এপি ও হিন্দুস্তান টাইমস
‘তোমরা তেলাপোকা’- ভারতের প্রধান বিচারপতির এই তাচ্ছিল্যকে ব্যঙ্গের অস্ত্র বানিয়ে সামাজিক মাধ্যমে ঝড় তোলা ‘কক্রোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) গতকাল শনিবার প্রথমবারের মতো রাজপথে নামল। নয়া দিল্লির জন্তর মন্তরে শত শত তরুণের সমাবেশে দলের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফিরে নেতৃত্ব দেন। এই সমাবেশ শুধু একটি দিনের প্রতিবাদ নয়- এটি ভারতের কোটি কোটি হতাশ তরুণের ক্ষোভের নতুন মুখ।
মাত্র তিন সপ্তাহ আগে মে মাসের মাঝামাঝিতে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত একটি শুনানিতে কিছু বেকার তরুণকে ‘তেলাপোকা’ ও ‘পরজীবী’ বলে আখ্যা দেন। বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও পিআর কৌশলবিদ ৩০ বছর বয়সী অভিজিৎ দিপকে এই অপমানকেই পরিচয়ের পতাকায় রূপান্তরিত করেন। ইনস্টাগ্রাম ও এক্সে মাত্র কয়েক সপ্তাহে দুই কোটিরও বেশি ফলোয়ার জুটিয়ে সিজেপি হয়ে ওঠে মোদি সরকারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় ডিজিটাল প্রতিরোধের কণ্ঠস্বর।
শনিবারের সমাবেশে প্রধান দাবি ছিল শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ। এই দাবি জন্ম নিয়েছে সাম্প্রতিক একাধিক পরীক্ষায় ধারাবাহিক কেলেঙ্কারি থেকে। ৩ মে অনুষ্ঠিত নিট-ইউজি মেডিক্যাল প্রবেশিকায় প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ায় পরীক্ষা বাতিল হয়, সিবিআই তদন্ত চলছে এবং পুনঃপরীক্ষার প্রশ্নপত্র বিমানবাহিনীর সাহায্যে পরিবহনের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। এ ছাড়া সিবিএসই দ্বাদশ শ্রেণীর নম্বরায়নে বিপর্যয়, এসএসসি-জিডি পরীক্ষায় উত্তর প্রদেশ ও বিহারে চরম বিশৃঙ্খলা এবং সিউইটি-ইউজিতে প্রযুক্তিগত ত্রুটি- সব মিলিয়ে কোটি ছাত্রছাত্রীর ভবিষ্যৎ হুমকির মুখে। সিজেপির ওয়েবসাইটে প্রধানের অপসারণের দাবিতে ইতোমধ্যে আট লাখ মানুষ স্বাক্ষর করেছেন।
এই আন্দোলনে তিন কিশোরের ভাইরাল সাহসিকতা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। দিল্লির দ্বাদশ শ্রেণীর ছাত্র বেদান্ত শ্রীবাস্তব তার পদার্থবিজ্ঞানের উত্তরপত্র অদলবদল হওয়ার অভিযোগ করে ‘দেশবিরোধী’ তকমা খেলেও শেষ পর্যন্ত সিবিএসই ভুল স্বীকার করতে বাধ্য হয়। ১৭ বছরের সার্থক সিধান্ত দাবি করেন, পরীক্ষা পোর্টালের অনলাইন মার্কিং ঠিকাদার নির্বাচনে অনিয়ম হয়েছে। আর ১৯ বছরের নিসর্গ অধিকারী পোর্টালের কোডে ‘মাস্টার পাসওয়ার্ড’ খুঁজে পাওয়ার দাবি করলে সিবিএসই প্রথমে অস্বীকার করে, পরে ‘দুর্বলতা নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে’ বলে জানায়।
সমাবেশে প্রতিবাদকারীরা ভারতের জাতীয় পতাকা ও বই হাতে নিয়ে ‘তেলাপোকারা আসছে, ধর্মেন্দ্র প্রধান যাচ্ছে’ সেøাগান তোলেন। এক প্লাকার্ডে লেখা ছিল: ‘যে পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হয় না, তার অপেক্ষায়।’ অংশগ্রহণকারী ২৬ বছর বয়সী মানসী সেহগাল বলেন, ‘আসল সমস্যা হলো এতদিন মানুষের কথা বলার কোনো জায়গাই ছিল না। সিজেপি সেই জায়গাটি তৈরি করেছে।’
দিপকে নিজেও জানেন লড়াই সহজ নয়। মোদি সরকার ইতোমধ্যে এক্সে সিজেপির অ্যাকাউন্ট ব্লক করেছে এবং সরকারপন্থী মন্ত্রী পাকিস্তানি অনুসরণকারীদের অভিযোগ এনেছেন, যা দিপকে নিজের বিশ্লেষণ দিয়ে খণ্ডন করেন। দিপকের পরিবার তার গ্রেফতারের আশঙ্কা প্রকাশ করেছে, তাদের বাড়িতে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘এটি একটি দীর্ঘ লড়াই। আমরা প্রায় এক মাস ধরে পদত্যাগ দাবি করে আসছি।’
বিরোধীদলগুলো মোটের ওপর আন্দোলনের পাশে দাঁড়িয়েছে। রাহুল গান্ধী, আপের আতিশী ও তৃণমূলের অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় শিক্ষামন্ত্রীর সমালোচনায় সোচ্চার। অন্যদিকে বিজেপির নেতারা গোটা বিষয়টিকে ‘সামাজিক মাধ্যমের ফানুস’ বলে উড়িয়ে দিচ্ছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ভারতে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে বেকারত্বের হার ৯.৯ শতাংশ- সামগ্রিক হারের তিন গুণেরও বেশি। শহরাঞ্চলে তা প্রায় ১৪ শতাংশ। সিজেপির উত্থান শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ বা নেপালের মতোই সামাজিক মাধ্যমভিত্তিক যুব আন্দোলনের নতুন ঢেউয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে, যা রাস্তার আন্দোলনে রূপ নেয়ার ক্ষমতা রাখে।



