এশিয়াকে চিরতরে বদলে দেবে ইরান যুদ্ধ

দ্য ইকোনমিস্টের বিশ্লেষণ

Printed Edition

ইরান যুদ্ধ ঘিরে তৈরি হওয়া জ্বালানি সঙ্কট এশিয়ার অর্থনীতি ও রাজনীতিকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দিচ্ছে। জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, সরবরাহ ঘাটতি, বিদ্যুৎ সঙ্কট, কৃষি উৎপাদন কমে যাওয়া ও মূল্যস্ফীতির চাপে এশিয়ার বহু দেশ এখন কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। বিশ্লেষকদের মতে, এই সঙ্কট শুধু সাময়িক নয়; বরং এটি এশিয়ার জ্বালানি নীতি, আঞ্চলিক সম্পর্ক ও অর্থনৈতিক কাঠামো দীর্ঘমেয়াদে বদলে দিতে পারে।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সাধারণত জনগণের কাছে যে আহ্বান জানান, ভারতীয়রা তা অনুসরণ করার চেষ্টা করেন। গত ১০ মে মোদি আবারো ভারতীয়দের সংযমের আহ্বান জানান। তিনি সম্ভব হলে বাসা থেকে কাজ করতে ও বিদেশ সফর কমাতে অনুরোধ করেন। মোদির এই আহ্বান এসেছে ইরান যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট জ্বালানি সঙ্কটের প্রেক্ষাপটে। উদ্ভুত পরিস্থিতিতে চার বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো বাড়াতে বাধ্য হয় তার সরকার।

তবে শুধু ভারত নয়, এশিয়ার আরো অনেক দেশ এখন নাগরিকদের ব্যয় কমাতে বলছে। থাইল্যান্ড ও ফিলিপাইনের মতো দেশগুলো শুরুতেই জ্বালানি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নিয়েছিল। কিন্তু এখন সেগুলোও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় প্রবেশ করেছে। যুদ্ধের প্রভাব অঞ্চলটির অর্থনীতি ও রাজনীতিকে ওলটপালট করে দেয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে। যেসব দেশে জ্বালানির দামে সরকারি নিয়ন্ত্রণ নেই, যেমন পাকিস্তান ও ফিলিপাইন- সেখানে দাম হু হু করে বেড়েছে। তবে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ এখন সরবরাহ ঘাটতি নিয়ে।

খবরে বলা হয়েছে, ইন্দোনেশিয়ার হাতে মাত্র তিন সপ্তাহের জ্বালানি মজুদ রয়েছে। ভিয়েতনামের মজুদ এক মাসেরও কম। উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে আমদানি করা প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল পাকিস্তান ও বাংলাদেশে দীর্ঘ সময় ধরে বিদ্যুৎ বিভ্রাট চলছে। গ্রামীণ এলাকার অনেক পেট্রল পাম্পে জ্বালানি শেষ হয়ে যাচ্ছে।

ইউরিয়ার দাম যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ৫০ শতাংশ বেড়েছে। এই সারটির বড় অংশই উপসাগরীয় অঞ্চলে উৎপাদিত হয়। এশিয়ার লাখ লাখ ধানচাষি এরই মধ্যে ধান রোপণ শুরু করলেও ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অনেকে পরিকল্পনা কমিয়ে দিচ্ছেন। ফিলিপাইনের ইন্টারন্যাশনাল রাইস রিসার্চ ইনস্টিউটের গবেষক ড. আলিশের মিরজাবায়েভ বলেন, এই মুহূর্তে চাল উৎপাদন লাভজনকতার সঙ্কটে আছে। কিন্তু যুদ্ধ দীর্ঘ হলে এটি খাদ্যনিরাপত্তার সঙ্কটে পরিণত হবে।

শুধু কৃষি নয়, শিল্প খাতেও উদ্বেগ বাড়ছে

জাপানের খাদ্যপ্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ক্যালবি ন্যাফথার মূল্যবৃদ্ধির কারণে এখন কালো-সাদা প্যাকেট ব্যবহার শুরু করেছে, যাতে খরচ কমানো যায়। ন্যাফথা মূলত উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে আসা একটি পেট্রোকেমিক্যাল কাঁচামাল।

ন্যাফথার ঘাটতির কারণে এশিয়ার কয়েকটি প্লাস্টিক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে চুক্তি বাস্তবায়নে ‘ফোর্স মেজর’ ঘোষণা করেছে। ফিলিপাইনে এপ্রিল পর্যন্ত এক বছরে মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ২ শতাংশে। ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে দেশটির জিডিপি প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ২ দশমিক ৮ শতাংশে, যা মহামারির পর সর্বনিম্ন।

জাতিসঙ্ঘের আশঙ্কা, যুদ্ধ দীর্ঘ হলে দক্ষিণ এশিয়ার জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৬ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে।

