অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
ব্যাংকের পর এবার বীমা খাতেও দরপতন ঘটছে। আর এ দুই খাতের দরপতনে সূচক হারাচ্ছে পুঁজিবাজারগুলো। গতকাল এ দু’টি খাতে হাতেগোনা কিছু কোম্পানি ছাড়া বেশির ভাগ দরপতনের শিকার হয়েছে। মূলধনের দিক থেকে এগিয়ে থাকার কারণে পুঁজিবাজারে এ দুই খাতের মূল্যবৃদ্ধি যেমন সূচককে দ্রুত বাড়িয়ে দেয় তেমনি এদের দরপতনের দ্রুত প্রতিফলন ঘটে দিনের সূচকে। পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, সম্প্রতি এ দু’টি খাতের বেশির ভাগ কোম্পানি বিগত অর্থবছরের লভ্যাংশ ঘোষণা শেষ করেছে। প্রকাশ করেছে বিগত অর্থবছরের আর্থিক প্রতিবেদন। আবার কোনো কোনোটি নতুন অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকের আর্থিক প্রতিবেদনও প্রকাশ করেছে যা বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশার সাথে যাচ্ছে না। এ কারণে দরপতনের শিকার হচ্ছে এ দু’টি খাত।
বুধবার লেনদেন শুরুর কিছুক্ষণের মধ্যেই বিক্রয়চাপে পড়ে দুই পুঁজিবাজার। ঢাকায় দিনের শুরুতে সূচকের উন্নতি রেকর্ড করা হয় প্রায় ২৭ পয়েন্ট। ঘড়ির কাঁটায় তখন ১০ টা বেজে দশ মিনিট। এর পরই শুরু হয় বিক্রয়চাপ। ব্যাংক দিয়ে শুরু হওয়া এ দরপতন একপর্যায়ে বীমা খাতেও প্রভাব ফেলে। অন্য খাতগুলোতে কিছু কিছু কোম্পানির মূল্যবৃদ্ধি পেলেও প্রধান এ দু’খাতের দরপতন সামাল দিতে ব্যর্থ হয়েছে। লেনদেন যতই এগিয়ে যাচ্ছিল ততই বাড়ছিল বিক্রয়চাপ। ফলে দিনের শুরুতে বৃদ্ধি পাওয়া সূচক ধরে রাখতে পারেনি বাজারগুলো।
প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ১৮ দশমিক ৮৫ পয়েন্ট অবনতির শিকার হয়। ৫ হাজার ২৬৭ দশমিক ২২ পয়েন্ট থেকে সকালে লেনদেন শুরু করা সূচকটি দিনশেষে নেমে আসে ৫ হাজার ২৪৮ দশমিক ৩৬ পয়েন্টে। একই সময় ডিএসইর দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহ সূচকের অবনতি ঘটে যথাক্রমে ৮ দশমিক ০৭ ও ১ দশমিক ৯২ পয়েন্টে। অপর দিকে দেশের দ্বিতীয পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সার্র্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই ১৪ পয়েন্ট অবনতির শিকার হয়। বিশেষায়িত দুই সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের অবনতি ঘটে যথাক্রমে ১০ দশমিক ৫৬ ও দশমিক ৩৯ পয়েন্ট।
সূচকের পাশাপাশি গতকাল অবনতি ঘটে ডিএসইর লেনদেনেও। এদিন বাজারটি ৭৬৭ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করে যা আগের দিনের চাইতে ৫৫ কোটি টাকা কম। মঙ্গলবার ডিএসইর লেনদেন ছিল ৮২২ কোটি টাকা। আর এভাবে ১৫টি কর্মদিবস পর ডিএসইর লেনদেন আবার ৮০০ কোটি টাকার নিচে নেমে আসে। গত ১৩ এপ্রিলের পর পুঁজিবাজারটির লেনদেন আর ৮০০ কোটির নিচে নামেনি। মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের ভয়াবহতার মধ্যেও বাজারটি সম্মানজনক লেনদেন ধরে রাখে। তবে লেনদেন কিছুটা বেড়েছে চট্টগ্রাম শেয়ারবাজারে। সিএসইতে ২০ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি হয়েছে গতকাল যা আগের দিনের চেয়ে পাঁচ কোটি টাকা বেশি। মঙ্গলবার সিএসইর লেনদেন ছিল ১৫ কোটি টাকা।
এ দিকে সিকিউরিটিজ আইন লঙ্ঘনের দায়ে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সদস্য সোনালী সিকিউরিটিজ লিমিটেডের ট্রেডিং রাইট এনটাইটেলমেন্ট সার্টিফিকেট (ট্রেক) বা পুঁজিবাজারে লেনদেনের সদস্যপদ বাতিল করেছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)। সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের বিধিমালা লঙ্ঘনের কারণে প্রতিষ্ঠানটির বিরূদ্ধে এ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। গতকাল ডিএসইর ওয়েবসাইটের মাধ্যমে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট সবাইকে জানানো হয়েছে।
