স্বর্ণজয়ী অসীম এখন উবার চালক

Printed Edition
স্বর্ণজয়ী অসীম এখন উবার চালক
স্বর্ণজয়ী অসীম এখন উবার চালক

রফিকুল হায়দার ফরহাদ - যুক্তরাষ্ট্র থেকে

‘ভাই একটি চাকরির জন্য অনেক চেষ্টা করেছি। যে দলে খেলতাম সেই পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দফায় দফায় দেখা করেছি। অন্য বাহিনীর প্রধানদের সাথে সাক্ষাৎ করে চাকরি আবেদন করেছি। ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেলের সাথেও আমি দেখা করেছি। আমি এসএ গেমসসহ আন্তর্জাতিক আসরে স্বর্ণজয়ী অ্যারচার। কিন্তু কেউ আমাকে চাকরি দেয়নি। অন্য দিকে চাকরির বয়সও শেষ হয়ে আসছিল। তাই বাধ্য হয়েই চলে এসেছি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে।’ আফসোস আর দুঃখভরা কণ্ঠে কথাগুলো বলে গেলেন বাংলাদেশের স্বর্ণজয়ী অ্যারচার অসীম কুমার দাশ। যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কের জ্যাকসন হাইট বাংলাদেশী অধ্যুষিত এলাকা। সেখানেই দেখা কম্পাউন্ড ইভেন্টের এই অ্যারচারের সাথে। জ্যাকসন হাইটসেই থাকেন তিনি।

২০২৩ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ ছেড়ে উন্নত জীবনের সন্ধানে আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে চলে আসেন অসীম। বাংলাদেশের হয়ে পাঁচটি বিশ্বকাপ অ্যারচারি খেলা এবং দু’টি অ্যারচারি বিশ্বচ্যাম্পিয়নশিপে খেলা এই ক্রীড়াবিদ শেষ পর্যন্ত চোখে মুখে অন্ধকার দেখেন বাংলাদেশে থেকে। দেশকে এত সাফল্য দিলেও কেউ তাকে চাকরি দিতে রাজি হচ্ছিল না। অন্য দিকে ক্রিকেট বা ফুটবলের মতো টাকাও নেই অ্যারচারিতে। এর পরও দেশে থেকে কোনো বাহিনীতে চাকরি করে অ্যারচারি চালিয়ে যেতে চেয়েছিলেন তিনি। তবে সবখান থেকেই নিরাশার খবর। তাই বাধ্য হয়েই দেশান্তরি হওয়া।

কুড়িগ্রামের ছেলে অসীম ২০১৮ সালে জাতীয় দলে প্রথম খেলেন। ২০২২ সাল পর্যন্ত ছিলেন অ্যারচারিতে বাংলাদেশের প্রতিনিধি। ২০১৯ সালের কাঠমান্ডু-পোখরা এসএ গেমসে বাংলাদেশ অ্যারাচরির সব ক’টি ইভেন্টেই স্বর্ণ জয়। এর মধ্যে কম্পাউন্ড দলগততে দেশকে স্বর্ণ এনে দেন। আর এককে জয় করেন ব্রোঞ্জ। এর আগে ২০১৮-এর জাকার্তা এশিয়ান গেমসে মিক্সড টিমে কোয়ার্টার ফাইনালে হেরে যান তিনি।

২০১৮ থেকে ২০২১ পর্যন্ত বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত ইসলামী সলিডারিটি অ্যারচারিতে পদক জেতা খেলোয়াড় অসীম। এই আসরগুলোতে অসীমের পদক ছিল চার স্বর্ণ এবং রৌপ্য জয়। এরপর বিকেএসপিতে হওয়া সাউথ এশিয়ান অ্যারচারিতে দু’টি স্বর্ণপদক গলায় তোলা। তা দলগত ও মিশ্র দলগততে। ২০২১ সালে হওয়া বাংলাদেশ গেমসে নতুন জাতীয় রেকর্ডসহ স্বর্ণ জয় এই অ্যারচারের।

