ঢাংমারীর অরণ্যছায়া

Printed Edition
ঢাংমারীর অরণ্যছায়া
ঢাংমারীর অরণ্যছায়া

গোলাম রব্বানী টুপুল

সুন্দরবনের ঢাংমারী খালের তীরে ভোরের কুয়াশা তখনো ভাঙেনি। নোনা পানির ওপর ভাসছিল কাদামাটির গন্ধ, আর দূরে কেওড়া-গেওয়া গাছের ফাঁকে ফাঁকে শোনা যাচ্ছিল অচেনা পাখির ডাক। ঠিক সেই নিস্তব্ধতার বুকচিরে লুকিয়ে ছিল মানুষের পাতা মৃত্যু-চোরা শিকারিদের ফাঁদ। হরিণ শিকারের আশায় পাতা সেই লোহার ফাঁদে আটকে পড়েছে বনজগতের রাজা, বিশ্ব কাঁপানো রয়েল বেঙ্গল টাইগার। সকাল গড়াতেই কয়েকজন মওয়ালে নৌকা ভিড়িয়েছিল খালের ধারে। মধু খোঁজাই ছিল তাদের কাজ, কিন্তু সেদিন যা দেখল, তা কোনো দিন ভুলবার নয়। কেওড়া গাছের গোড়ায় রক্তাক্ত মাটি, আর তার মাঝখানে ফাঁদে ধরা বিশাল এক বাঘ। চোখে আগুন, শরীর কাঁপছে যন্ত্রণায়, আর গর্জনে কেঁপে উঠছে পুরো বন। মওয়ালেরা বোবা হয়ে গেল। ‘এটা কোনো সাধারণ ঘটনা না’, ফিসফিস করে বলল বয়স্ক মওয়ালে করিম। ‘বাঘ ফাঁদে পড়ে এর ফল ভালো হয় না।’ খবর ছড়াতে দেরি হলো না। বন বিভাগের লোকজন আসার আগেই বন যেন আরো অশান্ত হয়ে উঠল। ঠিক তখনই বনের ভেতর থেকে ভেসে এলো আরেক ভয়াবহ সংবাদ- আবার শুরু হয়েছে অপহরণ। গত এক সপ্তাহে তিনজন মওয়াল আর একজন জেলে নিখোঁজ। না কোনো লাশ, না মুক্তিপণ- শুধু খালের পাড়ে পড়ে থাকা ছেঁড়া জাল আর রক্তমাখা গামছা। কে করছে এসব? চোরা শিকারিরা? নাকি পুরনো সেই কুখ্যাত দস্যু দল, যাদের সবাই শেষ হয়ে গেছে ভেবেছিল? বনরক্ষী অফিসার রাশেদ জানতেন এই দুই ঘটনার মাঝে গভীর সম্পর্ক আছে। বাঘকে ফাঁদে ফেলা কোনো ছোট অপরাধ নয়। এটা ছিল বনের শক্তির বিরুদ্ধে ঘোষণা। রাত নামতেই ঢাংমারী আরো ভয়ঙ্কর হয়ে উঠল। জোয়ারের পানিতে খাল ফুলে উঠল, আর অন্ধকারের ভেতর কোথাও থেকে ভেসে এলো মানুষের চাপা আর্তনাদ। হঠাৎ ঝোপের ভেতর নড়াচড়া। রাশেদ হাত তুলতেই সবাই থমকে গেল। ঠিক তখনই চাঁদের আলোয় দেখা গেল একজন নয়, বেশ কয়েকজন মানুষ বাঘের গর্জনের শব্দ নকল করে এগিয়ে আসছে। মানুষের মুখে বাঘের মুখোশ। ‘বন আমাদের’, তাদের নেতা গর্জে উঠল, ‘আর যে বনকে বাঁচাতে আসবে, সে-ই হারিয়ে যাবে ঢাংমারীর অন্ধকারে।’

