নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশে প্রযুক্তিনির্ভর এবং নাগরিকবান্ধব ভূমি ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সরকার কাজ করছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, আমাদের লক্ষ্য একটি দুর্নীতি, হয়রানিমুক্ত, প্রযুক্তিনির্ভর ও নাগরিকবান্ধব ভূমি ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠা করা, যা দেশের টেকসই উন্নয়নকে আরো ত্বরান্বিত করবে। গতকাল মঙ্গলবার সকালে ‘ভূমিসেবা মেলা-২০২৬’ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
সারা দেশে ভূমি সেবা মেলার মাধ্যমে জনগণ নিঃসন্দেহে উপকৃত হবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মেলায় ই-নামজারি, অনলাইনে ভূমি উন্নয়ন কর প্রদান, রেকর্ড সংশোধন, খতিয়ান গ্রহণ এবং ভূমি সংক্রান্ত যেকোনো অভিযোগ নিষ্পত্তির সুবিধা থাকছে। একটি ন্যায়ভিত্তিক, আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং জনবান্ধব ভূমি ব্যবস্থাপনার বিকল্প নেই।
তেজগাঁওয়ে ভূমি ভবন মিলনায়তনে তিন দিনব্যাপী এই ভূমিসেবা মেলার আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে সমাজ কল্যাণ, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রী অধ্যাপক ডা: এজেডএম জাহিদ হোসেন, কৃষিমন্ত্রী আমিন উর রশিদ ইয়াছিন, আইন ও বিচারমন্ত্রী মো: আসাদুজ্জামান, ডাক টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম, বেসামরিক বিমান ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা, প্রতিমন্ত্রী রশিদুজ্জামান মিল্লাত, রেল প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিবসহ সংসদ সদস্য, সরকারের ঊধর্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পরে প্রধানমন্ত্রী মেলার বিভিন্ন স্টল পরিদর্শন করেন।
ভূমির দক্ষ ব্যবস্থাপনা সময়ের দাবি মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে মাথাপিছু জমির পরিমাণও কমে আসছে। ফলে জমির অর্থনৈতিক মূল্য যেমন বাড়ছে, তেমনি জমি নিয়ে বিরোধ, মামলা-মোকদ্দমা এবং জটিলতাও বেড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে এসব বিরোধ ব্যক্তি ও পরিবারের শান্তি নষ্ট করার পাশাপাশি জাতীয় উন্নয়ন কর্মকাণ্ডেও প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন বাস্তবতায় ভূমির পরিকল্পিত ব্যবহার, নির্ভুুল রেকর্ড সংরক্ষণ এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনা বর্তমানে সময়ের অপরিহার্য দাবি। আমাদের লক্ষ্য এমন একটি ভূমি ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা, যেখানে ভূমিসেবা গ্রহণের জন্য মানুষকে আর অযথা অফিসে অফিসে ঘুরতে হবে না, দুর্নীতি বা হয়রানির শিকার হতে হবে না।
তারেক রহমান বলেন, এভাবেই সরকার পর্যায়ক্রমে একের পর নির্বাচনী ইশতেহার প্রতিটি দফা বাস্তবায়নের মাধ্যমে জনগণের কাছে দেয়া ওয়াদা পূরণের রাজনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। শুধুমাত্র জমিজমা সংক্রান্ত বিষয়েই নয়, প্রতিটি ক্ষেত্রেই জনবান্ধব কর্মসূচি নিয়ে সরকার জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থাকতে চায়। দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময় ধরে ফ্যাসিবাদী শাসন শোষণের জাঁতাকলে পিষ্ট দেশের জনগণ বর্তমানে রাষ্ট্র এবং রাজনীতিতে তাদের অধিকারের প্রতিফলন দেখতে চায়। এ কারণেই বর্তমান সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার প্রথম সপ্তাহ থেকেই নির্বাচনী ইশতেহার এবং জুলাই সনদের প্রতিটি দফা পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের দিকে মনোযোগ দিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সারা দেশে বিভিন্ন পর্যায়ের আদালতগুলোতে দেওয়ানি এবং ফৌজদারি সব মিলিয়ে ৪৭ লাখেরও বেশি মামলা বিচারাধীন। এর মধ্যে জমিজমা সংক্রান্ত মামলার সংখ্যাই বেশি। সুতরাং, এ মুহূর্তে সরকারের সামনে প্রধান অগ্রাধিকার হচ্ছে আদালতে বিচারাধীন মামলার দ্রুততম নিষ্পত্তি। তবে প্রচলিত আদালতের বাইরেও জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য গ্রাম আদালত কিংবা অলটারনেটিভ ডিসপুট রিসোলিউশন-এডিআর অর্থাৎ বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির মতো আইনানুগ মাধ্যম অবলম্বনের দিকে আরো জোর দেয়া জরুরি। এতে একদিকে বিরোধ নিষ্পত্তিতে যেমন অল্প সময় লাগবে অপর দিকে অনেক ক্ষেত্রেই বিরোধ হয়তো শত্রুতায় রূপ নেবে না।
