মেধাস্বত্ব শর্ত নিয়ে শঙ্কায় স্থানীয় শিল্পখাত

প্রস্তাবিত আমদানি নীতি

শাহ আলম নূর
Printed Edition

দেশে প্রস্তাবিত আমদানি নীতিতে মেধাস্বত্ব (ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি রাইটস-আইপিআর) সংক্রান্ত কঠোর শর্ত যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনায় স্থানীয় শিল্প খাতে উদ্বেগ বাড়ছে। ব্যবসায়ী ও শিল্প উদ্যোক্তাদের আশঙ্কা, আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড, প্রযুক্তি ও পেটেন্ট সুরক্ষার নামে নতুন বিধিনিষেধ কার্যকর হলে দেশীয় উৎপাদন ব্যয় বাড়বে, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে এবং অনেক ক্ষেত্রে আমদানি নির্ভরতা আরো বাড়তে পারে। অন্য দিকে নীতিনির্ধারকদের দাবি, বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থার সাথে সামঞ্জস্য আনতে এবং বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণে শক্তিশালী মেধাস্বত্ব সুরক্ষা এখন সময়ের দাবি।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, নতুন আমদানি নীতিতে আন্তর্জাতিক ট্রেডমার্ক, কপিরাইট, পেটেন্ট ও ডিজাইন অধিকারের সাথে সাংঘর্ষিক পণ্য আমদানিতে কঠোর নজরদারি আরোপের প্রস্তাব রয়েছে। এতে ব্র্যান্ড অনুমোদন ছাড়া কিছু পণ্য আমদানিতে বিধিনিষেধ, প্রযুক্তি ব্যবহারে লাইসেন্স বাধ্যবাধকতা এবং কাস্টমস পর্যায়ে মেধাস্বত্ব যাচাইয়ের বিধান যুক্ত হতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) ট্রিপস (টিআরআইপিএস) চুক্তির আওতায় বাংলাদেশকে ধীরে ধীরে কঠোর মেধাস্বত্ব কাঠামোয় যেতে হবে। বর্তমানে স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) হিসেবে বাংলাদেশ ওষুধসহ কিছু খাতে বিশেষ সুবিধা পাচ্ছে। তবে ২০২৬ সালের পর এলডিসি উত্তরণ প্রক্রিয়ার কারণে অনেক ক্ষেত্রেই এই ছাড় সীমিত হয়ে আসবে। ফলে নতুন আমদানি নীতির প্রভাব শিল্প খাতে দ্রুত দৃশ্যমান হতে পারে।

এ দিকে বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশন (এফবিসিসিআই) সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দেশে এখনো অধিকাংশ ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প বিদেশী প্রযুক্তি বা ডিজাইনের ওপর আংশিক নির্ভরশীল। নতুন আইপিআর শর্ত কঠোরভাবে কার্যকর হলে এসব শিল্পকে বাড়তি রয়্যালটি, লাইসেন্স ফি ও প্রযুক্তি ব্যবহারের খরচ বহন করতে হবে। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে এবং বাজারে পণ্যের দামও বৃদ্ধি পেতে পারে।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিশেষ করে ইলেকট্রনিকস, মোবাইল অ্যাসেম্বলিং, সফটওয়্যার, প্লাস্টিক পণ্য, অটোমোবাইল যন্ত্রাংশ, কৃষিযন্ত্র ও ওষুধ শিল্পে এর প্রভাব বেশি পড়তে পারে। বর্তমানে দেশে মোবাইল ফোন অ্যাসেম্বলিং শিল্পে ১৫টির বেশি প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে প্রায় তিন কোটি মোবাইল হ্যান্ডসেটের চাহিদা রয়েছে, যার বড় অংশ স্থানীয়ভাবে সংযোজন করা হয়। নতুন আইপিআর শর্তে প্রযুক্তিগত লাইসেন্স ও ব্র্যান্ড ব্যবহারের খরচ বাড়লে স্থানীয় অ্যাসেম্বলারদের ব্যবসায়িক ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যেতে পারে। এ দিকে ওষুধ শিল্পেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প সমিতির তথ্য মতে, দেশের ওষুধ শিল্প স্থানীয় চাহিদার প্রায় ৯৮ শতাংশ পূরণ করছে এবং ১৫০টির বেশি দেশে ওষুধ রফতানি হচ্ছে। বর্তমানে ট্রিপস চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ ২০৩৩ সাল পর্যন্ত কিছু পেটেন্ট ছাড় সুবিধা পাচ্ছে। কিন্তু আমদানি নীতিতে যদি আগাম কঠোর মেধাস্বত্ব শর্ত আরোপ করা হয়, তাহলে জেনেরিক ওষুধ উৎপাদনে বাধা সৃষ্টি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান নয়া দিগন্তকে বলেন, মেধাস্বত্ব সুরক্ষা এক দিকে উদ্ভাবন ও বিদেশী বিনিয়োগ বাড়াতে সহায়ক হলেও উন্নয়নশীল দেশের জন্য তাৎক্ষণিকভাবে এটি ব্যয়বহুল হতে পারে। বিশ্বব্যাংকের একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, শক্তিশালী আইপিআর ব্যবস্থায় বিদেশী প্রযুক্তি প্রবেশ বাড়লেও স্থানীয় শিল্পকে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে সক্ষম করতে সমান্তরাল নীতি সহায়তা প্রয়োজন হয়। বাংলাদেশে গবেষণা ও উন্নয়ন (আরঅ্যান্ডডি) ব্যয় এখনো জিডিপির ১ শতাংশেরও কম। ফলে দেশীয় শিল্প এখনো প্রযুক্তিগতভাবে পুরোপুরি প্রস্তুত নয়।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) এক গবেষণায় বলা হয়েছে, দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প নিজস্ব ব্র্যান্ড বা নিবন্ধিত প্রযুক্তির বাইরে কাজ করে। অনেক ক্ষেত্রে তারা আন্তর্জাতিক ডিজাইনের অনুকরণে পণ্য উৎপাদন করে থাকে। কঠোর আইপিআর বাস্তবায়ন হলে এসব প্রতিষ্ঠান আইনি জটিলতায় পড়তে পারে।

