অনিয়মের অভিযোগে আটকে গেছে কৃষির ২৬ কর্মকর্তার পদায়ন

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরে পদোন্নতি জট, থমকে আছে পরবর্তী ডিডিদের প্রমোশন

কাওসার আজম
Printed Edition

উপপরিচালক (ডিডি) থেকে অতিরিক্ত পরিচালক পদে পদোন্নতির প্রায় সাড়ে পাঁচ মাসের বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। কিন্তু কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের (ডিএই) ২৬ কর্মকর্তা আগের চেয়ারেই (পদ) বহাল রয়েছেন। তারা জাতীয় বেতন স্কেলের তৃতীয় গ্রেডে উন্নীত হয়ে বেতন-ভাতা ও সরকারি সুযোগ-সুবিধা পেলেও নতুন পদের চেয়ারে বসতে পারেননি। বিসিএস (কৃষি) ক্যাডারের ১৮ ও ২০তম ব্যাচের ওই ২৬ কর্মকর্তার অতিরিক্ত পরিচালক পদে পদায়ন আটকে থাকায় উপপরিচালক (ডিডি) পদে পরবর্তী পদোন্নতিও আটকে গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। কৃষি সচিব ড. রফিকুল ই মোহামেদ নয়া দিগন্তকে বলেন, পদোন্নতি প্রক্রিয়ায় জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে। রিভিউ প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পরই বোঝা যাবে অনিয়ম সাধারণ পর্যায়ের নাকি ব্যাপক আকারের। এরপরই পদায়নের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।

খামারবাড়ির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অভিযোগ, পদোন্নতি প্রক্রিয়ায় জ্যেষ্ঠতা ও গ্রেডেশন যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি। এতে মেধাবী ও যোগ্য অনেক কর্মকর্তা বঞ্চিত হয়েছেন।

গ্রেডেশন উপেক্ষা ও বঞ্চনার অভিযোগ:

পদোন্নতি পাওয়া ২৬ কর্মকর্তার মধ্যে তিনজন ১৮তম বিসিএস (কৃষি) ক্যাডার কর্মকর্তা। বাকি ২৩ জনই ২০তম বিসিএস ব্যাচের। কিন্তু এ ব্যাচের ১৯৯০ নম্বর গ্রেডেশনের কর্মকর্তা মো: রফিকুল ইসলাম খান অতিরিক্ত পরিচালক তথা তৃতীয় গ্রেডে পদোন্নতি পেলেও একই ব্যাচের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তা ড. ফারুক আহমদ (গ্রেডেশন ১৮৯৪) এবং ড. মো: শাখাওয়াত হোসেন শরীফ (গ্রেডেশন ১৮৯৭) পদোন্নতি পাননি।

তালিকার ওপরের দিকের আরো দুই কর্মকর্তা মো: নূরে আলম সিদ্দিকী (গ্রেডেশন ১৯১০) এবং মো: মুরাদুল হাসানও (গ্রেডেশন ১৯১২) বঞ্চিত হয়েছেন। তাদের সাথে পদোন্নতি বঞ্চিত হয়েছেন আরো অনেক কর্মকর্তা। শুধু ২০তম বিসিএস নয়, ১৮তম বিসিএস ব্যাচের কয়েকজন কর্মকর্তাও পদোন্নতি পাননি বলে অভিযোগ রয়েছে।

বঞ্চিত কর্মকর্তাদের দাবি, ব্যক্তি আক্রোশ ও রাজনৈতিক বিবেচনায় পদোন্নতি দেয়া হয়েছে। তাদের ভাষ্য, যাদের বাদ দেয়া হয়েছে তাদের অধিকাংশই আওয়ামী লীগবিরোধী হিসেবে পরিচিত। যদিও একটি সূত্র জানিয়েছে, বঞ্চিত কর্মকর্তাদের মধ্যেও কেউ কেউ চেয়েছিলেন পদোন্নতি প্রক্রিয়া বিলম্বিত হোক। যাতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় পার হয়ে যায়।

সাবেক সচিবের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা :

খামারবাড়ির বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিবের দায়িত্ব পালনকারী ড. এমদাদ উল্লাহ মিয়ান এই পদোন্নতি কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তার করেছিলেন। বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামী লীগ সরকারের সুবিধাভোগী হিসেবে পরিচিত ওই কর্মকর্তাকে সরকারি চাকরি থেকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়।