ডিএসই জানিয়েছে, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (ট্রেডিং রাইট এনটাইটেলমেন্ট সার্টিফিকেট) বিধিমালা, ২০২০-এর বিধি ৩(২)(গ) লঙ্ঘন করায় প্রতিষ্ঠানটির ট্রেক (নম্বর-২৬১) বাতিল করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। মূলত বিধিমালা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় বিধি ৭(৩) অনুযায়ী এ পদক্ষেপ নিয়েছে ডিএসই কর্তৃপক্ষ।
একই সাথে সোনালী সিকিউরিটিজের মাধ্যমে লেনদেন করা বিনিয়োগকারী ও গ্রাহকদের স্বার্থ রক্ষায় ডিএসই বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছে। এতে বিনিয়োগকারীদের নিজ নিজ হিসাবে থাকা নগদ অর্থ ও শেয়ারের ব্যালান্স পরীক্ষা করতে বলা হয়েছে। একই সাথে অমীমাংসিত লেনদেন থাকলে তা দ্রুত নিষ্পত্তি করার পরামর্শ দেয়া হয়েছে।
ডিএসই আরো জানিয়েছে, সোনালী সিকিউরিটিজের কাছে কোনো বিনিয়োগকারী বা ব্যক্তির পাওনা বা অভিযোগ থাকলে তা ২১ মের মধ্যে লিখিতভাবে জানাতে হবে। বিনিয়োগকারীরা প্রয়োজনীয় নথিপত্রসহ ডিএসইর প্রধান নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা (সিআরও) বরাবর আবেদন করতে পারবেন। এ ছাড়া বিএসইসির কাস্টমার কমপ্লেন মডিউলের মাধ্যমেও অভিযোগ জমা দেয়া যাবে।
মঙ্গলবারের মতো গতকালও ডিএসইর লেনদেনের শীর্ষ কোম্পানি ছিল সিরামিক খাতের মুন্নু সিরামিকস। ৩৮ কোটি ৯৭ লাখ টাকায় কোম্পানিটির ৩৮ লাখ ১৯ হাজার শেয়ার হাতবদল হয় গতকাল। ৩২ কোটি ৭২ লাখ টাকায় ৪৬ লাখ ২ হাজার শেয়ার বেচাকেনা করে লেনদেনের দ্বিতীয় স্থানে উঠে আসে প্রকৌশল খাতের ডমিনেজ স্টিল বিল্ডিং সিস্টেমস। ডিএসইর লেনদেনে শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে মালেক স্পিনিং, টেকনোড্রাগস, জিকিউ বলপেন, লাভেলো আইসক্রিম, সিটি ব্যাংক, বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস, উত্তরা ব্যাংক ও মীর আকতার হোসাইন।
ডিএসইতে গতকাল মূল্যবৃদ্ধির শীর্ষেও ছিল মুন্নু সিরামিকস। ৯ দশমিক ৬৮ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি ঘটে সিরামিকস খাতের এ কোম্পানির। ৭ দশমিক ৬৩ শতাংশ মূল্যবৃৃদ্ধি পেয়ে এ তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে উঠে আসে এম হোসাইন স্পিনিং মিলস। মূল্যবৃদ্ধিতে শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে সিলকো ফার্মা, সিকদার ইন্স্যুরেন্স, এপেক্স স্পিনিং, সায়হাম টেক্সটাইলস, টেকনোড্রাগস, মালেক স্পিনিং, এপেক্স ট্যানারি ও জেএমআই হসপিটাল রিকুইজিটস।
ডিএসইতে দিনের দরপতনের শীর্ষে ছিল ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান ফারইস্ট ফিন্যান্স। ৮ দশমিক ৬৯ শতাংশ দর হারায় কোম্পানিটি। একই হারে দরপতনের শিকার ছিল এ খাতের আরো দুই কোম্পানি ইন্টারন্যাশনাল লিজিং ও প্রিমিয়ার লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্স। দরপতনে ডিএসইর শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে ইউনাইটেড ইন্স্যুরেন্স, বিআইএফসি, হামিদ ফেব্রিক্স, প্রাইম ফিন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট, বিডি ওয়েল্ডিং ইলেক্ট্রোড, তক্বাফুল ইন্স্যুরেন্স ও খুলনা পেপার অ্যান্ড প্রিন্টিং।



