নিজস্ব প্রতিবেদক
রাজধানীর সড়কগুলো এখন সাধারণ মানুষের জন্য যেন এক মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। গত সাড়ে ছয় বছরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ঢাকার রাস্তায় মৃত্যুর মিছিল থামছেই না। ২০২০ থেকে ২০২৬ সালের জুলাই মাস পর্যন্ত রাজধানীতে মোট এক হাজার ৮৪৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় এক হাজার ৩৮৪ জন নিহত এবং দুই হাজার ৪৮৮ জন আহত হয়েছেন। গতকাল শনিবার রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এই উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে।
রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, ডেমরা, মোহাম্মদপুর, কুড়িল বিশ্বরোড এবং বিমানবন্দর সড়ককে দুর্ঘটনার ‘হটস্পট’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব এলাকায় দুর্ঘটনার পেছনে মূলত যানবাহনের তুলনায় অপ্রতুল সড়ক এবং একই রাস্তায় দ্রুত ও ধীরগতির যানবাহনের মিশ্র চলাচল। ফুটপাথ হকারদের দখলে থাকা এবং প্রয়োজনীয় স্থানে ফুটওভারব্রিজ না থাকা বা ব্যবহার উপযোগী না হওয়া। পাশাপাশি সড়ক ব্যবহারকারীদের অসচেতনতা দায়ী।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, নিহতদের মধ্যে পুরুষের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি- এক হাজার ৩৪ জন, যা মোট নিহতের ৭৪ দশমিক ৭১ শতাংশ। এছাড়া ২১৯ জন নারী এবং ১৩১ জন শিশু প্রাণ হারিয়েছে। প্রতিবেদনে দেখা যায়, রাজধানীতে সড়ক দুর্ঘটনায় সবচেয়ে বেশি প্রাণ হারাচ্ছেন পথচারীরা। মোট নিহতের মধ্যে ৪২ দশমিক ৭৭ শতাংশ বা ৫৯২ জনই পথচারী। এর পরই রয়েছে মোটরসাইকেল আরোহীদের অবস্থান, যেখানে ৫৩৬ জন বা ৩৮ দশমিক ৭২ শতাংশ প্রাণ হারিয়েছেন। এছাড়া বাস, রিকশা ও সিএনজি চালক ও যাত্রীদের মধ্যে প্রাণহানির সংখ্যা ২৫৬ জন বা ১৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ। দুর্ঘটনার সময় বিশ্লেষণে দেখা গেছে, রাজধানীর সড়কগুলোতে রাতের বেলা ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ বা সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটে। এর পরই রয়েছে সকালের সময় ১৮ দশমিক ৬৪ শতাংশ দুর্ঘটনা। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ঢাকা শহরে কোনো বাইপাস রোড না থাকায় রাত ১০টার পর থেকে ভোর পর্যন্ত মালবাহী ভারী যানবাহনগুলো বেপরোয়া গতিতে চলাচল করে। ফলে রাস্তা পারাপারের সময় সাধারণ পথচারীরা দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন। এছাড়া দীর্ঘক্ষণ যানজটে আটকে থাকার ফলে চালকদের মধ্যে যে অসহিষ্ণুতা ও ধৈর্যহানি ঘটে, তাও দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ।
রাজধানীতে দুর্ঘটনার জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে ট্রাক, কাভার্ডভ্যান, পিকআপ ও ময়লাবাহী ট্রাক, যা মোট দুর্ঘটনার ৩৩ দশমিক ২৫ শতাংশ। এছাড়া মোটরসাইকেল ২৬ শতাংশ এবং বাস ২১ দশমিক ৭৫ শতাংশ দুর্ঘটনার জন্য দায়ী। বছর-ভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২০ সালে দুর্ঘটনায় ১২৬ জন নিহত হলেও ২০২৫ সালে এই সংখ্যা কিছুটা কমে ২২৯ জনে দাঁড়ায়, তবে দুর্ঘটনার সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে ২০২৪ ও ২০২৫ সালে আহতের সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ৪৮২ ও ৫১১ জন।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে রাজধানীতে ১২৪টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১২৬ জন প্রাণ হারিয়েছেন। পরবর্তী বছর ২০২১ সালে দুর্ঘটনার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১৩৭টিতে, যেখানে নিহতের সংখ্যা ছিল ১৪১ জন। ২০২২ সালে এই চিত্র আরো ভয়াবহ রূপ নেয়; এ বছর দুর্ঘটনার সংখ্যা দ্বিগুণের বেশি বেড়ে ২৬৮টিতে পৌঁছায় এবং প্রাণ হারান ২৫৬ জন। ২০২৩ সালে দুর্ঘটনার ধারা অব্যাহত থেকে ২৯৬টি দুর্ঘটনায় ২৪৯ জন নিহত হন। ২০২৪ সালে দুর্ঘটনার সংখ্যা প্রায় ৪০০-এর কাছাকাছি অর্থাৎ ৩৯৪টি পৌঁছে যায়, যাতে প্রাণ হারান ২৪৬ জন। গত বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালে দুর্ঘটনার সংখ্যা ছিল সর্বোচ্চ ৪০৭টি, যেখানে নিহতের সংখ্যা ছিল ২২৯ জন। চলতি ২০২৬ সালের প্রথম সাত মাসেই (জুলাই পর্যন্ত) ২২৩টি দুর্ঘটনায় ১৩৭ জন প্রাণ হারিয়েছেন।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কয়েকটি সুপারিশ করেছেন। তিনি জানান, রাজধানীর পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার জন্য দ্রুত রুট রেশনালাইজেশনের মাধ্যমে কোম্পানি-ভিত্তিক বাস সার্ভিস চালু করা প্রয়োজন। এছাড়া বিআরটিএ, বিআরটিসি, সিটি করপোরেশন ও ট্রাফিক পুলিশের মধ্যে যথাযথ সমন্বয়ের মাধ্যমে বহুমুখী কার্যক্রম পরিচালনার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।