হতাশ হয়ে দেশ ছেড়ে এলেও এখনো দেশের জন্য মন কাঁদে অসীমের। তাই আবার অ্যারচারি খেলোয়াড় হিসেবেই দেশের টুর্নামেন্টে খেলতে চান। জানান, নিউ ইয়র্কে অ্যারচারি অনুশীলন করা খুবই কঠিন আমাদের জন্য। এখানে অ্যারচারি অনুশীলন করতে গেলে ঘণ্টায় ৩৫ ডলার দিতে হয়। দিনে চার-পাঁচ ঘণ্টা অনুশীলন করতে না পারলে কোনো লাভ নেই। সে হিসেবে আমি যদি দিনে ৩ ঘণ্টাও অনুশীলন করি তাহলে ১০০ ডলার চলে যাবে। এই মুহূর্তে আমার পক্ষে অ্যারচারি অনুশীলনের জন্য দিনে ১০০ ডলার ব্যয় করা সম্ভব নয়।

নিউ ইর্য়কে ইনডোর অ্যারচারি হয়। লং আইল্যান্ডে আউটডোর অ্যারচারির জন্য বিশাল একটি মাঠ আছে। ইনডোরে অনুশীলনটা অনেক বেশি ব্যয়বহুল। তবে নিউ জার্সিতে আউট ডোরে আশার কথা শোনালেন, ‘নিউ ইয়র্ক থেকে দূরের নিউজার্সিতে ফ্রি-তে অ্যারচারি অনুশীলনের সুযোগ আছে। বিকেএসপির চীনা কোচের বন্ধু কাজ করেন নিউ জার্সির অ্যারচার অ্যাকাডেমিতে। সেখানে সহকারী কোচের চাকরিও হওয়ার সম্ভাবনা আছে। তখন অ্যারচারির সাথে আবার সম্পৃক্ত হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন অসীম। জানান, আমার প্রধান লক্ষ্য নিউ ইয়র্ক স্টেটের হয়ে অ্যারচারি খেলা এবং লাস ভেগাসে ইনডোর অ্যারচারিতে অংশগ্রহণ। সেখানে নানা দেশের বিভিন্ন জাতের।’ তথ্য দেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে খেলার কোনো স্বপ্ন দেখছি না। কারণ এখানে অভিজ্ঞদের সাথে টেক্কা দিয়ে পদক জেতা খুবই কঠিন। তবে নিউ ইয়র্ক অঙ্গরাজ্য দলের হয়ে খেলার সুযোগ পেলে- সেটা আমার জন্য বিশেষ কিছু।’ তাই ফের অ্যারচারিতে ফেরার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত তিনি।

পুলিশে থাকার সময় মাসে ২৫ হাজার টাকা ভাতা পেতেন। জাতীয় দলে থাকলে আরো কিছু টাকা। সব মিলে মাসে ৩০-৩৫ হাজার টাকা হতো আয়। আর বিদেশে খেলতে গেলে ৫০ হাজার টাকা করে। আর এখন উবার চালিয়ে সপ্তাহে ১৫ শ’ থেকে দুই হাজার ডলার আয় করছেন। হাসি মুখে জানান, ‘আল্লাহর রহমতে ভালোই আছি ইউএসএতে। বাংলাদেশে মাসে যা পেতাম, এর চেয়ে অনেক বেশি টাকা আমি এখানে উবার চালিয়ে পাই।’

অসীমের মতো বাংলাদেশের আরো তিন তারকা অ্যারচার যুক্তরাষ্ট্রে চলে এসেছেন। টোকিও অলিম্পিকে বাংলাদেশের হয়ে খেলা দিয়া সিদ্দিকী একটি ক্লিনিকে চাকরি করছেন। আর তার স্বামী আরেক তারকা অ্যারচার রোমান সানা একটি রেস্টুরেন্টে চাকরি করেন। অসীমের দেয়া তথ্য, দিয়া ভালো বেতন পায়।

রোমান সানা, সাগর ইসলামদের সাথে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে রিকার্ভ ইভেন্টে সাফল্য পাওয়া আরেক কৃতী অ্যারচার হাকিম আহমেদ রুবেলও এখন যুক্তরাষ্ট্রে। সে-ও ভালো চাকরি করে। জানান অসীম ।