আনোয়ারুল ইসলাম
আগে থেকেই বিদ্যালয়ের বিভিন্ন জায়গায় নানান রঙ দিয়ে অনেক ছবি আঁকা হয়েছে। গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়টির মাঠে আজ বেশ ভিড়। পতাকা উত্তোলন হবে, ছাত্র-ছাত্রীরা দেশাত্মবোধক গান গাইবে, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হবে। কারণ আজ ১৬ ডিসেম্বর। মহান বিজয় দিবস। এ স্কুলের ক্ষুদে শিক্ষার্থী কুলছুম। সকাল থেকেই সে খুব ব্যস্ত। গতকাল রাতে মুক্তিযোদ্ধা দাদুর কাছে বিজয় দিবসের একটি বক্তব্য লিখে নিয়েছে। রাতে বারবার মনোযোগ দিয়ে বক্তব্যটি পড়েছে, যাতে কোনোরকম ভুল না হয়।
আজকের অনুষ্ঠানে কুলছুমের দায়িত্ব- বিজয় দিবসের ওপর একটি বক্তব্য দেয়া। সে খুব আনন্দে প্রস্তুতি নিচ্ছিল। কিন্তু মঞ্চে ওঠার আগে, তার পা দু’টি থরথর করে কাঁপছিল। এত মানুষ! চোখে মুখে ভয়ের ছাপ।
আশরাফুল স্যার বুঝতে পেরে কানে ফিসফিস করে বললেন, ‘কুলছুল, ভয় পেয়ো না। আমরা তো পাশে আছি।’ কুলছুম সাহস করে মাইকের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। উপস্থিত সবাইকে সালাম দিয়ে বলল, ‘আমি কুলছুম।’ তার কণ্ঠ একটু কাঁপল কিন্তু চোখে অফুরান শক্তি। ‘আজ আমরা একটি স্বাধীন দেশ পেয়েছি। একটি লাল-সবুজের পতাকা পেয়েছি। এই স্বাধীনতা এসেছে অনেক রক্তের বিনিময়ে, অনেক লড়াই, সংগ্রামের বিনিময়ে। আমরা যেন দেশকে মনেপ্রাণে ভালোবাসি, সত্য কথা বলি, দেশের সেবা করি এবং দেশের জন্য ভালো কিছু করি। এদেশ আমার, এদেশ আপনার, এদেশ সবার। দেশকে ভালোবাসা সবার নৈতিক দায়িত্ব, এই হোক আমাদের প্রতিশ্রুতি।’
মাঠে উপস্থিত দর্শকের করতালির শব্দে আকাশ বাতাস মুখরিত। সবাই বললেন, ‘সাব্বাস কুলছুম, তুমি আমাদের গর্ব।’ কুলছুম হাসল-আনন্দে, গর্বে আর নিজের ছোট বিজয়ের উচ্ছ্বাসে।
অনুষ্ঠান শেষে তার দাদুকে বলল, ‘দাদু আজ আমি ভয় পেলেও কথা বলেছি। এটিও এক ধরনের বিজয়, তাই না দাদু? তোমার দেয়া সাহসে আমি কথা বলার শক্তি পেয়েছি।’
দাদু তার মাথায় হাত রেখে বললেন, ‘হ্যাঁ বোন, তোমার নিজের ভয়কে জিততে পারাই আজকের সত্যিকারের বিজয়।’ কুলছুমের চোখে তখন দেশের লাল-সবুজের পতাকা বাতাসে পতপত করে উড়ছিল। আর সে বুঝতে পারল, বিজয় দিবস শুধু অতীতের গৌরব নয়, প্রতিদিনের ছোট ছোট সাহসের নামও বিজয়। আর এ বিজয় একটি দেশের গৌরবের প্রতীক।