জার্মান গবেষণা প্রতিষ্ঠান কিয়েল ইনস্টিউট বলছে, চলতি বছর ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কায় খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশ ছাড়িয়ে যেতে পারে। এই পরিস্থিতি সরকারগুলোর আর্থিক অবস্থাকেও চাপে ফেলছে। ভারতে জ্বালানির দাম স্থির রাখতে প্রতিদিন প্রায় ১৫ কোটি ডলার ব্যয় হচ্ছে। রোপণ মৌসুমে সার ভর্তুকিতে আরো প্রায় ৪.৩ বিলিয়ন বা ৪৩০ কোটি ডলার খরচ হতে পারে। ইন্দোনেশিয়া প্রতিদিন প্রায় ৬ কোটি ডলার জ্বালানি ভর্তুকি দিচ্ছে।

ওয়াশিংটনের গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর গ্লোবাল ডেভেলপমেন্টের হিসাব অনুযায়ী, অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার থাকলে এশিয়ার সরকারগুলোর বছরে জিডিপির প্রায় ১ শতাংশ ভর্তুকিতে ব্যয় হতে পারে। তবে এভাবে দীর্ঘদিন টিকে থাকা কঠিন। ভারতে কৃষকরা এখনো সরকারের কাছ থেকে সারের ভর্তুকি প্রত্যাশা করছেন, যদিও মোদি সারের ব্যবহার অর্ধেকে নামিয়ে আনার আহ্বান জানিয়েছেন। এর আগে কৃষি সংস্কারের চেষ্টা করতে গিয়ে ব্যাপক বিক্ষোভের মুখে পড়েছিলেন তিনি। এশিয়ার বিভিন্ন দেশের কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন, মূল্যবৃদ্ধি এমন অস্থিরতা তৈরি করতে পারে, যেটি ২০২২ সালে শ্রীলঙ্কার সরকার পতনের কারণ হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক পর্যবেক্ষক সংস্থা এসিএলইডির তথ্য অনুযায়ী, ইরান যুদ্ধ শুরুর পর পাকিস্তান, বাংলাদেশ, ফিলিপাইন এমনকি দক্ষিণ কোরিয়াতেও ডজনখানেক বিক্ষোভ হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে সরকারগুলো শুধু জ্বালানি ব্যবহার কমাতে বলছে না, বিকল্প উৎসও খুঁজছে। এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবও থাকতে পারে। থাইল্যান্ড এখন ব্রাজিল ও লিবিয়ার মতো দেশ থেকে বেশি তেল কিনছে। অনেক এশীয় দেশ জৈব জ্বালানির ব্যবহার বাড়াচ্ছে। সিঙ্গাপুরের মতো কিছু দেশ নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ করছে। এই পরিবর্তনের মধ্যে লাভবানও হচ্ছে কিছু দেশ।

প্রাকৃতিক গ্যাস ও কয়লার বড় রফতানিকারক অস্ট্রেলিয়া এখন পরিশোধিত জ্বালানি আমদানি বাড়াচ্ছে ও বিনিময়ে নিজের প্রাকৃতিক সম্পদ বেশি রফতানি করছে। দেশটি ব্রুনেই, জাপান, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও দক্ষিণ কোরিয়ার সাথে নতুন চুক্তিও করেছে। আরেক সম্ভাব্য লাভবান দেশ চীন। বিশ্বের সবচেয়ে বড় অপরিশোধিত তেল আমদানিকারক হওয়া সত্ত্বেও চীনের বিশাল তেল মজুদ রয়েছে। ফলে তাদের হাতে শক্তিশালী কৌশলগত ও কূটনৈতিক সুবিধা রয়েছে। চীন শুধু সৌর প্যানেল ও উইন্ড টারবাইন বেশি বিক্রির সুযোগ পাচ্ছে না, জীবাশ্ম জ্বালানির মাধ্যমেও প্রভাব বিস্তার করছে। এই মাসে চীন কিছু পেট্রল, ডিজেল ও জেট ফুয়েল বিদেশে রফতানির অনুমতি দিয়েছে। যুদ্ধ শুরুর পর এই রফতানি সীমিত করা হয়েছিল।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রথম চালানগুলো ভিয়েতনাম ও লাওসে যাচ্ছে, যাদের সাথে চীনের সুসম্পর্ক রয়েছে। এমনকি, যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোকেও এখন চীনের দ্বারস্থ হতে হচ্ছে। গত ২৯ এপ্রিল অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী পেনি ওং বেইজিং সফরে গিয়ে জেট ফুয়েল সরবরাহের একটি চুক্তি নিশ্চিত করেন। একই সাথে এশিয়ার অনেক দেশ এখন পারস্পরিক সহযোগিতার সুযোগও দেখছে।

সম্প্রতি ফিলিপাইনে অনুষ্ঠিত এক শীর্ষ সম্মেলনে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নেতারা যৌথ জ্বালানি মজুদ গড়ে তোলার বিষয়ে আলোচনা করেছেন।