সম্প্রতি কৃষিমন্ত্রীর সাথে খামারবাড়িতে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভায়ও পদোন্নতি নিয়ে ক্ষোভের বিষয়টি সামনে আসে। সেখানে বঞ্চিত কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে অভিযোগ করেন, বিগত সরকারের সময় অনেক ক্ষেত্রে যোগ্যতার পরিবর্তে পছন্দের ভিত্তিতে পদোন্নতি দেয়া হয়েছে। এতে প্রশাসনের ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে।

পদোন্নতি হলেও আগের চেয়ারেই দায়িত্ব :

কৃষি মন্ত্রণালয়ের সম্প্রসারণ-১ শাখা থেকে গত ৮ জানুয়ারি জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে বিসিএস (কৃষি) ক্যাডারভুক্ত ডিএইর ২৬ কর্মকর্তাকে জাতীয় বেতন স্কেল-২০১৫ অনুযায়ী তৃতীয় গ্রেডে (৫৬ হাজার ৫০০-৭৪ হাজার ৪০০ টাকা) অতিরিক্ত পরিচালক/সমমান পদে পদোন্নতি দেয়া হয়।

পদোন্নতিপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা হলেন- কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট, জেলা ও আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ কার্যালয়, বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সি এবং বিভিন্ন প্রকল্পে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তারা। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন মো: মফিজুর রহমান (অধ্যক্ষ-চলতি দায়িত্ব, কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট, ঈশ্বরদী, পাবনা), মো: হাসান ওয়ারিসুল কবীর (উপাধ্যক্ষ, কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট, ঝিনাইদহ), কাজী জাহাঙ্গীর হোসেন (অধ্যক্ষ-চলতি দায়িত্ব, কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট, দৌলতপুর, খুলনা), মুহাম্মদ শাহ আলম (উপপরিচালক, বালাইনাশক প্রশাসন, উদ্ভিদ সংরক্ষণ উইং, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর, খামারবাড়ি, ঢাকা), আর কাদের সরদার (উপাধ্যক্ষ, কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট, ফরিদপুর), মোহাম্মদ নুরুজ্জামান (উপাধ্যক্ষ, কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট, শেরপুর), মো: সিরাজুল ইসলাম (উপপরিচালক, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর, রংপুর), মো: মাহবুবুর রহমান (মুখ্য প্রশিক্ষক, কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট, গাইবান্ধা), মো: মনিরুজ্জামান (উপপরিচালক, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর, রাঙ্গামাটি), ড. এস এম হাসানুজ্জামান (প্রকল্প পরিচালক, আধুনিক প্রযুক্তি সম্প্রসারণের মাধ্যমে রাজশাহী বিভাগের কৃষি উন্নয়ন প্রকল্প, রাজশাহী), মো: আকতারুজ্জামান (উপপরিচালক, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর, হবিগঞ্জ), এম এম শাহ নেওয়াজ (উপপরিচালক-প্রশাসন, বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সি, গাজীপুর), মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম (উপপরিচালক-লজিস্টিকস, প্রশাসন ও অর্থ উইং, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর, খামারবাড়ি, ঢাকা), ড. মো: সাদিকুর রহমান (উপপরিচালক, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর, কিশোরগঞ্জ), ড. বিমল কুমার প্রামাণিক (উপপরিচালক, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর, কক্সবাজার), মোহাম্মদ দিদারুল আলম (জেলা বীজ প্রত্যয়ন অফিসার, বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সি, জামালপুর), মো: আব্দুল কালাম আজাদ (উপপরিচালক, অতিরিক্ত পরিচালকের কার্যালয়, দিনাজপুর অঞ্চল), মোহাম্মদ দিদারুল আলম (সহকারী আঞ্চলিক বীজ প্রত্যয়ন অফিসার, বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সি, চট্টগ্রাম অঞ্চল), ড. মো: মফিজুল ইসলাম (উপপরিচালক, হর্টিকালচার সেন্টার, গাইটাল, কিশোরগঞ্জ), মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন (প্রধান উদ্যানতত্ত্ববিদ, সবজি উইং কার্যালয়, পাইকপাড়া, মিরপুর, ঢাকা), মো: সাইফুল ইসলাম (উপপরিচালক, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর, সাতক্ষীরা), মো: খোরশেদ আলম (উপাধ্যক্ষ, কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট, গাইবান্ধা), ড. এস এম আবু বকর সাইফুল ইসলাম (মুখ্য প্রশিক্ষক, কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট, তাজহাট, রংপুর), ড. মোছা: কোহিনুর বেগম (উপাধ্যক্ষ, কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট, খাদিমনগর, সিলেট), ড. মো: ইয়াসিন আলী (উপপরিচালক, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ) এবং মো: রফিকুল ইসলাম খান (উপপরিচালক, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর, গাজীপুর)।