বক্তব্যের শুরুতে ভূমি সংক্রান্ত সেবাগ্রহীতাদের সুযোগ-সুবিধা প্রদানে সরকারের কার্যক্রম তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মালিকানা, খাজনা, দলিল, খতিয়ান, দাগ, পর্চা, নামজারি, জমা-খারিজ, মৌজা, সি এস, আর এস বা ডি-এস, বি এস প্রভৃতি বিষয়ে নিজেদের মালিকানা হালনাগাদ রাখতে মানুষকে সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসে আসতে হতো। প্রযুক্তিগত উন্নয়নের সাথে সাথে ভূমি ব্যবস্থাপনাও আধুনিক হয়েছে। সেবাগ্রহীতাগণ নিজের জমিজমা সংক্রান্ত বিষয়গুলো বর্তমানে ঘরে বসেই অনলাইনে সম্পন্ন করার সুযোগ পাচ্ছেন। এমনকি যারা অনলাইনে নিজেরা জমিজমার খাজনা প্রদান কিংবা প্রয়োজনীয় কার্যক্রমগুলো করতে সক্ষম নন, তাদের জন্য রয়েছে ভূমি সহায়তা সেবাকেন্দ্র রয়েছে। বেসরকারি উদ্যোক্তাদের পরিচালনায় ইতোমধ্যেই দেশের ৬১টি জেলায় বর্তমানে ৮৯৩টি ভূমিসেবা সহায়তাকেন্দ্র চালু রয়েছে। এসব কেন্দ্র থেকে নির্ধারিত সেবামূল্যের বিনিময়ে নাগরিকগণ সহজেই ভূমিসেবার আবেদন করতে পারছেন এবং সরকারি ফি পরিশোধ করতে সক্ষম হচ্ছেন। পর্যায়ক্রমে দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে এ ধরনের আরো ভূমিসেবা সহায়তা কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি নাগরিকদের হাতের মুঠোয় ভূমিসেবা পৌঁছে দিতে চালু করা হয়েছে মোবাইল অ্যাপ ‘ভূমি’।
ভূমি ব্যবস্থাপনা আধুনিক হলে বিরোধ-নিষ্পত্তি সহজ হবে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভূমি-জমি ব্যবস্থাপনা যতবেশি আধুনিক এবং প্রযুক্তি নির্ভর করা যায় জমিসংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির পথও তত বেশি সহজ হয়ে যায়। জমি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে অনলাইন সুবিধা নিশ্চিত করায় আশা করি জমিজমা সংক্রান্ত দুর্ভোগ অনেকটা লাঘব হবে। একই সাথে জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে ভূমি অফিসগুলোতে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যও কমবে। চলমান এই ভূমিমেলা আধুনিক ভূমি ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে জনগণের নিজেদের দায়দায়িত্ব সম্পর্কে আরো সচেতন করবে।
ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনুর সভাপতিত্বে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ভূমি প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন এবং ভূমি সচিব এএসএম সালেহ উদ্দিন বক্তব্য রাখেন।
শিশুদের সাথে প্রধানমন্ত্রী : তেজগাঁওয়ে ভূমি ভবনে ‘ডে-কেয়ার সেন্টারের শিশুদের সাথে ‘অন্যরকম’ সময় কাটালেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। মঙ্গলবার সকাল ১০টায় ভূমিসেবা মেলা-২০২৬ এর উদ্বোধন অনুষ্ঠান শেষ করে প্রধানমন্ত্রী যান মহিলা ও শিশু মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধায়নের ‘শিশু দিবাযন্ত্র কেন্দ্রে’। তাকে পেয়ে ছোট্ট ছোট্ট শিশুরা আনন্দে বিভোর হয়ে উঠে, দৌড়ে এসে প্রধানমন্ত্রীকে ঘিরে ফেলে তাদের খুশির অনুভূতি প্রকাশ করতে দেখা যায়।
