ভূমি রেজিস্ট্রেশনে কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি

টাকা দিলে বসতভিটা হয়ে যায় নালজমি

Printed Edition

শাহেদ মতিউর রহমান

জমি রেজিস্ট্রেশনে অপকৌশলে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে একটি চক্র। এই চক্রকে নিয়ন্ত্রণ করে রেজিস্ট্রেশন অফিসেরই কিছু কর্মকর্তা। জমি রেজিস্ট্রেশনে মৌজা এবং জমির রকমের ভিত্তিতেই মূলত রাজস্ব নির্ধারিত হয়। কিন্তু জমির রেজিস্ট্রি অফিসের নির্ধারিত মাধ্যমে অর্থ খরচ করতে পারলেই বসতভিটার মতো দামি জমিও হয়ে যায় কমদামি নালজমি। সম্প্রতি রাজধানীর গুলশান থানা সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে সরকারের রাজস্ব ফাঁকির এমন ঘটনা ঘটেছে। সাফকবলা একটি দলিলে জমির রকম বা শ্রেণী পরিবর্তন করে কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে এই চক্রটি।

অবশ্য এমন ঘটনা শুধু ঢাকার ২১টি সাব-রেজিস্ট্রার অফিসই নয়, দেশের অন্যান্য জেলা এবং উপজেলা পর্যায়ের সাব-রেজিস্ট্রার অফিসেও কর্মকর্তাদের দুর্নীতির কারণে সরকারের কোষাগারে রাজস্ব জমা না হয়ে অর্থ চলে যায় অসাধু কর্মকর্তাদের পকেটে।

ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রারসহ গুলশান ও মোহাম্মদপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে জমির শ্রেণী পরিবর্তন, ঘুষ বাণিজ্য ও দলিল সম্পাদনে অনিয়মের অভিযোগ এনে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে লিখিত আবেদনও করা হয়েছে। সূত্র জানায়, সরকারের করফাঁকির এই অভিযোগে ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রার মুন্সি মোখলেছুর রহমান, মোহাম্মদপুর থানার সাব-রেজিস্ট্রিার আব্দুল কাদের এবং গুলশান থানার সাব-রেজিস্ট্রার আব্দুল্লাহ আল মামুনের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে গত ৩ মে গুলশান সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে ১০ দশমিক ৬৬ কাঠা জমির একটি সাফকবলা দলিল সম্পাদন করা হয় (দলিল নম্বর ৩৪৫৯)। বাস্তবে জমিটি বসতভিটা হলেও দলিলে সেটিকে ‘নালজমি’ হিসেবে দেখানো হয়। এতে জমির শ্রেণী পরিবর্তনের মাধ্যমে রাজস্ব ফাঁকি ও দলিল প্রক্রিয়ায় একটি চক্রের চাপ প্রয়োগের অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগী জানান, অবৈধ পন্থায় দলিল সম্পাদন করতে দাতাপকে ভয়ভীতি দেখিয়ে দলিল সম্পাদনে বাধ্য করে সরকারি রাজস্বের একটি অংশ আত্মসাৎ করা হয়েছে।

অভিযোগপত্রে আরো বলা হয়েছে, ঢাকা জেলার অন্তত ২১টি সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দীর্ঘদিন ধরে সরকারের রাজস্ব ফাঁকির এমন নানা অনিয়ম আসলেও জেলা রেজিস্ট্রার মুন্সি মোখলেছুর রহমান কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেননি। বরং কিছু েেত্র তিনি অনিয়মে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের রায় ভূমিকা রেখেছেন বলে অভিযোগও করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে অডিট ও প্রশাসনিক কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন অফিস থেকে নিয়মিত অর্থ আদায়ের অভিযোগও উঠেছে। একই অভিযোগ রয়েছে মোহাম্মদপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের কর্মকর্তা আব্দুল কাদেরের বিরুদ্ধে অভিযোগ। তিনি অনিয়ম ও দলিল জালিয়াতির বিষয়গুলো ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করছেন।

একজন ভুক্তভোগী জানান, মোহাম্মদপুর সাব -রেজিস্ট্রি কার্যালয়ের নকলনবিশ আওলাদ হোসেন গত দেড় বছর ধরে বালাম বইয়ে কোনো তথ্য সংরণ করেননি। নিয়মনীতি উপো করে তার বিরুদ্ধে সাব-রেজিস্ট্রারের এজলাসে ওঠারও অভিযোগ রয়েছে। আর সাব-রেজিস্ট্রার আবদুল কাদের নিজ টাকায় দলিল স্ক্যানার বসিয়েছেন কার্যালয়ে। কিন্তু রেকর্ডরুমে এ ধরনের স্ক্যানার বসানোর কোনো নিয়ম নেই। স্ক্যানারের মাধ্যমে মানুষের দলিল স্ক্যান করা হচ্ছে, যাতে এক ধরনের আতঙ্কে ভুগছেন সংশ্লিষ্টরা। অফিসে স্ক্যানার মেশিন স্থাপনসহ কিছু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত প্রচলিত বিধির বাইরে গিয়ে নেয়া হয়েছে। অন্যদিকে গুলশান সাব-রেজিস্ট্রার আব্দুল্লাহ আল মামুনের বিরুদ্ধে দলিল সম্পাদনে অতিরিক্ত অর্থ গ্রহণ ও রাজস্ব ফাঁকি দেয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে।

সূত্র জানায়, কিছু সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দালাল চক্র সক্রিয় রয়েছে। এসব চক্রের মাধ্যমে দলিলপ্রক্রিয়া দ্রুত করার নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগও উঠেছে। দলিল সম্পাদন করতে আসা দলিলদাতা ও গ্রহীতাদের অনেকেই জানান, সাব- রেজিস্ট্রারদের এই চক্রের খপ্পরে পড়ে তারা ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। ২০২৪ সালের একটি পৃথক অভিযোগে আশুলিয়া সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের কিছু কর্মচারীর বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে ঘুষ গ্রহণ ও দলিলপ্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগও বেশ আলোচনায় ছিল।

সূত্র আরো জানায়, সাব-রেজিস্ট্রারের এসব অনিয়মের সুষ্ঠু তদন্ত হলে রেজিস্ট্রেশন প্রশাসনের ভেতরের প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসবে। একই সাথে দুর্নীতি দমন কমিশনসহ (দুদক) সংশ্লিষ্ট কর্তৃপরে হস্তপে কামনা করেছেন ভুক্তভোগীরা।

এ বিষয়ে ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রার মুন্সি মোখলেছুর রহমান জানান, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে আমি সাব-রেজিস্ট্রারদের বিরুদ্ধে বিভাগীয়ভাবে অবশ্যই ব্যবস্থা গ্রহণ করব। গুলশান সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের বিষয়টি নিয়ে তদন্ত চলছে। গুলশান থানার সাব-রেজিস্ট্রার আব্দুল্লাহ আল মামুনকে ফোন করলেও তিনি রিসিভ করেননি। নিবন্ধন অধিদফতরের এক কর্মকর্তা এই প্রতিবেদকে জানান সাব-রেজিস্ট্রেশন অফিসে ঘুষের অভিযোগ খুবই সাধারণ। ২০২৫ সালে দুদক ৩৫টি সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে অভিযান চালিয়েছিল। সে সময় দলিল রেজিস্ট্রি, নকল উত্তোলন ইত্যাদিতে অতিরিক্ত টাকা নেয়ার অভিযোগের সত্যতাও পেয়েছিল দুদকের তদন্ত টিম।