যেভাবে ধ্বংস হয়েছে অত্যাচারী জাতি

Printed Edition
যেভাবে ধ্বংস হয়েছে অত্যাচারী জাতি
যেভাবে ধ্বংস হয়েছে অত্যাচারী জাতি

মুফতি মুহাম্মদ রফিকুল ইসলাম

বিচার দিবসে আরশের ছায়ায় যারা আশ্রয় পাবেন, তাদের মধ্যে প্রথম ব্যক্তি হলেন- ন্যায়পরায়ণ বাদশাহ। ইচ্ছা করে কেউ ক্ষমতার মালিক হতে পারে না। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন- হে হাবীব! বলুন, হে আল্লাহ! আপনি যাকে ইচ্ছা রাজ্য দান করেন, আবার যার কাছ থেকে ইচ্ছা রাজ্য ছিনিয়ে নেন, যাকে ইচ্ছা সম্মানিত করেন, যাকে ইচ্ছা অপমানিত করেন। সব কল্যাণ আপনারই হাতে। অবশ্যই আপনি সব কিছুর উপর একক ক্ষমতাবান। (সূরা আলে ইমরান-২৬)। পৃথিবী যারা শাসন করেছেন তারা দুই ধরনের। ১. মুসলিম শাসক ও ২. অমুসলিম শাসক। সমস্ত পৃথিবীর শাসক ছিলেন চারজন। দু’জন মুসলমান, দু’জন কাফের। মুসলমান দু’জন হলেন-১. হজরত সুলাইমান আ:, ২ . হজরত সিকান্দার বা যুলকার নাইন আ:। কাফির দু’জন হলেন- ১. বখতে নাসর, ২. নমরুদ। কাফির বা অমুসলিম শাসকগণ বেশির ভাগই অত্যাচারী, স্বৈরাচারী, জুলুমবাজ, হত্যাকারী ইত্যাদি স্বভাবের হয়। কিন্তু মুসলিম শাসকরাও যদি স্বৈরচারী, অত্যাচারী ও জুলুমবাজ হয় তাহলে খুবই দুঃখজনক। মুসলিম অনেক ন্যায়পরায়ণ শাসক রয়েছেন, আবার অনেক স্বৈরশাসকও রয়েছেন। তবে তাদের পরিণাম ভালো হয়নি। আল্লাহ তায়ালা সব স্বৈরশাসক ও অত্যাচারী জাতিকে নিশ্চিহ্ন ও ধ্বংস করে দিয়েছেন। কোনো স্বৈরশাসন দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। একদিন তাকে কঠিন পরিণতি ভোগ করতে হয়। অতীতের সব অত্যাচারী জাতি ও স্বৈরশাসককে আল্লাহ তায়ালা নানাভাবে ধ্বংস করেছেন। যেমন : হজরত নুহ আ:-এর অত্যাচারী জাতিকে আল্লাহ তায়ালা প্লাবনের মাধ্যমে ধ্বংস করেছেন।

আ’দ জাতি ছিল অবিশ^াসী, অবাধ্য ও ধর্মদ্রোহী। আল্লাহ তায়ালা তাদের কাছে হজরত হুদ আ:কে প্রেরণ করেন। তারা নবীর কথা অমান্য করে নানা অপকর্মে লিপ্ত হয়। এরপর তাদের ওপর আপতিত হয় আল্লাহর গজব। প্রথম তিন বছর অনাবৃষ্টি, তার পরে দেখা দেয় দুর্ভিক্ষ। একদিন দেখা দেয় কালো মেঘ। তারপর সাত দিন ধরে ঘূর্ণিঝড় চলতে থাকে। এতে তাদের বাড়ি-ঘর লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়। তারা সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।

সামুদ জাতিকে আল্লাহ তায়ালা প্রচণ্ড আওয়াজের মাধ্যমে ধ্বংস করে দেন। উষ্ট্রকে হত্যা করার পর তাদের তিন দিন তিন রাতের অবকাশ দেয়া হয়। চতুর্থ দিন একটি আওয়াজই সামুদ জাতিকে ধ্বংস করে দেয়।

হজরত লুত আ:-এর উম্মত ছিল পাপী, দাম্ভিক ও নির্লজ্জ জাতি। নারী থেকে বালকের প্রতি তাদের আকর্ষণ ছিল বেশি। অর্থাৎ তারা সমকামিতাপ্রিয় ছিল। আল্লাহ তায়ালা প্রচণ্ড ঝড় বৃষ্টির মাধ্যমে এ জাতিকে ধ্বংস করে দেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, এরপর যখন আমার আদেশ এলো তখন আমি নগরগুলোকে উল্টিয়ে এবং তাদের ওপর অনবরত বৃষ্টি বর্ষণ, ক্রমাগত কঙ্কর বর্ষণ করলাম, যা তোমার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে চিহ্নিত ছিল। (সূরা হুদ : ৮২-৮৩)

