নিজস্ব প্রতিবেদক
আগামী সেপ্টেম্বর মাসে অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় সংসদের অধিবেশনে দেশের নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করা হবে বলে জানিয়েছেন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো: আসাদুজ্জামান। তিনি স্পষ্ট করেছেন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য এই মুহূর্তে জাতীয় সংসদের কোনো বিশেষ অধিবেশন ডাকার মতো জরুরি পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়নি। গতকাল শনিবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’ আয়োজিত এক পরামর্শ সভা শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী এ কথা জানান।
সদ্যবিদায়ী ২২তম রাষ্ট্রপতি মো: সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, রাষ্ট্রপতির মামলার বিষয়ে এখনই কোনো মন্তব্য করা সমীচীন হবে না।
২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন মো: সাহাবুদ্দিন। সংবিধান অনুযায়ী ২০২৮ সালের এপ্রিলে তার পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও, মেয়াদ শেষের প্রায় পৌনে দুই বছর আগেই শারীরিক অসুস্থতা ও স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে তিনি পদত্যাগ করেন। তার পদত্যাগের ফলে সৃষ্ট শূন্য পদে সংবিধানের নিয়ম অনুযায়ী বর্তমানে জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করছেন। একই সাথে সংবিধানের বাধ্যবাধকতা অনুযায়ী আগামী ৯০ দিনের মধ্যে জাতীয় সংসদের মাধ্যমে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সম্পন্ন করতে হবে।
সদ্য পদত্যাগী রাষ্ট্রপতি মো: সাহাবুদ্দিনের প্রায় তিন বছরের দায়িত্বকাল ছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম ঘটনাবহুল ও ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ অধ্যায়। তার মেয়াদকালেই চব্বিশের ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানের মুখে টানা ১৫ বছরের শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে। পরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সফল দায়িত্ব পালন শেষে অনুষ্ঠিত হয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। দেশের ইতিহাসে বিরল নজির গড়ে তিনি তার স্বল্প মেয়াদে শেখ হাসিনাসহ তিনজন সরকারপ্রধানকে শপথবাক্য পাঠ করান।
এর আগে সিরডাপ মিলনায়তনে মানবাধিকার সংস্থা ‘অধিকার’-এর পরামর্শ সভায় আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান জানান, বর্তমান সরকারের আমলে দেশে বিচারবহির্ভূত হত্যা প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে এবং গুমের বিষয়ে সরকার শতভাগ ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করছে।
তিনি জানান, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত রাজনৈতিক প্রতিহিংসাবশত দায়ের করা মামলাগুলো প্রত্যাহারে কাজ চলছে, যা এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। তবে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত দাবি করা হলেও ধর্ষণের কোনো মামলা প্রত্যাহার করা হবে না। অন্য দিকে মাদকের মামলাগুলো রাজনৈতিক হয়রানির উদ্দেশ্যে করা হয়েছিল কি না, তা যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।
আইনমন্ত্রী আরো বলেন, মানবাধিকার কমিশন আইন এবং গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনের চূড়ান্ত খসড়া তৈরি শেষ করে মন্ত্রিসভা কমিটিতে পাঠানো হয়েছে, যা আগামী জাতীয় সংসদ অধিবেশনে বিল আকারে উত্থাপিত হবে। এ ছাড়া বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রক্ষায় স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় যোগ্য ও দক্ষ বিচারক নিয়োগের ওপর জোর দেন তিনি। অতীতে ‘আমার দেশ’ সম্পাদক ড. মাহমুদুর রহমান, মানবাধিকারকর্মী আদিলুর রহমান খানসহ বিরোধীদলীয় রাজনৈতিক নেতাদের ওপর নিপীড়নের সময় বিচার বিভাগের নীরবতারও সমালোচনা করেন তিনি।
সিরডাপের অনুষ্ঠান শেষে আইনমন্ত্রী দুপুরে ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির প্রাঙ্গণে মহানগর সর্বজনীন পূজা কমিটির দ্বিবার্ষিক সম্মেলনে যোগ দেন। সেখানে তিনি বলেন, ধর্মের ভিত্তিতে মানুষকে বিভাজন করার সুযোগ নেই। ধর্মীয় পরিচয় যা-ই হোক, জাতীয়ভাবে সবার প্রথম পরিচয় ‘বাংলাদেশী’। দুর্গাপূজাসহ সব ধর্মীয় উৎসবে যেন বিশেষ নিরাপত্তা চাইতে না হয়, বরং সব নাগরিক যেন স্বাভাবিকভাবেই নিরাপদ বোধ করেন এমন রাষ্ট্রকাঠামো গঠনে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। একই সাথে ঢাকেশ্বরী মন্দিরের দখলকৃত জমি পুনরুদ্ধারে ভূমিদস্যুদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দেন আইনমন্ত্রী।
পৃথক এই অনুষ্ঠানগুলোতে ‘অধিকার’-এর সভাপতি ড. তাসমিন সিদ্দিকীর সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় ‘আমার দেশ’ সম্পাদক ড. মাহমুদুর রহমান, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম, সাবেক বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী এবং পূজা কমিটির সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী বিজন কান্তি সরকার, সংসদ সদস্য হামিদুর রহমান হামিদ ও পূজা উদযাপন পরিষদের নেতারা বক্তব্য রাখেন।



