পুরোপুরি বাজারের ওপর ছেড়ে দেয়া হলো ডলারের দর

বৈদেশিক মুদ্রাবাজার অস্থিতিশীল হওয়ার আশঙ্কা

বর্তমানে আমদানি চাহিদা কিছুটা কম থাকায় বাজারে পর্যাপ্ত ডলারের সরবরাহ রয়েছে। এর বড় প্রমাণ হলো প্রতিদিনই বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে ডলার বিক্রি করছে ব্যাংকগুলো। বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী কোনো ব্যাংকের কাছে তাদের মোট মূলধনের ১৫ শতাংশের সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা থাকতে পারবে না। এটাকে ব্যাংকিং ভাষায় এনওপি বলে।

আশরাফুল ইসলাম
Printed Edition

বৈদেশিক মুদ্রা বাজার নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা বাংলাদেশ ফরেন এক্সচেঞ্জ ডিলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাফেদা) কার্যকর নেই। তবুও ডলার দর নির্ধারণে পুরোপুরি বাজারের ওপর ছেড়ে দেয়া হলো বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে। এখন থেকে কোনো প্রকার ডলার দরের ওপর কোনো প্রকার মানদণ্ড নির্ধারণ করা হবে না। এমনি পরিস্থিতিতে বৈদেশিক মুদ্রাবাজার অস্থিতিশীল হওয়ার আশঙ্কা করছেন ব্যাংকাররা। তাদের মতে, পুরোপুরি বাজারের ওপর ছেড়ে দিলে বৈদেশিক মুদ্রাবাজার অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়বে। বাজারে অসাধু খেলোয়াড়দের দৌরাত্ম্য বেড়ে যাবে।

গতকাল মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর ব্যাংকগুলোর বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনকারী বিভাগের প্রধানদের সাথে বৈঠকে এমন সিদ্ধান্ত জানিয়েছেন বলে বৈঠক সূত্র জানিয়েছে। সূত্র জানিয়েছে, বৈঠকে গভর্নর জানিয়েছেন, বাজার পুরোপুরি বাজারের ওপর ছেড়ে দেয়া হলো। বাংলাদেশ ব্যাংক শুধু তদারকি করবে। বাজার কারসাজি যেন কেউ না করেন সেজন্য তিনি সতর্ক বার্তা দিয়েছেন। বলেছেন, বাজার কারসাজির প্রমাণ কোনো ব্যাংকার বা ব্যাংকের বিরুদ্ধে পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেয়া হবে।

জানা গেছে, বর্তমানে আমদানি চাহিদা কিছুটা কম থাকায় বাজারে পর্যাপ্ত ডলারের সরবরাহ রয়েছে। এর বড় প্রমাণ হলো প্রতিদিনই বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে ডলার বিক্রি করছে ব্যাংকগুলো। বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী কোনো ব্যাংকের কাছে তাদের মোট মূলধনের ১৫ শতাংশের সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা থাকতে পারবে না। এটাকে ব্যাংকিং ভাষায় এনওপি বলে। দিনের শুরুতে ব্যাংকগুলোর ডলারের মজুদ ১৫ শতাংশের বেশি থাকতে পারবে না। বেশি থাকলে আন্তঃব্যাংকের কাছে বিক্রি করতে হবে। আন্তব্যাংকে চাহিদা না থাকলে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে বিক্রি করতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, প্রতিদিনই ব্যাংকগুলোর উদ্বৃত্ত ডলার কিনে নিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গতকালও বাংলাদেশ ব্যাংক বাজার থেকে সাড়ে ৮ কোটি ডলার কিনেছে। প্রতি ডলারের বিপরীতে বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যয় করেছে ১২২ টাকা ৭৫ পয়সা। এ সুবাদে বাংলাদেশ ব্যাংক চলতি অর্থবছরের গতকাল ৬০৬ কোটি ৮৫ লাখ ডলার বাজার থেকে কিনেছে। যা স্থানীয় মুদ্রায় প্রায় ৭৫ হাজার কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংক ডলার না কিনলে বাজার দর আরো কমে যেত। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংক হস্তক্ষেপ না করলে রেমিট্যান্স ও রফতানি আয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ত। এভাবেই বাজার নিয়ন্ত্রণ করে বাংলাদেশ ব্যাংক।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশ ব্যাংক বাজার থেকে ডলার না কিনলে ডলারের দর আরো কমে যেত। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই হস্তক্ষেপের কারণেই রেমিট্যান্স ও রফতানি আয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়া থেকে কিছুটা সুরক্ষা মিলছে। কারণ ডলারের দর অতিরিক্ত কমে গেলে প্রবাসী আয় ও রফতানি খাতে নিরুৎসাহ তৈরি হতে পারে। তবে বাজারে ডলারের সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও কিছু ব্যাংকের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, কয়েকটি ব্যাংক বড় ব্যবসায়ী গ্রুপের কাছে আগাম ডলার বিক্রি করছে, যাতে পরবর্তীতে কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি করে বেশি দামে ডলার বিক্রি করা যায়। অতীতে ডলারের সঙ্কটের সময়ও এ ধরনের কৌশল ব্যবহার করা হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। গতকালের বৈঠক সূত্র জানিয়েছে, বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর ব্যাংকগুলোকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, কোনো প্রকার ডলারের কারসাজি বরদাশত করা হবে না। কারসাজির অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

একাধিক ব্যাংকার মনে করেন, বাজার পুরোপুরি উন্মুক্ত করার আগে শক্তিশালী নজরদারি কাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন ছিল। অন্যথায় কিছু ব্যাংক ও মানি মার্কেট অপারেটর পরিস্থিতির সুযোগ নিতে পারে। তাদের মতে, বাংলাদেশ ব্যাংক যদি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ থেকে সরে দাঁড়ায়, তাহলে স্বল্প সময়ের মধ্যেই ডলারের বাজারে অস্থিরতা বাড়তে পারে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, মুক্তবাজারভিত্তিক বিনিময় হার দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক হতে পারে, তবে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতিতে এটি ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধ, জ্বালানি আমদানি এবং শিল্পের কাঁচামালের খরচ বেড়ে গেলে মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি হবে। তারা বলছেন, বাজারভিত্তিক ডলার ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা না গেলে সাধারণ আমদানিকারক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং ভোক্তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়বেন। তাই ডলারের বাজার পুরোপুরি উন্মুক্ত করার পাশাপাশি শক্তিশালী মনিটরিং ব্যবস্থা চালু রাখার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।