কূটনীতিকদের সাথে সংলাপে মির্জা ফখরুল

সরকারি সংস্থার কাজে ধীরগতি বিদেশী বিনিয়োগে বড় বাধা

দেশে জ্বালানি তেলের দাম যথেষ্ট নিয়ন্ত্রণে আছে : প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা

Printed Edition
কূটনীতিকদের সাথে সংলাপে বক্তব্য রাখেন এলজিআরডি মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর : নয়া দিগন্ত
কূটনীতিকদের সাথে সংলাপে বক্তব্য রাখেন এলজিআরডি মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর : নয়া দিগন্ত

নিজস্ব প্রতিবেদক

স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ও বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, দেশে বিনিয়োগ বাড়াতে সরকারের বিভিন্ন সংস্থার ধীরগতির কার্যক্রম বড় বাধা বলে বিদেশী বিনিয়োগকারীরা জানিয়েছেন। গতকাল বুধবার সকালে রাজধানীর বনানীর শেরাটন হোটেলের অ্যানেক্স অডিটোরিয়ামে ‘দ্য কম্পাস ডায়ালগ’ শীর্ষক সংলাপ শেষে সাংবাদিকদের এ কথা বলেন মির্জা ফখরুল। ‘ইনস্টিটিউট অব স্ট্র্যাটেজি অ্যান্ড ট্যাকটিকস রিসার্চ (আইএসটিআর)’ এ সংলাপের আয়োজন করে। এতে বিদেশী বিভিন্ন দাতা সংস্থার প্রতিনিধি, কূটনীতিক ও ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা অংশ নেন। অনুষ্ঠানের মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ছিলেন আইএসটিআর-এর প্রেসিডেন্ট এ আর এম শহিদুল ইসলাম আবু রুশদ ও চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের ফাউন্ডিং ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং প্রধান নির্বাহী এম জাকির হোসেন খান কূটনীতিকদের সাথে আলোচনার পর ব্রিফিংয়ে অনুষ্ঠানের বিষয়ে বর্ণনা দেন।

একই অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ড. মাহদী আমিন বলেছেন, বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের দাম যথেষ্ট নিয়ন্ত্রণে আছে। ইতোমধ্যে জ্বালানি ক্ষেত্রে আমরা দেখেছি, ইনিশিয়াল স্টেজে কিছু ক্রাইসিস ছিল। তবে সরকার দেশী-বিদেশী স্কলারদের সাথে আলোচনা করেছে। ইন্টারন্যাশনাল বার্গেনিং ও নেগোসিয়েশন করেছে। অল্টারনেটিভ সোর্সিং করেছে।

বাংলাদেশের অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক অবস্থানকে সামনে রেখে ওই কৌশলগত সংলাপে যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, নরওয়ে, সুইজারল্যান্ড, তুরস্কসহ পশ্চিমা দেশের কূটনীতিকরা অংশ নেন। আলোচনার মূল উদ্দেশ্য ছিলÑ বাংলাদেশের নীতিগত অচলাবস্থা শনাক্ত করা এবং এলডিসি উত্তরণ ঘিরে অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাঝুঁকি নিরূপণ।

৮ বিলিয়ন ডলারের রফতানি ঝুঁকি : সংলাপে উঠে আসেÑ বাংলাদেশ যদি দ্রুত বিনিয়োগ পরিবেশ ও বাণিজ্যনীতি সংস্কার করতে না পারে, তাহলে বছরে প্রায় আট বিলিয়ন ডলারের রফতানি আয় ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

একজন ইউরোপীয় কূটনীতিকের মতে, ‘বাংলাদেশ অতিরিক্তভাবে তৈরি পোশাক খাতের ওপর নির্ভরশীল, যা বহির্বিশ্বের আইন ও বাজার পরিবর্তনের প্রতি দেশটিকে সংবেদনশীল করে তোলে।’

জ্বালানি খাতে অস্থিরতা ও ২.৫ বিলিয়ন ডলারের চাহিদা : প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বিদ্যুৎ খাতে অতীতের অনিয়ম ও চুক্তিগত দুর্বলতার কারণে শিল্প খাতে স্থিতিশীল জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। এই সঙ্কট মোকাবেলায় প্রায় ২.৫ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি ঋণ প্রয়োজন বলে নির্ধারণ করা হয়েছে।

