বিশেষ সংবাদদাতা
যমুনা সেতু, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেল কিংবা পদ্মা সেতুর মতো মেগা-প্রকল্পগুলো কেবল ইট-পাথরের অবকাঠামো নয়; এগুলো বাংলাদেশের কারিগরি সক্ষমতা এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রতীক। তবে পদ্মা-তিস্তা-ব্রহ্মপুত্রকে কেন্দ্র করে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘ওয়াটার-এনার্জি গ্রিড’ বা পানি-বিদ্যুৎ নেটওয়ার্কের ধারণা পূর্ববর্তী সব অভিজ্ঞতার চেয়ে বহু গুণ বড় ও জটিল। পাঁচ লাখ কোটি টাকারও বেশি ব্যয়ের এই মহাপরিকল্পনা বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আর্থিক ও কৌশলগত চ্যালেঞ্জ। প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্র কি এই বিশাল ব্যয়ের বোঝা বইতে পারবে?
১. ৫ লাখ কোটি টাকার আসল অর্থ কী? : বাংলাদেশের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) সাধারণত কয়েক লাখ কোটি টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, যা দিয়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবহন ও জ্বালানিসহ সব খাতের ব্যয় মেটানো হয়। সেই তুলনায় প্রস্তাবিত ওয়াটার-এনার্জি গ্রিডের প্রাক্কলিত ব্যয় পাঁচ লাখ কোটি টাকা।
এটি একক কোনো বছরের বাজেট নয় : বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটিকে ২০ থেকে ৩০ বছরের একটি ধাপে ধাপে বাস্তবায়নযোগ্য (চযধংবফ ওসঢ়ষবসবহঃধঃরড়হ) ‘প্রজন্মব্যাপী বিনিয়োগ পোর্টফোলিও’ হিসেবে দেখতে হবে। ফলে বার্ষিক বাজেটের ওপর এককালীন চাপ না পড়ে এই দীর্ঘমেয়াদি ব্যয় সময়ের সাথে সাথে অর্থনীতিতে ছড়িয়ে যাবে এবং আর্থিক ঝুঁকি হ্রাস পাবে।
বিশাল এই পুঁজি কোথায় ব্যয় হবে?
এই প্রকল্পের ব্যয় কেবল ব্যারাজ বা কংক্রিটের কাঠামো তৈরিতে সীমাবদ্ধ নয়, এটি একটি পূর্ণাঙ্গ সামাজিক-অর্থনৈতিক রূপান্তরের খরচ :
ক্স মূল অবকাঠামো : পদ্মা ব্যারাজ, যমুনা/ব্রহ্মপুত্র ব্যারাজ এবং তিস্তা অববাহিকার আধুনিকায়ন।
ক্স সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং : হাজার কিলোমিটার খাল পুনঃসংযোগ, নদী পুনঃখনন ও স্থায়ী নদীশাসন।
ক্স জ্বালানি নেটওয়ার্ক : পাম্পড স্টোরেজ অবকাঠামো, টারবাইন এবং উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন এইচভিডিসি বিদ্যুৎ সঞ্চালন গ্রিড।
ক্স সামাজিক ও পরিবেশগত মূল্য : ভূমি অধিগ্রহণ, পরিবেশ পুনর্বাসন এবং বাস্তুচ্যুত মানুষের দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন কর্মসূচি।
এটি কি কেবলই ব্যয়, নাকি বহুমাত্রিক বিনিয়োগ?
