যুক্তরাষ্ট্র-ইরান পাল্টাপাল্টি হামলায় শান্তিচুক্তি অনিশ্চিত

ইরানের বিরুদ্ধে আরো ‘কঠোর’ পদক্ষেপ নেয়ার হুঁশিয়ারি ডোনাল্ড ট্রাম্পের

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলোতে হামলা চালিয়েছে ইরান। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরানের বিরুদ্ধে আরো ‘কঠোর’ পদক্ষেপ নেয়ার হুঁশিয়ারি দেয়ার পর এ হামলা হলো। যুক্তরাষ্ট্রের এ হামলার জবাবে ইরানও বাহরাইন ও কুয়েতে মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।

বিবিসির খবরে বলা হয়েছে, মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে- তারা দ্বিতীয় দিনের মতো ‘আত্মরক্ষামূলক হামলা’ পরিচালনা করেছে। ট্রাম্পের অভিযোগ, যুদ্ধ বন্ধে একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে ইরান অনেক বেশি সময় নিচ্ছে। এরপরই রাতভর নতুন করে হামলা চালানো হয়।

এ হামলার জবাবে ইরান জানায়, তারা বাহরাইন ও কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। আগের দিনও প্রতিশোধমূলক অভিযানে একই দু’টি ঘাঁটিতে হামলা চালানো হয়েছিল। সাম্প্রতিক কয়েক দিনের পাল্টাপাল্টি হামলা এপ্রিল মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া নাজুক যুদ্ধবিরতিকে নতুন করে অনিশ্চয়তার মুখে ফেলেছে।

রয়টার্স লিখেছে, এসব আক্রমণ বাড়তে থাকা পাল্টাপাল্টি হামলা বৃদ্ধির সর্বশেষ ঘটনা। আর এগুলো ফের পূর্ণমাত্রায় যুদ্ধ উসকে ওঠার হুমকি তৈরি করেছে, যা এপ্রিলের প্রথম দিকে দুই পক্ষের সম্মতিতে একটা ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির মধ্য দিয়ে থেমে ছিল। বৃহস্পতিবার ভোররাতে ইরানের ইসলামিক রেভুলিউশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) জানিয়েছে, তারা কুয়েত ও বাহরাইনে যুক্তরাষ্ট্রের ১৮টি সামরিক লক্ষ্যস্থলে পাল্টা হামলা চালিয়েছে। বাহরাইনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আকাশ হামলার সতর্কতা জানিয়ে সাইরেন বাজানো হয়েছে।

ইরানের শীর্ষ যৌথ সামরিক কমান্ড খাতামুল আমবিয়া যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর হরমুজ প্রণালী পুরোপুরি বন্ধ ঘোষণা করেছে। তারা সতর্ক করে বলেছে, তেল ট্যাংকার ও বাণিজ্যিক জাহাজসহ হরমুজ প্রণালী পার হওয়ার চেষ্টা করা যেকোনো জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করা হবে। ইতোমধ্যে ওই প্রণালী পার হওয়ার চেষ্টা করা দু’টি জাহাজ লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়েছে বলে ইরানি গণমাধ্যম জানিয়েছে।

জর্ডানে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের একটি কমান্ড সেন্টারকে লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরানের ইসলামিক রেভুলিউশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)। গতকাল বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে এ দাবি জানানো হয়। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা এ খবর জানিয়েছে। আইআরজিসি জানায়, তারা আলআজরাক এয়ার বেস ও এর নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র লক্ষ্য করে ১২টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। তাসনিম নিউজ এজেন্সির বরাতে দেয়া ওই বিবৃতিতে বলা হয়, আগ্রাসীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক অভিযানে এই হামলা চালানো হয়েছে। এতে ওই ঘাঁটি ও বিপুলসংখ্যক যুদ্ধবিমান ধ্বংস হয়েছে বলেও দাবি করে ইরানের রেভুলিউশনারি গার্ড।