সাথে থাকা মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রী অধ্যাপক এজেডএম জাহিদ হোসেন বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে পেয়ে শিশুরা এতো খুশি হয়েছিলো যে, তারা প্রধানমন্ত্রীর চারপাশে ঘিরে সেই খুশির আনন্দ প্রকাশ করছিলো। প্রধানমন্ত্রীও শিশুদের কাছে পেয়ে অন্যরকম কিছুটা সময় কাটিয়েছেন। তাদের সাথে নিয়ে কেক কেটেছেন। শিশুদের বিভিন্ন রকমের চকলেট, টফি, ললিপপ নিজ হাতে দিয়েছেন, দিয়েছেন গিফট ব্যাগ। চকলেট-টফি দিতে দিতে প্রধানমন্ত্রী বলছিলেন, আর কেউ কি বাকি আছে।
ভূমিসেবা মেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হয় ভূমি ভবনের তৃতীয় তলায়। তিন দিনব্যাপী ভূমিমেলার উদ্বোধন করে প্রধানমন্ত্রী ভবনের নিচতলা ‘ডে-কেয়ার সেন্টার’ যান। আগে থেকেই একটি কেক রাখা হয়। প্রধানমন্ত্রী সেই কেকটি দেখে বলেন, আজকে কার জন্ম দিন বলো তো? একেক জন বলতে শোনা যায়, আঙ্কেল আমার, আঙ্কেল আমার। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজকে তোমাদের সবার জন্মদিন। আসো আমরা একসাথে কেক কাটি। শিশুদের নিয়ে হাতে হাতে রেখে কেকটি কাটেন প্রধানমন্ত্রী।
অধ্যাপক জাহিদ বলেন, প্রধানমন্ত্রী যখন শিশুদের নিয়ে কেক কাটছিলেন, শিশুরা আনন্দে বলছিলো হ্যাপি হ্যাপি, হ্যাপি ডে, হ্যাপি হ্যাপি বার্থ ডে।
ডে-কেয়ার সেন্টারের কর্মকর্তা মাহিয়া তাসনুভ তামান্না এখানে শিশুদের কিভাবে যতœ নেয়া হয় তা প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরেন। প্রধানমন্ত্রী ওই সময়ে জানতে চান, শিশুদের কী কী খাবার দেয়া হয়। প্রধানমন্ত্রীকে কাছে পেয়ে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করেন ছোট্ট শিশু আরিবা। সে বলে, প্রধানমন্ত্রী আঙ্কেলকে দেখে আমি যে কী খুশি বলতে পারছি না। আঙ্কেলের সাথে মজা করে কেক খেয়েছি। আঙ্কেলও কেক খেয়েছেন। কী মজা, কী মজা। আঙ্কেল খুব ভালো, খুব সুইট।
অধ্যাপক জাহিদ হোসেন জানান, মহিলা ও শিশু মন্ত্রণালয় এইসব শিশু দিবাযন্ত্র কেন্দ্র পরিচালনা করে। ঢাকাসহ সারা দেশে এই ডে কেয়ার সেন্টার রয়েছে ২০টি। তিনি বলেন, ৪ বছর থেকে ৬ বছর বয়সী শিশুরা এই কেন্দ্রে সাড়ে ১০ ঘণ্টা সেবা পেয়ে থাকে। এই কেন্দ্রে শিশুসংখ্যা ৬০। আজ উপস্থিত ছিলেন ৫৫ জন।
প্রধানমন্ত্রী সকাল বেলা ১১টা থেকে ১৫ মিনিটের কিছু বেশি সময়ে এই কেন্দ্রে অবস্থানের পর প্রধানমন্ত্রী শিশুদের কাছ থেকে হাত নেড়ে ‘টা টা’ দিয়ে বিদায় নেন। এই কেন্দ্রটি পরিদর্শনের সময়ে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রী ছাড়াও ভূমি প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন উপস্থিত ছিলেন।
গুলশান লেকের সৌন্দর্যবর্ধনের নির্দেশ : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে গুলশান-বনানী-বারিধারা লেকের উন্নয়ন ও পরিবেশ সংরক্ষণ নিয়ে এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। গতকাল সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
বৈঠকে গুলশান লেকের পানি দূষণ রোধ, পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা, সৌন্দর্যবর্ধন ও লেককেন্দ্রিক নাগরিক সুবিধা বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা লেকের বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে টেকসই উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন পরিকল্পনা ও উদ্যোগ নিয়ে তাদের মতামত ব্যক্ত করেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রী গুলশান লেকের সৌন্দর্যবর্ধনসহ লেকের আশপাশের মানুষের সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধির নির্দেশনা দিয়েছেন।
বৈঠকে গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের সুমন, এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুস সালাম, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন, প্রধানমন্ত্রীর সহকারী একান্ত সচিব আব্দুর রহমান সানি, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো: রিয়াজুল ইসলামসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিব ও বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।