এই মহাপরিকল্পনার অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে নীতিনির্ধারকদের মধ্যে দু’টি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে :
ঝুঁকিকেন্দ্রিক বিশ্লেষণ (সমালোচকদের বক্তব্য)
ক্স ঋণের ফাঁদ : অতিরিক্ত বৈদেশিক ঋণনির্ভরতা সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি করতে পারে।
ক্স দীর্ঘায়িত সময়কাল ও দুর্নীতি : ২০-৩০ বছরের দীর্ঘ বাস্তবায়ন সময়ে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, নীতিগত অস্থিরতা এবং প্রকল্প পরিচালনায় দুর্নীতির কারণে ব্যয় কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
ক্স ধীরগতির রিটার্ন : এই প্রকল্পের অর্থনৈতিক সুফল প্রথাগত কারখানার মতো দ্রুত দৃশ্যমান হয় না, ফলে বিনিয়োগের কার্যকারিতা নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকে।
কৌশলগত রূপান্তর (সমর্থকদের বক্তব্য)
ক্স মাল্টি-সেক্টর ইমপ্যাক্ট : এটি কোনো একক খাতের প্রকল্প নয়। একই পুঁজি বিনিয়োগের মাধ্যমে একযোগে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, জ্বালানি নিরাপত্তা, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, লবণাক্ততা হ্রাস এবং অভ্যন্তরীণ নৌ-বাণিজ্য পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব। ফলে এর সামষ্টিক অর্থনৈতিক রিটার্ন প্রথাগত মেগা-প্রজেক্টের চেয়ে অনেক বেশি।
বিশ্বব্যাংক কি অর্থ দেবে? আন্তর্জাতিক অর্থায়নের কৌশল
এত বিশাল খাতের অর্থায়ন কেবল দেশীয় রাজস্ব দিয়ে সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন বহুমাত্রিক বৈশ্বিক অর্থায়ন কৌশল।
ক্স বহুপক্ষীয় উন্নয়ন ব্যাংক : বিশ্বব্যাংক এবং এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশের পানি ব্যবস্থাপনায় বড় অংশীদার। তবে তারা অর্থায়নের ক্ষেত্রে কঠোর পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব মূল্যায়ন এবং ঋণের স্থায়িত্ব বিশ্লেষণ করবে।
ক্স আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়ন : বাংলাদেশ বৈশ্বিকভাবে অন্যতম জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। এই মহাপরিকল্পনাকে যদি শুধু ‘ব্যারাজ নির্মাণ’ হিসেবে না দেখিয়ে একটি সমন্বিত ‘জলবায়ু অভিযোজন কর্মসূচি’ হিসেবে আন্তর্জাতিক তহবিলে উপস্থাপন করা যায়, তবে গ্লোবাল ক্লাইমেট ফান্ড থেকে বড় অঙ্কের অনুদান বা সহজ শর্তে ঋণ পাওয়া সম্ভব।
ক্স আঞ্চলিক ও কৌশলগত অংশীদারিত্ব : এটি যদি নেপাল-ভুটান ও ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জলবিদ্যুৎ ও বাণিজ্য করিডোরের সাথে যুক্ত হয়, তবে এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি) এবং আঞ্চলিক অবকাঠামো তহবিলের বিনিয়োগ আকর্ষণ করা সহজ হবে।
রোডম্যাপ : সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ
বিশেষজ্ঞদের মতে, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুরো গ্রিড একবারে শুরু না করে চারটি সুনির্দিষ্ট ধাপে অগ্রসর হওয়া উচিত।
[ধাপ ১: তিস্তা আধুনিকায়ন] ্র[ধাপ ২: যমুনা ব্যারাজ ও নদীশাসন] ্র [ধাপ ৩: পদ্মা ব্যারাজ ও দক্ষিণ-পশ্চিম পুনরুজ্জীবন] ্র [ধাপ ৪: পাম্পড স্টোরেজ ও আঞ্চলিক গ্রিড]
(কম ব্যয়ে দ্রুত ফল) ্র(কেন্দ্রীয় নদী স্থিতিশীলতা) ্র (খাদ্য ও পরিবেশ নিরাপত্তা) ্র (পূর্ণাঙ্গ ওয়াটার-এনার্জি গ্রিড)
আগামী ২৫ বছরে বাংলাদেশ কি কেবল আদানির মতো প্রকল্প থেকে বিদ্যুৎ আমদানির পেছনে ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’-এর ফিক্সড লায়াবিলিটি বা স্থায়ী ঋণের বোঝা টানবে, নাকি সেই ফান্ডের একটি অংশ ধাপে ধাপে দেশীয় দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো তৈরিতে রূপান্তর করবে- তা-ই এখন নীতিনির্ধারণী ফোরামের সবচেয়ে বড় কৌশলগত প্রশ্ন।
পরের কিস্তিতে পড়ুন : ২০৫০ সালের বাংলাদেশ : দুই দৃশ্যপটের গল্প ও ডেল্টা পুনর্জাগরণের ব্লুপ্রিন্ট



