- ‘তেল সংসদে আছে, বাইরে নাই’-বিরোধীদলীয় নেতা
- দেশে তেল ও গ্যাসের কোনো সঙ্কট নেই -স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
দেশের জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে জাতীয় সংসদে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে তীব্র বাগি¦তণ্ডা হয়েছে। বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান জ্বালানি সঙ্কটকে ‘সবচেয়ে জ্বলন্ত ইস্যু’ আখ্যা দিয়ে অধিবেশন মুলতবি রেখে পূর্ণাঙ্গ আলোচনার দাবি জানালেও সরকারপক্ষ তা নাকচ করে বিকল্প বিধিতে আলোচনার প্রস্তাব দেয়। এ নিয়ে উভয় পক্ষের যুক্তি-পাল্টা যুক্তিতে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে সংসদের পরিবেশ। একপর্যায়ে বিরোধীদলীয় নেতার মুখে উচ্চারিত হয় আলোচিত মন্তব্য ‘তেল সংসদে আছে, বাইরে নাই’।
গতকাল সোমবার সংসদের প্রথম বৈঠকে এ ঘটনা ঘটে। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। আলোচনায় অংশ নেন বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
জনগণের জন্য এসেছি, কথা বলার সুযোগ চাই
অধিবেশন মুলতবি করে জ্বালানি সঙ্কট নিয়ে আলোচনার সুযোগ না দেয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করে বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান বলেন, জনগণের সমস্যা তুলে ধরার জন্যই তারা সংসদে এসেছেন। সেই সুযোগ না থাকলে সংসদে থাকার উদ্দেশ্যই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
তিনি বলেন, ‘জনগণ তো তাদের প্রয়োজনে আমাদের এখানে পাঠিয়েছে, আমাদের প্রয়োজনে তো এখানে আসি নাই। সেই প্রয়োজনই যদি পূরণ করতে না পারলাম, তবে এই সংসদে থাকার কোনো সার্থকতা নাই।’
সরকারের বক্তব্যের সাথে বাস্তবতার অসামঞ্জস্য তুলে ধরে তিনি বলেন, সরকার দাবি করছে দেশে জ্বালানি সঙ্কট নেই, কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। মানুষের মধ্যে এ নিয়ে অসন্তোষ বাড়ছে। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য হাইকোর্টের মতো সংবেদনশীল জায়গায় ভার্চুয়ালি আদালত পরিচালিত হচ্ছে- যা সঙ্কটের ইঙ্গিত বহন করে।
তেল সংসদে আছে, বাইরে নাই
সরকারের বিবৃতির সমালোচনা করে ডা: শফিকুর রহমান বলেন, ‘একদিকে বলা হচ্ছে তেলের কোনো সঙ্কট নাই, অন্য দিকে বাস্তবে যা ঘটছে তা সম্পূর্ণ ভিন্ন।’ এ সময় তিনি মন্তব্য করেন, ‘তেল সংসদে আছে, বাইরে নাই। সঙ্কটটা সংসদের ভেতরে না, বাইরে।’
তিনি আরো বলেন, বিরোধী দল কোনো দোষারোপ করতে চায় না; বরং পরিস্থিতি মোকাবেলায় গঠনমূলক ভূমিকা রাখতে চায়। এ জন্য তিনি তার মুলতবি প্রস্তাবটি নিষ্পত্তি না করে নির্ধারিত সময়ে পূর্ণাঙ্গ আলোচনার সুযোগ দেয়ার আহ্বান জানান।
বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, এই মুহূর্তে দেশের সবচেয়ে গুরুতর সমস্যা জ্বালানি। এই বিষয়ে খোলামেলা আলোচনা হলে সঠিক তথ্য সামনে আসবে এবং জনগণের কাছে দায়বদ্ধতা নিশ্চিত হবে।’
তিনি স্পিকারকে অনুরোধ করে বলেন, বিষয়টি সংসদ নেতার উপস্থিতিতে নির্দিষ্ট দিনে আলোচনার জন্য নির্ধারণ করা হোক।
সঙ্কট নেই, পরিসংখ্যানই প্রমাণ
