বিদ্যুৎ বিতরণ বেসরকারি খাতে দিতে চায় সরকার

পেট্রোলিয়াম আমদানিও উন্মুক্ত করার ইঙ্গিত

Printed Edition

বিশেষ সংবাদদাতা

দেশের বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কারের পরিকল্পনা করছে সরকার। বিদ্যুৎ উৎপাদনে সরকারের ভূমিকা বজায় রেখে গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুৎ বিতরণের দায়িত্ব ধীরে ধীরে বেসরকারি খাতের হাতে তুলে দেয়ার চিন্তা করা হচ্ছে। একই সাথে পেট্রোলিয়াম পণ্য আমদানির ক্ষেত্রেও সরকারি একচেটিয়া ব্যবস্থার পরিবর্তে প্রতিযোগিতামূলক বাজার গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ গতকাল বুধবার ঢাকায় অনুষ্ঠিত ‘এনার্জি সিকিউরিটি অ্যান্ড ট্রান্সফরমেশন অব বাংলাদেশ’ শীর্ষক সম্মেলনে এসব পরিকল্পনার কথা জানান।

মন্ত্রী বলেন, সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদন করে পাইকারি পর্যায়ে সরবরাহ করতে পারে, তবে গ্রাহকপর্যায়ে বিদ্যুৎ বিতরণের কাজটি বেসরকারি খাতের মাধ্যমে পরিচালিত হলে সেবার মান, জবাবদিহিতা এবং বিল আদায়সহ ক্ষেত্রেই উন্নতি হবে। তিনি বলেন, ‘আমি সব বিতরণ কোম্পানিকে বেসরকারীকরণ করতে চাই। সরকার খুচরা ব্যবসা করতে পারে না। এই দায়িত্ব বেসরকারি উদ্যোক্তাদের হাতে গেলে দক্ষতা বাড়বে এবং সরকারের আর্থিক চাপ কমবে।’ তিনি জানান, এ বিষয়ে নীতিগতভাবে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে ইতিবাচক সম্মতি পাওয়া গেছে। এখন দেশীয় উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে প্রস্তাব আহ্বান করা হচ্ছে। উপযুক্ত প্রস্তাব পেলে সরকার তা যাচাই-বাছাই করে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেবে।

বিদ্যুৎমন্ত্রী বলেন, বিশ্বের অনেক দেশেই বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণ আলাদা কাঠামোর মাধ্যমে পরিচালিত হয়। বাংলাদেশের উদ্যোক্তারাও একই ধরনের দায়িত্ব দক্ষতার সাথে পালন করতে পারবেন বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। বর্তমানে দেশে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি), ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ডিপিডিসি), ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি (ডেসকো), ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ওজোপাডিকো), নেসকো এবং বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি) বিদ্যুৎ বিতরণের দায়িত্ব পালন করছে। সরকারের নতুন পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। মন্ত্রী বলেন, বিতরণ ব্যবস্থা বেসরকারি খাতে গেলে সবচেয়ে বেশি সুফল মিলবে রাজস্ব আদায়ে। বর্তমানে বিদ্যুৎ বিল বকেয়া এবং সিস্টেম লস কমাতে সরকারকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে হয়। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো লাভ-লোকসানের ভিত্তিতে পরিচালিত হওয়ায় তারা বিল আদায় এবং সেবার মান নিশ্চিত করতে আরো কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে সরকারের ধারণা।

সম্মেলনে বিদ্যুৎ খাতের পাশাপাশি জ্বালানি খাতেও বড় ধরনের সংস্কারের ইঙ্গিত দেন ইকবাল হাসান মাহমুদ। তিনি বলেন, পেট্রোলিয়াম পণ্য আমদানির ক্ষেত্রেও সরকার একমাত্র আমদানিকারক হিসেবে থাকবে- এমন নীতি দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর নাও হতে পারে। তাই বেসরকারি খাতকে পেট্রোলিয়াম আমদানির সুযোগ দেয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। মন্ত্রী বলেন, ‘সবসময় কেন সরকারকেই পেট্রোলিয়াম পণ্য আমদানি করতে হবে? বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে সুযোগ দিলে প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হবে, বাজার আরো গতিশীল হবে এবং সরকারের ওপর আর্থিক চাপও কমবে।’ তিনি জানান, সরকারের জ্বালানি রূপান্তর পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার দ্রুত বাড়ানো। বর্তমান সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই দেশে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ লক্ষ্যে বড় আকারের সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের পাশাপাশি শহরাঞ্চলে ক্লাস্টারভিত্তিক রুফটপ সোলার কর্মসূচি চালু করা হবে। এই মডেলে বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা ভবনের ছাদে সৌর প্যানেল স্থাপন, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করবেন। নেট-মিটারিং ব্যবস্থার মাধ্যমে উৎপাদিত বিদ্যুতের মূল্য সরাসরি গ্রাহকদের কাছ থেকে আদায় করা হবে। মন্ত্রী আরো জানান, যেসব ভবনের মালিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করবেন, তাদের পৌর কর বা মিউনিসিপ্যাল ট্যাক্সে বিশেষ ছাড় দেয়া হতে পারে। অন্য দিকে যেসব ভবনে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তা করা হবে না, তাদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত কর আরোপের বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে। এর মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব জ্বালানির ব্যবহার উৎসাহিত করতে চায় সরকার। বড় আকারের সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য দেশের বিভিন্ন স্থানে ইতোমধ্যে উপযুক্ত জমি চিহ্নিত করা হয়েছে বলে জানান মন্ত্রী। আগামী আগস্ট বা সেপ্টেম্বরের মধ্যে এসব প্রকল্পের জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হতে পারে। তিনি জানান, কয়েকটি চীনা প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে এসব প্রকল্পে বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করেছে।