ফাঁদে পড়া বাঘটি তখন শেষ শক্তি দিয়ে গর্জে উঠল, সে যেন বুঝে গেছে, আসল শিকার আজ মানুষই। সেই গর্জনে কেঁপে উঠল সুন্দরবন। আর শুরু হলো এক ভয়ঙ্কর লড়াই, বন বনাম মানুষের লোভ। ঢাংমারীর সেই রাতে কে বাঁচল, কে হারাল, তা আজো সুন্দরবনের কেওড়া গাছেরা জানে। কিন্তু খালের জলে এখনো ভেসে আসে এক প্রশ্ন, সুন্দরবন কি মানুষকে তাড়াবে, নাকি মানুষই শেষ পর্যন্ত বনের শিকার হবে? সেই রাতের পর সুন্দরবন আর আগের মতো রইল না। ফাঁদে পড়া বাঘটিকে বাঁচাতে গিয়ে বন বিভাগের দুজন সদস্য আহত হলো। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, ভোর হতে না হতেই বাঘটি উধাও। ফাঁদ কাটা। রক্তের দাগ খালের দিকে গেছে। কেউ বাঘটাকে ছাড়িয়েছে। কিন্তু কেন? পরের দিন সকালে ঢাংমারী খালের উল্টো পাড়ে পাওয়া গেল একটি লাশ। মুখ নেই। শরীরটা অদ্ভুতভাবে ছেঁড়া, ঠিক বাঘের থাবার মতো, কিন্তু থাবার দাগগুলো অস্বাভাবিক নিয়মে সাজানো। বনরক্ষী রাশেদ কুঁকড়ে গেল। ‘এটা বাঘের কাজ না’, সে চাপা স্বরে বলল। ‘এটা কোনো বার্তা।’ লাশের গলায় ঝোলানো ছিল একটি কাঠের টুকরো।

তাতে পোড়া দাগে লেখা, ‘বাঘ দেখালে বাঘ মরবে। এরপর অপহরণ বেড়ে গেল। মধু সংগ্রহ করতে যাওয়া লোকেরা ফেরে না। রাতে খালপাড়ে আগুন জ্বলে ওঠে, তারপর নিভে যায়। কখনো দূরে শোনা যায় বাঘের গর্জন, কিন্তু শব্দটা একই রকম, যেন কেউ অনুশীলন করছে। গ্রামের বুড়োরা ফিসফিস করে বলতে শুরু করল, ‘ওরা মানুষ না।’ ‘ওরা বনের ভেতর বড় হয়েছে। ওরা বাঘের ছায়া। রাশেদ এক রাতে গোপনে ঢুকল গভীর জঙ্গলে। সাথে ছিল ইনফ্রারেড ক্যামেরা। হঠাৎ ক্যামেরায় ধরা পড়ল পাঁচটি উজ্জ্বল চোখ। মানুষ। কিন্তু হাঁটার ভঙ্গি পশুর মতো, হালকা, নিঃশব্দ। তাদের শরীরে বাঘের নখের দাগ কাটা, মুখে আঁকা ডোরাকাটা রেখা। আর সবচেয়ে ভয়ঙ্কর তাদের সাথে হাঁটছে সেই আহত রয়েল বেঙ্গল টাইগার। পোষা নয়। ভয় পায় না। বরং নির্দেশ মানছে। রাশেদের বুক ঠাণ্ডা হয়ে গেল।

‘ওরা বাঘ ব্যবহার করছে’, সে বুঝল, ‘মানুষ অপহরণ করছে আর দোষ চাপাচ্ছে বনের ওপর।’ হঠাৎ পেছন থেকে গর্জন। একজন নয় তিনটি বাঘের গর্জন একসাথে। কিন্তু ক্যামেরায় দেখা গেল বাঘ মাত্র একটি। বাকি শব্দগুলো মানুষের গলা। রাশেদ দৌড়াতে গিয়েও পারল না। চারদিক থেকে ঘিরে ধরল ছায়ারা। একজন এগিয়ে এসে মুখোশ খুলল। সে ছিল সাবেক বনরক্ষী হারুন। যে দশ বছর আগে সুন্দরবন থেকে বরখাস্ত হয়েছিল চোরাশিকারের অভিযোগে। ‘এই বন আমাদের চাকরি কেড়ে নিয়েছে’, হারুন দাঁতে দাঁত চেপে বলল, ‘এখন আমরা বনকেই ব্যবহার করব।’

পরদিন ভোরে বন বিভাগের রেডিও চুপচাপ হয়ে গেল। রাশেদের কোনো খোঁজ নেই।

ঢাংমারী খালের জলে শুধু ভাসছিল তার টুপি। ভেতরে গোঁজা ছিল একটি নোট ‘শিকার শুরু হয়েছে। এবার মানুষ বন বাঁচাতে এলে, বনই তাকে খাবে।’ ঠিক তখনই দূরে জঙ্গলের ভেতর থেকে শোনা গেল আহত বাঘের গর্জন আর তার সাথে মিশে গেল মানুষের হাসি। সুন্দরবনের অন্ধকার আরো ঘন হলো। আর প্রশ্নটা বদলে গেল এটা কি এখনো বন বনাম মানুষ, নাকি মানুষই বনের ভেতর সবচেয়ে ভয়ঙ্কর প্রাণী?