বিরোধী দলীয় নেতার বক্তব্যের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, দেশে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের কোনো সঙ্কট নেই এবং এ বিষয়ে পরিসংখ্যান ইতোমধ্যে উপস্থাপন করা হয়েছে। তিনি বলেন, বিরোধী দলীয় নেতা যে প্রস্তাব উত্থাপন করেছেন তা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবে অধিবেশন মুলতবি করে আলোচনার প্রয়োজন আছে কি না, সেটি বিবেচনার বিষয়।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদীয় রীতিনীতির প্রসঙ্গ টেনে বলেন, মুলতবি প্রস্তাব সাধারণত ট্রেজারি বেঞ্চের কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যে আনা হয়- যা ব্রিটিশ সংসদীয় ঐতিহ্যের অংশ। বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে এ ধরনের প্রস্তাব খুব কমই আলোচিত হয়েছে। বর্তমান অধিবেশনেই দু’টি মুলতবি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়েছে, যা একটি ব্যতিক্রমী নজির।
তিনি বলেন, ‘আরেকটি মুলতবি প্রস্তাব গ্রহণ করলে ভবিষ্যতে এটি একটি নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি করবে, যা সংসদের কার্যক্রমে প্রভাব ফেলতে পারে।’
মূল্যবৃদ্ধি ও নীতিগত অবস্থান
জ্বালানি পরিস্থিতি প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় সরকার চেষ্টা করেছে জ্বালানি তেলের মূল্য সহনীয়পর্যায়ে রাখতে। তবে জাতীয় অর্থনীতি যখন তা বহন করতে পারছিল না, তখন সামান্য মূল্যবৃদ্ধি করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘মূল্য কম থাকলে অপচয় বা পাচারের প্রবণতা তৈরি হয়। সেটি নিয়ন্ত্রণে আনতেই কিছুটা মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে।’
মন্ত্রী আরো বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে জ্বালানি নিয়ে আতঙ্কের কোনো কারণ নেই এবং এটি সঙ্কট নয়, বরং একটি ব্যবস্থাপনার বিষয়।
বিকল্প আলোচনার প্রস্তাব
অধিবেশন মুলতবি না করে বিকল্প পদ্ধতিতে আলোচনা করার প্রস্তাব দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি ৬৮ বা ৭১ বিধির আওতায় সংক্ষিপ্ত আলোচনার সুযোগ দেয়ার সুপারিশ করেন, যাতে সংসদীয় কার্যক্রম ব্যাহত না হয় এবং একই সাথে বিষয়টি নিয়েও আলোচনা সম্ভব হয়। তিনি বলেন, ‘সংক্ষিপ্ত আলোচনায় বিরোধী দলীয় নেতা বক্তব্য রাখবেন, মন্ত্রী বিবৃতি দেবেন এবং প্রয়োজন হলে প্রশ্নোত্তরও হতে পারে।’
স্পিকারের সমঝোতার উদ্যোগ
উভয় পক্ষের বক্তব্য শোনার পর ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, বিরোধী দলীয় নেতা ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী-দু’জনেই আলোচনায় আগ্রহী। তাই সংসদ মুলতবি না করে ৬৮ বিধিতে সাধারণ আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি উত্থাপন করা যেতে পারে।
তিনি বলেন, ইতোমধ্যে এ বিষয়ে প্রায় আধা ঘণ্টা আলোচনা হয়েছে এবং সংসদে একটি সহনশীল পরিবেশ বজায় রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী এক ঘণ্টার সাধারণ আলোচনার সুযোগ দেয়া যেতে পারে।
পরে বিরোধীদলীয় নেতা সংসদ নেতার উপস্থিতিতে আলোচনার দাবি পুনর্ব্যক্ত করেন। জবাবে ডেপুটি স্পিকার তাকে নতুন করে নোটিশ দেয়ার পরামর্শ দেন এবং বিষয়টি আলোচনার উপযোগী পরিবেশ তৈরি করার আশ্বাস দেন।
রাষ্ট্রপতির ভাষণ সম্পর্কে আনীত ধন্যবাদ প্রস্তাবের উপর আলোচনা
হবিগঞ্জ-৪ আসন থেকে নির্বাচিত সরকারদলীয় সংসদ সদস্য এস এম ফয়সাল বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নানা উন্নয়নমুখী উদ্যোগে দেশে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। বক্তব্যে তিনি তার এলাকার চা শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন ও সমস্যাদি সমাধানে সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
