গণভোটের পূর্ণাঙ্গ রায় বাস্তবায়ন করতে হবে : গোলাম পরওয়ার

Printed Edition
জাতীয় প্রেস ক্লাবে সেন্টার ফর মিডিয়া, ইনফরমেশন অ্যান্ড পাবলিক পলিসি আয়োজিত সেমিনারে বক্তব্য রাখেন মিয়া গোলাম পরওয়ার : নয়া দিগন্ত
জাতীয় প্রেস ক্লাবে সেন্টার ফর মিডিয়া, ইনফরমেশন অ্যান্ড পাবলিক পলিসি আয়োজিত সেমিনারে বক্তব্য রাখেন মিয়া গোলাম পরওয়ার : নয়া দিগন্ত

নিজস্ব প্রতিবেদক

জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, জুলাই সনদের আংশিক বাস্তবায়ন নয়, বরং গণভোটে জনগণের দেয়া পূর্ণাঙ্গ রায় অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করতে হবে। গণভোটে দেশের বিপুলসংখ্যক ভোটার যে সংস্কার প্রস্তাবগুলোর পক্ষে মত দিয়েছেন, সেগুলো উপেক্ষা করে কেবল নির্বাচনী রাজনীতির সুবিধা অনুযায়ী সংস্কার প্রক্রিয়া পরিচালনার চেষ্টা করা হলে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ হবে না।

গতকাল রোববার রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবের আব্দুস সালাম হলে সেন্টার ফর মিডিয়া, ইনফরমেশন অ্যান্ড পাবলিক পলিসি আয়োজিত ‘তথ্য ও সম্প্রচার খাতের সংস্কার : একটি জনমুখী ও সংস্কারমূলক রোডম্যাপ’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।

মিয়া গোলাম পরওয়ার আরো বলেন, বিএনপির ৩১ দফার প্রথম দফা ছিল সংবিধান সংস্কার কমিশন গঠন করা। কিন্তু ক্ষমতায় বসে বিএনপি সেই প্রতিশ্রুতি থেকে বেরিয়ে গিয়ে জনগণের সাথে প্রতারণা করেছে। সরকার জাতির সাথে দ্বিচারিতা করছে। জুলাই সনদ অক্ষরে অক্ষরে মানবে বলে জনগণের সাথে নতুন প্রতারণা করছে। যদি জুলাই সনদ অক্ষরে অক্ষরে পালনই করে তবে গণভোটের গণরায় মেনে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনে অনীহা কেন? জাতি সবই বুঝে। জনগণের সাথে প্রতারণা না করে জনগণের প্রত্যাশিত নতুন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে রাষ্ট্র কাঠামোর সংস্কারের উদ্যোগ নিতে তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।

গণমাধ্যম সংস্কারের প্রসঙ্গে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, তথ্য ও সম্প্রচার খাতের সংস্কার এখনো বাস্তব অগ্রগতি দেখতে পায়নি। যদিও এ বিষয়ে একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ ও বিভিন্ন প্রস্তাবনা সামনে এসেছে, তবুও সেগুলো কার্যকর করার উদ্যোগ চোখে পড়ছে না। রাজনৈতিক সংস্কার, বিচার বিভাগীয় সংস্কার এবং সাংবিধানিক সংস্কার বাস্তবায়িত না হলে গণমাধ্যম সংস্কারও কাক্সিক্ষত ফল দেবে না। তথ্য ও সম্প্রচার খাত সংস্কার নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে মোট ৬০টির বেশি প্রস্তাব আলোচনা হয়েছে। এর মধ্যে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে সরকারের নিয়ন্ত্রণমুক্ত করে জনগণের গণমাধ্যমে রূপান্তর, সরকারি বিজ্ঞাপন বণ্টনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, স্বাধীন মিডিয়া কমিশন বা কাউন্সিল গঠন, সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা ও অধিকার রক্ষা, তথ্য অধিকার আইন ও সম্প্রচার নীতিমালার উন্নয়ন এবং ডিজিটাল ও অনলাইন গণমাধ্যমের জন্য স্বচ্ছ নিয়ন্ত্রক কাঠামো গঠনের মতো বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছিল।