একাধিক শিল্প উদ্যোক্তা জানিয়েছেন, দেশে অনেক সময় বিদেশী ব্র্যান্ডের যন্ত্রাংশ বা প্রযুক্তির “কম্প্যাটিবল” সংস্করণ তৈরি হয়, যা বাজারে সাশ্রয়ী বিকল্প হিসেবে জনপ্রিয়। নতুন আমদানি নীতিতে যদি এসব পণ্যের আমদানি বা উৎপাদনে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়, তাহলে বাজারে একচেটিয়া পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। এতে ভোক্তাদের ব্যয়ও বাড়বে।

তবে নীতিনির্ধারকরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী মেধাস্বত্ব কাঠামো দেশীয় উদ্ভাবন বাড়াবে। বর্তমানে বাংলাদেশে পেটেন্ট আবেদন ও নিবন্ধনের হার তুলনামূলক কম। শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন পেটেন্ট, শিল্প-নকশা ও ট্রেডমার্ক অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতি বছর কয়েক হাজার ট্রেডমার্ক আবেদন হলেও স্থানীয় উদ্ভাবনের পেটেন্ট আবেদন সীমিত। ফলে উদ্ভাবনভিত্তিক শিল্প গড়ে তুলতে আইপিআর সংস্কার জরুরি বলে মনে করছেন তারা। বিদেশী বিনিয়োগকারীরাও দীর্ঘদিন ধরে শক্তিশালী মেধাস্বত্ব সুরক্ষার দাবি জানিয়ে আসছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের বিভিন্ন বাণিজ্য সংগঠন বাংলাদেশে নকল পণ্য ও সফটওয়্যার পাইরেসি নিয়ন্ত্রণে কঠোর ব্যবস্থার পরামর্শ দিয়েছে।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সমস্যার মূল জায়গা হচ্ছে নীতির বাস্তবায়ন পদ্ধতি। যদি হঠাৎ করে কঠোর বিধিনিষেধ কার্যকর করা হয়, তাহলে স্থানীয় শিল্প বড় ধাক্কায় পড়তে পারে। এজন্য ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন, স্থানীয় শিল্পকে প্রযুক্তিগত সহায়তা, সহজ লাইসেন্সিং ব্যবস্থা এবং গবেষণা বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন তারা।

ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, বাংলাদেশকে অবশ্যই আন্তর্জাতিক মানের মেধাস্বত্ব কাঠামোয় যেতে হবে। কিন্তু স্থানীয় শিল্পকে প্রস্তুত না করে কঠোর নীতি প্রয়োগ করলে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তিনি বলেন, নতুন আমদানি নীতিতে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান নেয়া জরুরি। এক দিকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগের স্বার্থ রক্ষা করতে হবে, অন্য দিকে দেশীয় শিল্পের বিকাশের সুযোগও নিশ্চিত করতে হবে।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্থানীয় শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে সরকারকে গবেষণা তহবিল বৃদ্ধি, প্রযুক্তি উদ্ভাবনে কর ছাড়, বিশ্ববিদ্যালয়-শিল্পখাত সহযোগিতা এবং দেশীয় ব্র্যান্ড উন্নয়নে বিশেষ সহায়তা দিতে হবে। একই সাথে আমদানি নীতিতে এমন কাঠামো প্রয়োজন, যাতে আন্তর্জাতিক আইপিআর বাধ্যবাধকতা পূরণ হলেও দেশের উৎপাদন ও কর্মসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।

তারা বলছেন, সঠিক পরিকল্পনা ছাড়া নতুন মেধাস্বত্ব শর্ত কার্যকর হলে স্বল্পমেয়াদে শিল্প খাতে ব্যয় বৃদ্ধি, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার সঙ্কট এবং বাজারে পণ্যমূল্য বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় উদ্ভাবন ও প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প উন্নয়নের সুযোগও তৈরি হতে পারে। ফলে প্রস্তাবিত নীতির চূড়ান্ত রূপ নির্ধারণে সরকার, ব্যবসায়ী ও শিল্প উদ্যোক্তাদের মধ্যে সমন্বিত আলোচনা এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।