ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি
১৯ জুলাইয়ের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ ও প্রাণহানির পর ২০ জুলাই শুরু হয় দেশব্যাপী কারফিউর প্রথম দিন। মধ্যরাত থেকে কার্যকর হওয়া কারফিউ এবং সেনাবাহিনী মোতায়েনের ফলে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের অধিকাংশ এলাকায় নেমে আসে থমথমে পরিস্থিতি। রাস্তায় যান চলাচল ছিল সীমিত, আর গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে মোড়ে অবস্থান নেয় সেনাবাহিনী, বিজিবি, র্যাব ও পুলিশ।
কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থার মধ্যেও রাজধানীর রামপুরা, বাড্ডা, শাহজাদপুর, যাত্রাবাড়ী, ভাটারা ও বনশ্রীসহ কয়েকটি এলাকায় কারফিউ উপেক্ষা করে বিক্ষোভ করেন আন্দোলনকারীরা। বিভিন্ন স্থানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাথে সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও গুলির ঘটনা ঘটে। রাজধানীর বাইরে বিভিন্ন জেলাতেও সংঘর্ষের খবর পাওয়া যায়।
সেদিন বিভিন্ন গণমাধ্যম ও হাসপাতাল সূত্রে অন্তত ২১ জনের মৃত্যুর খবর প্রকাশিত হয়। নিহতদের মধ্যে দু’জন পুলিশ সদস্যও ছিলেন। একই সময়ে মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় তথ্যপ্রবাহ সীমিত হয়ে পড়ে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ আরো বাড়ে।
দিনটির অন্যতম আলোচিত ঘটনা ছিল রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় সরকারের প্রতিনিধিদের সাথে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কয়েকজন সমন্বয়কের বৈঠক। বৈঠক শেষে তৎকালীন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক শিক্ষার্থীদের দাবিকে ‘যৌক্তিক’ ও ‘আলোচনার মাধ্যমে সমাধানযোগ্য’ বলে মন্তব্য করেন। তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত জানান, সমন্বয়করা আট দফা দাবি উপস্থাপন করেছেন এবং আলোচনা ইতিবাচক হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে আরো দাবি করা হয়, সমন্বয়করা ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছেন।
তবে আন্দোলনের সমন্বয়করা সরকারের এ বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করেন। তাদের অভিযোগ ছিল, কয়েকজন সমন্বয়ককে হেফাজতে নিয়ে তাদের বক্তব্য বিকৃতভাবে প্রচার করা হয়েছে। এক বার্তায় সমন্বয়ক আব্দুল কাদের বলেন, পূর্বঘোষিত দাবি বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন অব্যাহত থাকবে। পরবর্তীকালে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা সারজিস আলম ও হাসনাত আবদুল্লাহও অভিযোগ করেন, রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবনে নিয়ে তাদের ওপর চাপ প্রয়োগের চেষ্টা করা হয়েছিল।
এদিন ভোরে আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলামকে রাজধানীর খিলগাঁওয়ের একটি বাসা থেকে ডিবি পরিচয়ে তুলে নেয়ার অভিযোগ করে তার পরিবার। যদিও তৎকালীন গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) পক্ষ থেকে তাকে গ্রেফতারের বিষয়টি অস্বীকার করা হয়। একই সময়ে সারজিস আলম, হাসনাত আবদুল্লাহ ও হাসিব আল ইসলামের অবস্থান নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, যা আন্দোলনকারীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়ে দেয়।
রাজধানীর ভাটারা এলাকায় ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি (ইউআইইউ), নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি এবং ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশের (আইইউবি) শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভে অংশ নেন। রামপুরা, বনশ্রী ও বাড্ডা এলাকাতেও শিক্ষার্থীদের সাথে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংঘর্ষ হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাজধানীর আকাশে হেলিকপ্টার টহল দেয় এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথগুলোতে কঠোর নিরাপত্তা চেকপোস্ট বসানো হয়।
অন্য দিকে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে একটি হাইওয়ে পুলিশ ফাঁড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় শতাধিক মানুষ আটকা পড়েন। পরে সেনাবাহিনী, বিজিবি, র্যাব ও পুলিশের যৌথ অভিযানে হেলিকপ্টারের সহায়তায় তাদের উদ্ধার করা হয়। একই সময়ে বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) ভবন ও মেট্রোরেলের কয়েকটি স্থাপনায় হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় মামলা করা হয়। ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল) জানায়, ক্ষতিগ্রস্ত স্টেশনগুলো সচল করতে উল্লেখযোগ্য সময় লাগতে পারে।
কারফিউর প্রভাব পড়ে বিমান চলাচলেও। হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বেশ কয়েকটি ফ্লাইট বাতিল বা বিলম্বিত হয়। পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকার পরবর্তী দুই দিনের সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে এবং কারফিউর মেয়াদও বাড়ানোর সিদ্ধান্ত জানায়।
রাজনৈতিক অঙ্গনেও ছিল পাল্টাপাল্টি অভিযোগ। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের অভিযোগ করেন, কোটা আন্দোলনের আড়ালে বিএনপি-জামায়াত সহিংসতা উসকে দিচ্ছে। অন্য দিকে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সরকারের দমন-পীড়নের সমালোচনা করে বলেন, শক্তি প্রয়োগ করে আন্দোলন দমন করা সম্ভব নয়। এ সময় বিএনপির কয়েকজন নেতা এবং গণ-অধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুরকে আটক বা তুলে নেয়ার অভিযোগও প্রকাশ্যে আসে।
২০ জুলাই ছিল শুধু কারফিউ কার্যকরের প্রথম দিন নয়; রাষ্ট্রের কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা, সংঘর্ষ, রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং সরকার-আন্দোলনকারীদের আলোচনার সমান্তরাল বাস্তবতায় বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। কারফিউ জারি থাকলেও আন্দোলনের গতি থামেনি; বরং পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহের ভিত্তি আরো দৃঢ় হয়ে ওঠে এই দিনেই।