জানা গেছে, এসব কর্মকর্তার পদোন্নতির পাঁচ মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো তাদের নতুন পদে পদায়ন হয়নি। অতিরিক্ত পরিচালক তথা তৃতীয় গ্রেডে পদোন্নতিপ্রাপ্তদের পদায়ন না হওয়ায় ষষ্ঠ গ্রেড থেকে পঞ্চম গ্রেডে পদোন্নতির কার্যক্রমও আটকে আছে। বিসিএস (কৃষি) ২৮তম ব্যাচের কর্মকর্তাদের সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলেও এখনো প্রজ্ঞাপন জারি হয়নি। কারণ, ডিডির চেয়ারে এখনো বসে আছেন তৃতীয় গ্রেডে পদোন্নতিপ্রাপ্ত কর্মকর্তারাই।

প্রশাসনিক স্থবিরতায় মাঠপর্যায়ে প্রভাব :

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, প্রশাসনিক এ জটিলতার কারণে মাঠপর্যায়ের কৃষি কার্যক্রমেও ধীরগতি তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন অঞ্চলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, তদারকি ও সমন্বয় কার্যক্রমে জটিলতা দেখা দিচ্ছে। খামারবাড়ি সূত্রে জানা যায়, পদোন্নতিপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা তৃতীয় গ্রেডের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা ভোগ করলেও প্রশাসনিক ক্ষমতা ও দায়িত্ব এখনো আগের অবস্থাতেই রয়েছে। কেউ কেউ আবার একই সাথে অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালকের দায়িত্বও পালন করছেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক কর্মকর্তা বলেন, পদোন্নতি প্রাপ্তদের অনেকে জেলার ডিডিসহ গুরুত্বপূর্ণ চেয়ারে বসে আছেন। নিচের চেয়ারে থাকলেও সুবিধাজনক অবস্থানে থাকায় অনেকেরই এ বিষয়ে ‘রা’ নেই। তবে অধিকাংশ কর্মকর্তা দ্রুত অতিরিক্ত পরিচালক পদে পদায়ন চান।

‘ইনসিটু’ পদোন্নতির দাবি :

জানা যায়, কয়েকজন কর্মকর্তা ‘ইনসিটু (ভূতাপেক্ষ)’ পদোন্নতির দাবিও জানিয়েছেন। বিষয়টি তারা কৃষিমন্ত্রী ও সচিবেরও নজরে এনেছেন বলে জানা যায়।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের মহাপরিচালক আব্দুর রহিম বলেন, উপপরিচালক পদে পদোন্নতির জন্য ডিপিসি শেষ হয়েছে। এ ছাড়া, পদোন্নতি পাওয়া অতিরিক্ত পরিচালকদের পদায়নের বিষয়টি মন্ত্রণালয়ের বিষয় বলে জানান তিনি।

এ বিষয়ে কৃষি সচিব ড. রফিকুল ই মোহামেদ নয়া দিগন্তকে বলেন, আমি তো নতুন মানুষ। যতটুকু শুনেছি প্রমোশনটায় নাকি জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন হয়েছে। সিনিয়ারিটি লঙ্ঘন হওয়ায় তারা (বঞ্চিতরা) অভিযোগ করেছে। তারা রিভিউ চেয়েছেন। রিভিউটা চলছে বলে ধারণা। রিপোর্ট (রিভিউ) পাইলে বুঝা যাবে সাধারণ অনিয়ম নাকি ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে। কৃষি সচিব বলেন, রিভিউ কার্যক্রম শেষ হলে পদায়ন করা হবে।