যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ভেঙে পড়েছে যুদ্ধবিরতি

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলার জেরে দীর্ঘদিন ধরে টিকে থাকা ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি এখন কার্যত ভেঙে পড়েছে। গতকাল শনিবার ভোরে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) কুয়েত ও বাহরাইনে সাতটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও একাধিক ড্রোন নিক্ষেপ করেছে। এর আগে মার্কিন বাহিনী ইরানের চারটি ড্রোন ভূপাতিত করে এবং ইরানের উপকূলীয় রাডার স্থাপনায় আঘাত হানে। বাহরাইন ও কুয়েতে বিমান হামলার সাইরেন বাজতে থাকে এবং জনগণকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে বলা হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে টিকে থাকা ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি এখন কার্যত ভেঙে পড়েছে এবং পুরো অঞ্চল একটি বৃহত্তর সঙ্ঘাতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

একই দিন লেবাননে ইসরাইলি হামলায় তিন সেনাসহ ১০ জন নিহত হওয়ায় সঙ্কট আরও ঘনীভূত হয়েছে। তেহরানের বিশ্লেষকরা বলছেন, ‘আমরা এখন নিম্নমাত্রার যুদ্ধের মধ্যে আছি।’ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার সদিচ্ছার অভাব রয়েছে এবং তাদের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তারা এই অঞ্চলের নিরাপত্তাকে বিপন্ন করছে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি সতর্ক করছে, এই উত্তেজনার জেরে বৈশ্বিক জ্বালানি ও খাদ্যমূল্য ঊর্ধ্বমুখী হয়ে কোটি মানুষ ক্ষুধার মুখে পড়তে পারেন। মধ্যপ্রাচ্য এখন বহুমুখী এক মহাসঙ্কটের দ্বারপ্রান্তে।

মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, ইরান কুয়েত ও বাহরাইনে মোট সাতটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে, যার মধ্যে ছয়টি ভূপাতিত করা হয়েছে এবং সপ্তমটি লক্ষ্যে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়েছে। সেন্টকম আরো বলেছে, মার্কিন কর্মীদের কোনো ক্ষতি হয়নি এবং বাহরাইনে মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম ফ্লিটের সদর দফতর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে ইরানের দাবি সম্পূর্ণ মিথ্যা। খবর : আলজাজিরা, মার্কিন সেন্টকম, আনাদোলু, মেহর নিউজ।

কুয়েত ও বাহরাইনের প্রতিক্রিয়া : কুয়েতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ভোরবেলা দেশটির আকাশসীমায় সাতটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করে সেগুলো ভূপাতিত করা হয়। ছড়িয়ে পড়া ধ্বংসাবশেষ কিছু আবাসিক এলাকায় পড়ে সম্পদের ক্ষতি হলেও কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। কুয়েতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই হামলাকে ‘নির্লজ্জ আগ্রাসন’ এবং ‘সার্বভৌমত্বের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন’ বলে নিন্দা জানিয়েছে এবং নিজেদের রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেয়ার অধিকার সংরক্ষণ করেছে। বাহরাইনের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইরানের তিনটি ক্ষেপণাস্ত্র ও কয়েকটি ড্রোন ধ্বংস করেছে। বাহরাইনের সেনাবাহিনী বলেছে, ইরান ‘সুশৃঙ্খল শত্রুতামূলক কার্যক্রম’ এবং ‘বেআইনি হামলার’ মাধ্যমে সাধারণ নাগরিকদের বিরুদ্ধে হামলা চালিয়েছে, যা আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের সরাসরি লঙ্ঘন।

কিভাবে ছড়াল উত্তেজনা : এই হামলার সূত্রপাত ঘটে তারও আগে, যখন মার্কিন সামরিক বাহিনী হরমুজ প্রণালীর দিকে ছোড়া ইরানের চারটি ড্রোন ভূপাতিত করে এবং পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে ইরানের কেশম দ্বীপ ও সিরিক উপকূলীয় অঞ্চলে রাডার ও নজরদারি স্থাপনায় হামলা চালায়। সেন্টকম বলেছে, ইরানি হামলা-ড্রোনগুলো ‘আঞ্চলিক সামুদ্রিক যান চলাচলের জন্য তাৎক্ষণিক হুমকি’ তৈরি করেছিল এবং রাডার ঘাঁটিতে হামলা করা হয়েছে ‘পরবর্তী আক্রমণ থেকে আত্মরক্ষার’ জন্য। এর পাল্টা জবাবে আইআরজিসি বলেছে, মার্কিন হামলার প্রতিক্রিয়ায় তারা উপসাগরীয় অঞ্চলে ‘শত্রু ঘাঁটিগুলো’ লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র ‘উত্তেজনা হ্রাস বা স্থিতিশীলতার পথে ফেরার কোনো ইচ্ছা রাখে না বরং তার দুঃসাহসিক কার্যক্রমের মাধ্যমে আঞ্চলিক নিরাপত্তাকে মারাত্মক বিপদে ফেলছে।’ মন্ত্রণালয় আঞ্চলিক দেশগুলোকে সতর্ক করে বলেছে, তারা যেন তাদের ভূমি ও স্থাপনা ইরানের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে না দেয়।