তেলের দামে লাফ

ইরানের সর্বোচ্চ যৌথ সামরিক কমান্ড হরমুজ প্রণালী বন্ধ ঘোষণা করেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার দেয়া ঘোষণায় বলা হয়েছে, তেলবাহী ট্যাংকার ও বাণিজ্যিক জাহাজসহ কোনো ধরনের নৌযান এই নৌপথ ব্যবহার করতে পারবে না। কোনো জাহাজ প্রণালীটি অতিক্রমের চেষ্টা করলে তার ওপর গুলি চালানো হবে বলেও সতর্ক করেছে তারা। রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, ইরানের এ ঘোষণার পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। বৃহস্পতিবার গ্রিনিজ মান সময় অনুযায়ী রাত ২টা ৪৩ মিনিটে ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচারের (অর্থাৎ, যেসব তেল বিক্রি হবে এখন কিন্তু সরবরাহ করা হবে ভবিষ্যতের কোনো এক সময়ে) দাম ব্যারেলপ্রতি ১ দশমিক ৪৮ ডলার বা ১ দশমিক ৫৯ শতাংশ বেড়ে ৯৪ দশমিক ৫৮ ডলারে পৌঁছায়। একই সময়ে ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট অপরিশোধিত তেলের দাম ১ দশমিক ৭১ ডলার বা ১ দশমিক ৯০ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯১ দশমিক ৭৪ ডলারে ওঠে। লেনদেনের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেলের ফিউচার ৩ ডলারেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছিল।

হামলা বন্ধের আহ্বান ২২ দেশের

যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের একাধিক দেশসহ মোট ২২টি দেশ একযোগে ইরানকে সতর্কবার্তা দিয়েছে। তারা ইরানকে তাদের ভূখণ্ডে হামলা, হত্যা ও ষড়যন্ত্রমূলক কর্মকাণ্ড বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে। যৌথ বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারী দেশগুলো হলো: আলবেনিয়া, অস্ট্রেলিয়া, বেলজিয়াম, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, বুলগেরিয়া, কানাডা, চেক প্রজাতন্ত্র, ডেনমার্ক, এস্তোনিয়া, ফ্রান্স, ফিনল্যান্ড, জার্মানি, আয়ারল্যান্ড, লাটভিয়া, লিথুয়ানিয়া, নেদারল্যান্ডস, নিউজিল্যান্ড, উত্তর মেসিডোনিয়া, নরওয়ে, পর্তুগাল ও সুইডেন। গতকাল বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এই যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, আমাদের ভূখণ্ডে মানুষ হত্যা, অপহরণ, হয়রানি, ভয়ভীতি প্রদর্শন বা যেকোনো ধরনের আক্রমণের চেষ্টা জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। এসব কর্মকাণ্ড অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।

যুদ্ধবিরতি মানার আহ্বান পাকিস্তানের

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার নতুন করে শুরু হওয়া সঙ্ঘাতের মধ্যে দেশ দুটিকে যুদ্ধবিরতি মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছে পাকিস্তান। একই সাথে চলমান এই সঙ্কট সমাধানে কূটনীতি ও সংলাপের পথ প্রশস্ত করার ওপর জোর দিয়েছে দেশটি। বৃহস্পতিবার এই আহ্বান জানানো হয়। ইসলামাবাদে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র তাহির আন্দ্রাবি জানান, সাম্প্রতিক উত্তেজনার কারণে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি নিয়ে পাকিস্তান গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। তাহির আন্দ্রাবি বলেন, ‘সব অমীমাংসিত সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধানের প্রতি পাকিস্তান তাদের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমরা মনে করি, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর অধিকার ও দায়িত্ব অনুযায়ী সব বিরোধপূর্ণ বিষয়ের মধ্যস্থতামূলক সমাধানে পৌঁছানোর জন্য কূটনীতি ও সংলাপই প্রধান নীতি হওয়া উচিত।’ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই মুখপাত্র আরো জানান, পাকিস্তানের মধ্যস্থতা ও সহায়তামূলক প্রচেষ্টাগুলো মূলত বৈরিতা শেষ করতে, জীবন বাঁচাতে এবং এই বিষয়ে কূটনীতিকে একটি সুযোগ দেয়ার লক্ষ্যেই পরিচালিত হয়েছে।