সংলাপে ইন্দো-প্যাসিফিক প্রেক্ষাপটে সামরিক সহযোগিতা জোরদারের বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। অংশগ্রহণকারী এক প্রতিরক্ষা অ্যাটাশে বলেন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে তারা ‘সহযোগী’ হিসেবে দেখেন এবং যৌথ প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি ও সামরিক সরঞ্জাম বিনিময়ের ওপর জোর দেন।

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘তারা (বিনিয়োগকারীরা) বলছেন যে, এখানে সরকারের যে এজেন্সিগুলো আছে, সেগুলো খুব ধীর গতিতে চলে। তারা (বিনিয়োগকারীরা) যে গতিতে কোনো ইস্যু সমাধান করতে চান, সেখানে নেতিবাচক অবস্থা তৈরি হয়। তারা হতাশ হয়ে যান। এটা একটা অন্যতম প্রধান সমস্যা।’

মির্জা ফখরুল বলেন, এখানে ব্যবসা ও বিনিয়োগের পরিবেশ খুব ভালো নয়। এ কারণে বিনিয়োগকারীরা অনেক ক্ষেত্রে হতাশ হন। সরকার চেষ্টা করছে সেই বিষয়গুলোকে ঠিক করে নিয়ে আসার জন্য আমলাতন্ত্রকে ঠিক করা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করার। প্রধানমন্ত্রী প্রতিদিন এ বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করছেন এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়কে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়ার নির্দেশনা দিচ্ছেন।

স্থানীয় সরকারমন্ত্রী বলেন, সরকার দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি (ম্যাক্রো ইকোনমি) কিভাবে সামনে এগিয়ে নেয়া যায়, সে বিষয়ে কাজ করছে। নির্বাচনী ইশতেহারে দেয়া প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নে সরকার ধারাবাহিকভাবে উদ্যোগ নিচ্ছে। তিনি বলেন, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড ও ফসলভিত্তিক কর্মসূচিগুলো মানুষের মধ্যে আশার সঞ্চার করেছে।

দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রসঙ্গ টেনে মির্জা ফখরুল বলেন, অতীতে রাজনৈতিক যে সমস্যাগুলো ছিল, তা পুরোপুরি দূর হয়নি। তবে আগের তুলনায় পরিস্থিতি ইতিবাচক। দেশে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করা গেলে অর্থনৈতিক উন্নয়ন, বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে।

অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন আরো বলেন, বৈশ্বিক অনেক চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও প্রতিটি চ্যালেঞ্জকে আমরা একেকটা অপরচুনিটি হিসেবে নিয়ে দেশটাকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবো।

আজ কিন্তু আমরা অন্যান্য দেশের তুলনায় জ্বালানির ক্ষেত্রে যথেষ্ট ভালো অবস্থায় রয়েছি। অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় আমাদের দেশে তেলের দাম যথেষ্ট নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ডিমান্ড অনুযায়ী সাপ্লাইটা আমরা স্থিতিশীল রেখেছি।

মাহদী আমিন বলেন, এ বাংলাদেশকে যদি সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হয়, তাহলে জনগণের আকাক্সক্ষা ও প্রত্যাশাকে ধারণ করে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নির্বাচনের পরে গত প্রায় আড়াই মাস ধরে নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিটি ধারাকে ধরে যে প্রতিশ্রুতিগুলো রয়েছে, সেগুলো পূরণ করা শুরু করেছেন।

দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যথেষ্ট স্থিতিশীল রয়েছে বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হচ্ছে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি, অবকাঠামো প্রতিটি ক্ষেত্রে কিন্তু প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কার্য সমাধান হয়েছে। মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হচ্ছে। আগামীর যে বাংলাদেশ আমরা প্রত্যাশা করি, সেখানে আমরা চাই পারস্পরিক সৌহার্দ্য থাকবে, সহাবস্থান থাকবে।