্য ৩৬ মাসের বা তিন বছরের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। তারা জানান, সে সময় দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের কারণে প্রকল্পটিকে ‘সি’ ক্যাটাগরিভুক্ত করে নামিয়ে দেয়া হয়। প্রকল্পটিতে ওই অর্থবছরে চাহিদা মোতাবেক অর্থছাড় স্থগিত রাখা হয়। আর কোভিড-১৯ মহামারী এবং ‘সি’ ক্যাটাগরিভুক্ত হওয়ায় প্রকল্প কাজ প্রায় ১৮ মাস বা আরো দেড় বছর বিলম্বিত হয়। নদীর উভয় পাড়ে সড়ক বিভাগের বিদ্যমান রাস্তার ব্যবহারের লক্ষ্যে প্রাথমিক অ্যালাইনমেন্ট নির্ধারণ করা ছিল; কিন্তু পরবর্তী সময়ে সড়ক বিভাগের রাস্তার ব্যবহার, ভূমি অধিগ্রহণের পরিমাণ কমানো, সেতুতে দুর্ঘটনা হ্রাসকল্পে অ্যালাইনমেন্ট পরিবর্তন, মূল সেতুর দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি, টোল মনিটরিং ভবনের ডিজাইন পরিবর্তন আনা হয়।

ফলে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি কর্তৃক অনুমোদিত ভ্যারিয়েশন অনুযায়ী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সাথে ২০২৩ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর বর্ধিত কাজসহ সংশোধিত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। প্রকল্পটি ডিজাইন বিল্ড পদ্ধতিতে হওয়ায় সংশোধিত চুক্তির পর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে পরিবর্তিত অ্যালাইনমেন্টে নতুনভাবে সাব-সয়েল ইনভেস্টিগেশন শেষ করে সেতুর নকশা প্রণয়নের কাজ শুরু করতে হয়। ফলে প্রকল্পের কাজ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি।

আবার মেয়াদ বাড়ছে : প্রকল্পের কাজের সুযোগ বৃদ্ধি এবং মূল সেতুর নকশা প্রণয়ন নতুন করে শুরু হওয়ায়, প্রকল্পের কাজ সম্পন্নের জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে ব্যয় সংশোধন ছাড়াই প্রকল্পের বাস্তবায়ন মেয়াদ আগামী এক বছর বাড়িয়ে জানুয়ারি ২০২৬ থেকেত ডিসেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত করা হয়।

অর্থসঙ্কটে কাজ স্থবির : সেতু বিভাগ ও প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, বর্ধিত সময়ের আর্থিক সংস্থান না থাকায় তিন মাস যাবৎ আউটসোর্স জনবলের বেতন দেয়া যাচ্ছে না। তদারকির জন্য নিযুক্ত পরমার্শকের বিল প্রদান করা যাচ্ছে না। প্রস্তাব অনুযায়ী সব খাতে না হলেও জরুরি প্রয়োজন মেটানোর জন্য আপাতত অতিরিক্ত দুই কোটি ৮৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ প্রয়োজন। এটি মোট প্রকল্প বরাদ্দের এক শতাংশের কম বলে তারা জানান। যেখানে ৫ শতাংশের মধ্যে সীমিত রাখার জন্য শর্ত রয়েছে।

পরিকল্পনা কমিশন যা বলছে : অতিরিক্ত বরাদ্দ চাওয়া প্রসঙ্গে পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রকল্পের মূল সেতুর নকশার সংশোধন চূড়ান্তকরণপূর্বক দ্রুত ডিপিপি সংশোধনের প্রস্তাব প্রেরণ করার জন্য বলা হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনের পরিপত্রের ২১.১২ ধারা অনুযায়ী প্রকল্প সংশোধন বা আন্তঃঅঙ্গ ব্যয় সমন্বয় সময়সাপেক্ষ হলে জরুরি প্রয়োজনে প্রকল্পের কাজ চালু রাখার স্বার্থে পরবর্তী সংশোধনের সময় প্রতিফলন করার শর্তে কমিশনের সদস্য ডিপিপির কোনো অঙ্গের ব্যয় বা পরিমাণ বৃদ্ধির প্রস্তাব অনুমোদন করতে পারেন। তবে এরূপ পরিবর্তনের ক্ষেত্রে শর্ত দেয়া আছে যে, তা প্রকল্পের মোট ব্যয়ের ৫ শতাংশের মধ্যে সীমিত থাকতে হবে। এ ক্ষেত্রে যে অতিরিক্ত বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে তা মোট প্রকল্প ব্যয়ের ১ শতাংশের কম হবে।

প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা হলে তারা জানান, আন্তঃখাত সমন্বয় করা হচ্ছে। সেটি শেষ হলেই আমরা পরিকল্পনা কমিশনে পাঠাব। পরে ডিপিপি সংশোধন করে মেয়াদ বৃদ্ধির জন্য পাঠানো হবে। প্রকল্পটির যে কাজ বাকি আছে তাতে সমাপ্ত করতে সময় লাগবে। তবে সময় বাড়লেও ব্যয় বাড়বে না। কারণ এটি ফিক্সড কনট্রাক্ট।