রংপুর-৩ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মাহফুজুর রহমান বেলাল বলেন, আমার নির্বাচনী এলাকা খুবই অবহেলিত। এখানকার মানুষ খুবই গরিব। এখানে ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, চিকিৎসাসেবার ব্যবস্থা নেই। যোগাযোগ ব্যবস্থা একেবারেই অনুন্নত। তিনি সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
ফরিদপুর-৩ থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য নায়াব ইউসুফ আহমেদ বলেন, সংসদে আমরা শুধু সমস্যার কথাই শুনি। এর কারণ হচ্ছে, গত ১৭ বছর দেশে উন্নয়নের নামে জনগণকে ধোঁকা দেয়া হয়েছে। মানুষ বঞ্চিত ও লাঞ্ছিত হয়েছেন। আগামীতে ইনশা আল্লাহ্ দেশ এগিয়ে যাবে।
দিনাজপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য সৈয়দ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, দিনাজপুরে ব্যাপক উন্নয়ন দরকার। এই জেলাকে পর্যটনের জন্য প্রস্তুত করা সম্ভব।
মৌলভীবাজার-১ আসনের সংসদ সদস্য নাছির উদ্দিন আহমেদ বলেন, দেশের চা শিল্প আজ ধ্বংসের দ্বার প্রান্তে। এই শিল্পকে রক্ষা করতে হবে। এই শিল্পের সাথে জড়িত চা শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন খুবই জরুরি।
চট্টগ্রাম-৮ আসনের সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহ বলেন, তার এলাকায় অবস্থিত কালুরঘাট সেতুর অবস্থা খুবই খারাপ। এটির দ্রুত সংস্কার করা দরকার। এ সময় তিনি তার এলাকার বন্ধ শিল্প প্রতিষ্ঠান চালুর দাবি জানান।
ঝিনাইদহ-৩ আসন থেকে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মতিয়ার রহমান বলেন, গত ফ্যাসিস্ট সরকার গান পাউডার দিয়ে মানুষ পুড়িয়ে মেরেছে। তার কোনো প্রতিবাদ রাষ্ট্রপতি করেননি। তাই তাকে ধন্যবাদ দেয়ার প্রশ্নই আসে না। তিনি হাদি হত্যার বিচার চেয়ে তার নির্বাচনী এলাকার সমস্যা সমাধানে সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
এ ছাড়াও ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৪ আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য মুশফিকুর রহমান, চট্টগ্রাম-১২ আসনের সংসদ সদস্য এনামূল হক, চট্টগ্রাম-১৪ আসনের সংসদ সদস্য জসিম উদ্দিন আহমেদ বক্তব্য রাখেন। তারা চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক ছয় লেনে উন্নীত করার দাবি জানান।
রংপুর-৫ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মো: গোলাম রব্বানি বলেন, গত ১৭ বছর দেশে গণতন্ত্র ছিল না। নির্বাচন থাকলেও ভোটাধিকার ছিল না। আমরা ভয়াবহ দুঃশাসন দেখেছি। আমরা দেখেছি কিভাবে বিনা দোষে ফাঁসি কার্যকর করা হয়, কিভাবে বুয়েটের মেধাবী শিক্ষার্থীকে হত্যা করা হয়েছে। পরে তিনি তার এলাকার নানাবিধ সমস্যা সমাধানে সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
ময়মনসিংহ-৮ আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুল্লাহেল মাজেদ বাবু বলেন, আগের মতো এখন আবার মব কালচার সৃষ্টি হয়েছে। এসব বন্ধ করতে হবে।
নওগাঁ-৪ থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য একরামুল বারী টিপু বলেন, গত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে দেশ ছিল গুম খুনের রাজ্য। কিভাবে রাজনীতিবিদদের আয়না ঘরে রেখে নির্যাতন করা হয়েছে তা বিশ্ব দেখেছে।
দিনাজপুর-৫ (পার্বতীপুর ও ফুলবাড়ী) আসনের স্বতন্ত্র এমপি এ জেড এম রেজওয়ানুল হক বলেন, তার এলাকায় পাকা রাস্তা নেই বললেই চলে। শিক্ষা ও চিকিৎসাব্যবস্থা খুবই খারাপ।
এ ছাড়া রাষ্ট্রপতির ভাষণের উপর আরো বক্তব্য রাখেন রংপুর-৬ আসনের জামায়াত দলীয় এমপি মো: নুরুল আমীন, কুমিল্লা-৭ আতিকুল আলম।
আজ মঙ্গলবার বিকেল ৩টা পর্যন্ত অধিবেশন মুলতবি করা হয়।