বিশেষজ্ঞ বিশ্লেষণ : তেহরানের সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের গবেষক আলি আকবর দারেইনি আলজাজিরাকে বলেন, ‘কার্যত কোনো যুদ্ধবিরতি নেই। আমরা এখন একটি নিম্নমাত্রার যুদ্ধের মধ্যে আছি।’ তিনি বলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমাগত লঙ্ঘন পরিস্থিতিকে বৃহত্তর যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। দারেইনির মতে, ইরানের দাবি তিনটি : হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচলে ইরান-নির্ধারিত করিডোর মেনে চলতে হবে, নির্ধারিত ফি দিতে হবে এবং জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ক্ষতিকর পণ্যবাহী জাহাজ প্রবেশ করতে পারবে না। তিনি বলেন, ‘ইরানের রেড লাইন স্পষ্ট : ইরান যদি তেল রফতানি করতে না পারে, তাহলে এই অঞ্চলের আর কেউও পারবে না।’

ট্রাম্পের অবস্থান ও চাপ : শুক্রবারেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প উইসকনসিনে কৃষকদের এক সমাবেশে বলেছিলেন, ‘ইরানের পরিস্থিতি ভালোর দিকে যাচ্ছে।’ তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, ‘আমরা খুব দ্রুত ইরান থেকে বেরিয়ে আসব।’ কিন্তু ঘণ্টা না যেতেই ক্ষেপণাস্ত্র হামলার খবর সেই দাবিকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে। মধ্যবর্তী নির্বাচন এগিয়ে আসায় ট্রাম্প প্রশাসন দ্রুত একটি সমাধানে পৌঁছানোর চাপে রয়েছে। মার্কিন ও ইরানি আলোচকরা কয়েক সপ্তাহ ধরে যুদ্ধবিরতি ৬০ দিন বাড়ানো এবং ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রম নিয়ে নতুন দফা আলোচনা শুরু করার চেষ্টা করলেও উভয় পক্ষই ছাড় দিতে অনিচ্ছুক। এনবিসিকে ট্রাম্প স্বীকার করেন, ইরানের কাছে এখনো ২১-২২ শতাংশ ক্ষেপণাস্ত্র মজুদ রয়েছে। উল্লেখযোগ্য, বৈশ্বিক তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের জন্য অপরিহার্য হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এই সঙ্ঘাত বিশ্ব অর্থনীতিতেও মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) সতর্ক করেছে, এই যুদ্ধের কারণে জ্বালানি ও খাদ্যমূল্য ঊর্ধ্বমুখী হওয়ায় লক্ষ লক্ষ মানুষ ক্ষুধার কবলে পড়ছেন।

লেবাননে নতুন রক্তপাত : একই দিন ইসরাইলি বিমান হামলায় লেবাননে কমপক্ষে ১০ জন নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে তিনজন লেবাননি সেনা সদস্য রয়েছেন- একজন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, একজন ক্যাপ্টেন ও একজন সৈনিক, যারা খারদালি-নাবাতিয়া সড়কে তাদের গাড়িতে ছিলেন। ইসরাইল বলছে, গাড়িটি হিজবুল্লাহ-সক্রিয় এলাকায় সন্দেহজনকভাবে এগিয়ে আসছিল। লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন এই হামলাকে ‘লেবাননের সার্বভৌমত্ব ও আন্তর্জাতিক আইনের সরাসরি লঙ্ঘন’ বলে নিন্দা করেছেন।

মার্কিন মধ্যস্থতায় লেবানন সরকার একটি যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হলেও ইরানপন্থী হিজবুল্লাহ সেই চুক্তি প্রত্যাখ্যান করে হামলা অব্যাহত রেখেছে। প্রেসিডেন্ট আউন ইরানকে লেবাননকে ‘দাবার ঘুঁটি’ হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ করলে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি পাল্টা বলেন, ‘যে দেশ লেবাননের এক-পঞ্চমাংশ দখল করেছে, এক-চতুর্থাংশ মানুষকে বাস্তুচ্যুত করেছে এবং প্রতিদিন বোমা ফেলছে, তারাই আমাদের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ তুলছে।’ ইরান এর আগেই জানিয়েছে, যেকোনো স্থায়ী যুদ্ধবিরতি লেবানন পর্যন্ত প্রসারিত করতে হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্য এখন একটি বহুমুখী সঙ্ঘাতের মুখোমুখি- একদিকে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান দ্বন্দ্ব, অন্যদিকে ইসরাইল-লেবানন-হিজবুল্লাহ উত্তেজনা। এই দ্বৈত সঙ্কট আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তাকে একসাথে বিপদে ফেলেছে।