জামায়াত সেক্রেটারি বলেন, সাংবাদিকতাকে বিশ্বব্যাপী সভ্যতার মানদণ্ড, জাতির বিবেক এবং গণতন্ত্রের অন্যতম স্তম্ভ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু নৈতিকতার সঙ্কট, রাজনৈতিক প্রভাব এবং স্বার্থনির্ভর সংবাদ পরিবেশনের কারণে গণমাধ্যম তার কাক্সিক্ষত মর্যাদা হারাচ্ছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন সত্যভিত্তিক সাংবাদিকতা, জবাবদিহিমূলক গণমাধ্যম ব্যবস্থা এবং জনগণের প্রত্যাশার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ সংস্কার কার্যক্রম।

সভাপতির বক্তব্যে সাংবাদিক আবুল আসাদ বলেন, গণমাধ্যমের ওপর মানুষ আজ সন্তুষ্ট নয়। কারণ গণমাধ্যম জনগণের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠতে পারেনি। আমাদের দেশে কোনো সময়, কোনো কালেই গণমাধ্যম স্বাধীন ভূমিকা রাখতে পারেনি। তিনি নিজের সাংবাদিকতার ৫৪ বছরের ইতিহাস তুলে ধরে বলেন, ৫৪ বছরের সাংবাদিকতায় তিনি ৫৪ মাসও নিজের পুরো বেতন সম্মানি পাননি। সাংবাদিকেরা মালিক কর্তৃক শোষিত হওয়ার কারণে অনেক সময় অনেক সাংবাদিক অপেশাদারিত্বের দিকে ঝুঁঁকে পড়ে। এতে দেশ ও জাতির ক্ষতি হয়। তাই দেশ ও জাতির বৃহৎ স্বার্থে তথ্য ও সম্প্রচার খাতের সংস্কার অনিবার্য।

বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি ওবায়দুর রহমান শাহীন বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার জামায়াতে ইসলামী চালাচ্ছে বলে গুজব ও মিথ্যাচার করা হয়েছে। অথচ অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বাসস, পিআইবিসহ রাষ্ট্রীয় বার্তাসংস্থার সব স্তরে যাদেরকে ডিজি করেছিল তাদের অনেকেই ফ্যাসিস্টের দোসর। আবার অনেকেই কখনো সাংবাদিকতাই করেনি; তাদেরকেও নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। যার ফলে তথ্য ও সম্প্রচার খাত সংস্কার করা যায়নি। বিগত ১৫ বছর আমরা ফ্যাসিস্ট সরকারের বিরুদ্ধে আমাদেরকে জীবন ও রক্ত দিতে হয়েছে। বিনাবিচারে জেল-জুলুম নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে; কিন্তু নতুন বাংলাদেশে সেই ফ্যাসিবাদের ছায়া চলতে দেয়া যায় না।

ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি আবু সালেহ আকন বলেন, তথ্য ও সম্প্রচার সংস্কারের জন্য দু’টি জিনিস চূড়ান্ত করতে হবে। একটি হচ্ছে গণমাধ্যমের মালিক কারা হবেন এবং আরকেটি হচ্ছে সাংবাদিক কারা হবেন। কারণ গণমাধ্যমের মালিক হচ্ছে দুর্নীতিবাজ আর লুটেরা শ্রেণীর লোকজন। দুর্নীতি আর লুটের সম্পদ রক্ষা করতে সাংবাদিকদেরকে মালিকের পক্ষে ভূমিকা রাখতে বাধ্য করা হয়। অন্য দিকে সাংবাদিকদের ন্যূনতম বেতন দেয়া হয়। যেই বেতনে স্বাভাবিক জীবনযাপন করা যাচ্ছে না। ফলে বাধ্য হয়ে অনেক সাংবাদিক অন্যায়ের পক্ষে অবস্থান নেয়। তাই তথ্য ও সম্প্রচার খাতের সংস্কারের জন্য গণমাধ্যমের মালিক ও সাংবাদিকদের মাপকাঠি নির্ধারণ করতে হবে।

সেমিনারে লেখক ও সাংবাদিক আবুল আসাদের সভাপতিত্বে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন যুক্তরাষ্ট্রের ইস্টার্ন নিউ মেক্সিকো ইউনিভার্সিটির সহকারী অধ্যাপক ড. খাদেমুল ইসলাম হৃদয়। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন দৈনিক নয়া দিগন্তের সম্পাদক সালাহউদ্দিন মুহাম্মদ বাবর, একুশে টেলিভিশনের হেড অব নিউজ হারুনুর রশিদ, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি আবু সালেহ আকন, ঢাকা মেইলের সম্পাদক হারুন জামিলসহ গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বরা।