নমরুদ ও তার জাতিকে আল্লাহ তায়ালা মশা দ্বারা ধ্বংস করেন। আল্লাহ তায়ালা ফিরাউন ও তার বাহিনী লুহিত সাগরে ডুবিয়ে মেরেছেন। আল্লাহ তায়ালা যেভাবে চান, একটি জাতিকে সেভাবেই ধ্বংস করেন।

বাংলাদেশের আবাবিল : ২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ এর জুলাই পর্যন্ত এ দেশে চলেছিল ফেরাউনি ও নমরুদি শাসন। ভিন্ন মতের লোকদের নামে মামলা-হামলা, গুম, খুন ইত্যাদি ছিল স্বাভাবিক ব্যাপার। কত মানুষকে যে মামলা দেয়া হয়েছে, গুম করা হয়েছে, খুন করা হয়েছে তা কারো জানা নেই। তৈরি করেছে আয়নাঘর। সর্ব ক্ষেত্রে করেছে দলীয়করণ। দলীয় পরিচয় ছাড়া কোথাও চাকরি দেয়া হতো না, এমনকি মসজিদের ইমামও। দলীয় ক্যাডারদের হাতে দিয়েছে ভারী অস্ত্র। হত্যা করেছে অসংখ্য মানুষকে, ফাঁসি দিয়েছে জাতীয় নেতাকে। ২০৪১ পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকার সব পরিকল্পনা সম্পন্ন করেছে। কিন্তু আল্লাহ তায়ালার প্ল্যান ভিন্ন ধরনের। তিনি পাঠালেন ছাত্রছাত্রী নামক একদল আবাবিল। এই আবাবিলের হাতেই পতন হয় তাদের। ৫ আগস্ট ২০২৪ দুপুরে ২টার আগ পর্যন্ত কেউই কল্পনা করতে পারেনি এমন অবস্থা হবে। আল্লাহ তায়ালা আবাবিল প্রেরণ করেছিলেন আবরাহা বাদশাকে ধ্বংস করার জন্যে। আবাবিল অর্থ ঝাঁক, পাল, দল। আল্লাহ তায়ালা সূরা ফীলে উল্লেখ করেছেন- তিনি (আবরাহার বাহিনীকে ধ্বংস করার জন্যে) ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি প্রেরণ করেছেন। প্রতিটি পাখির সাথে ছিল তিনটি পাথর। দু’পায়ে দু’টি, মুখে একটি। পাখির নিক্ষেপিত পাথরের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা ধ্বংস করেন আবরাহার হস্তি বাহিনীকে। ঠিক অনুরূপ বাংলাদেশের স্বৈরশাসককে ধ্বংস ও নির্মূল করার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন আবাবিল নামক একঝাঁক ছাত্র-জনতাকে। স্বৈরশাসক পতনের আন্দোলনের সূচনা হয় তাদের মাধ্যমেই, পরে তাদের সাথে যুক্ত হয় সব রাজনৈতিক দল ও সাধারণ মানুষ। কেউ কল্পনা করতে পারেনি যে, এই স্বৈরশাসকে ছাত্র-জনতা এত অল্প সময়ে পরাজিত করতে পারবে। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা আবাবিল দ্বারা যেভাবে আবরাহাকে ধ্বংস করেছেন। অনুরূপ ছাত্র-ছাত্রীদের দ্বারা স্বৈরশাসককে ধ্বংস করে দিয়েছেন। তাদের সাহস ও যোগ্যতা সমগ্র বিশ^কে নাড়া দিয়েছে এবং বিশে^র জন্য মডেল হয়ে থাকবে। তাদের এ অবদান জাতি চিরদিন স্মরণে রাখবে। আল্লাহ তায়ালা সব শহীদকে জান্নাতের উচ্চ মর্যাদা দান করুন, আহতদের দ্রুত সুস্থ করে দিন এবং ছাত্রছাত্রী, নেতা-নেত্রীদের সত্য ও ন্যায়ের মশাল নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।

লেখক : প্রধান ফকিহ্,আল-জামেয়াতুল ফালাহিয়া কামিল মাদ্রাসা, ফেনী।