নয়া দিগন্ত ডেস্ক
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পরও সংস্কার ও বিচার প্রক্রিয়ার অগ্রগতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন মানবাধিকারকর্মী, জুলাইযোদ্ধা, শহীদ পরিবারের সদস্য এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা। তাদের মতে, গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন এবং মানবাধিকার সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় সংস্কার ও বিচারকাজ আরও গতিশীল করা জরুরি।
গতকাল শনিবার ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিস্থিতি: সংস্কার ও বিচার’ শীর্ষক এক আলোচনা সভার আয়োজন করে মানবাধিকার সংগঠন অধিকার-এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মানবাধিকারকর্মীদের নেটওয়ার্ক।
জাতীয় প্রেস ক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত এ সভায় অধিকার-এর পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) এ এস এম নাসিরউদ্দিন এলান সঞ্চালকের দায়িত্ব পালন করেন।
আলোচনা সভায় জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের পরিবারের সদস্য, আহত জুলাইযোদ্ধা, সংসদ সদস্য, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর এবং গুম-সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের সাবেক সদস্যরা বক্তব্য দেন। জুলাই শহীদ শাহরিয়ারের মা মমতাজ বেগম গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পরও সন্তান হত্যার বিচার না পাওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেন।
পুলিশের গুলিতে বাম চোখের দৃষ্টি হারানো জুলাইযোদ্ধা মোহাইমিন পুলক বিক্ষোভ দমনে পেলেট গান ও প্রাণঘাতী অস্ত্রের ব্যবহার বন্ধের আহ্বান জানান।
শহীদ জাবিরের বাবা কবির হোসেন বলেন, থানায় মামলা করতে গেলে পুলিশ মামলা নিতে রাজি না হওয়ায় তাকে আদালতে মামলা দায়ের করতে হয়েছে। তিনি বলেন, গত দুই বছরে মাত্র সাতটি মামলার রায় হয়েছে। এ থেকেই বোঝা যায়, মামলাগুলোর অগ্রগতি আশাব্যঞ্জক নয়।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে যাত্রাবাড়ী এলাকায় নেতৃত্বদানকারী জুলাইযোদ্ধা রিদওয়ান হাসান বলেন, চরিত্রহননের মাধ্যমে জুলাই অভ্যুত্থানের নেতাদের বিতর্কিত করে জুলাইয়ের শক্তিকে দুর্বল করার চেষ্টা করা হয়েছে এবং সংস্কারের দাবিকে গলা টিপে হত্যা করা হয়েছে। ভবিষ্যতে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে যাতে বাধা সৃষ্টি না হয়, সে জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেন, প্রশাসনিক ও বিচারব্যবস্থায় জরুরি সংস্কারের ক্ষেত্রে কেবল জুলাইয়ের অঙ্গীকার থেকেই নয়, বরং বিএনপি তাদের নিজেদের ৩১ দফার অঙ্গীকার থেকেও সরে গেছে। জনপ্রশাসন, স্থানীয় সরকার ও ক্রীড়াঙ্গনে দলীয়করণ করে বিএনপি তাদের প্রতিশ্রুতি লঙ্ঘন করেছে। বিএনপির সংসদ সদস্য মানসুরা আক্তার বলেন, বিরোধিতা গণতন্ত্রের অংশ। রাষ্ট্র পরিচালনায় বিরোধী মতকে বিবেচনায় নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য বিএনপি ভিন্নমতকে সবসময় স্বাগত জানায়। তিনি বলেন, গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও জনকল্যাণমূলক বিষয়ে ঐকমত্য প্রয়োজন।
বিএনপি কর্তৃক সম্প্রতি নির্বাচন কমিশন ও অন্যান্য সংস্থায় দলীয় ব্যক্তিদের নিয়োগের সমালোচনা করে এনসিপির সদস্যসচিব ও সংসদ সদস্য আক্তার হোসেন বলেন, এসব উদ্যোগ সংস্কারের অঙ্গীকারের পরিপন্থী। এছাড়া তিনি দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচারের বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য বিএনপির প্রতি আহ্বান জানান।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাইবার সিকিউরিটি প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা তার বক্তব্যে বিচার প্রক্রিয়ার ধীরগতির কয়েকটি কারণ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বিচারপ্রক্রিয়ায় প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক তদবির এবং তদন্তের ক্ষেত্রে জনবলের সীমাবদ্ধতা অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
গুম-সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের সাবেক সদস্য ড. নাবিলা ইদ্রিস বলেন, গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে গুম বন্ধ হওয়ার পর আবার এমন ঘটনা ফিরে আসা গভীর উদ্বেগের বিষয়। তিনি বলেন, বিএনপি কর্তৃক ২০০৯ সালের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন পুনর্বহালের ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই বাগেরহাটে মিরাজ শেখ নামে এক ব্যক্তি গুম হন। অভিযুক্ত বাহিনীর মাধ্যমেই তদন্তের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, এমন ব্যবস্থার মাধ্যমে কখনো ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও এনসিপি নেতা সারোয়ার তুষার বলেন, মানবাধিকার কমিশন আইন ও গুম প্রতিরোধবিষয়ক অধ্যাদেশকে আইনে পরিণত করার আগে বিএনপি এগুলো পর্যালোচনা করে আরও ভালো আইন প্রণয়নের প্রতিশ্রুতি দিলেও তারা যে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইনের প্রস্তাব করেছে, তা আওয়ামী লীগ আমলের ২০০৯ সালের আইনের চেয়েও দুর্বল। তার দাবি, ওই প্রস্তাবে কমিশনের তদন্তের ক্ষেত্রে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা রাখা হয়নি। এছাড়া গুমের ঘটনায় পুলিশের তদন্তের ক্ষমতা রেখে প্রস্তাবিত খসড়া আইনও বিচারপ্রক্রিয়ায় বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
জাতীয় যুবশক্তির সভাপতি তারিকুল ইসলাম জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিস্থিতি মূল্যায়ন করতে গিয়ে বলেন, গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার যথাযথ বাস্তবায়ন হয়নি। বিশেষ করে রাষ্ট্রের কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা কাঠামো পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কার না হওয়ায় নতুন করে ফ্যাসিবাদী শক্তির উত্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, সংস্কারের ক্ষেত্রে ব্যর্থতার কারণেই গণঅভ্যুত্থানের পর প্রথম গুমের ঘটনা হিসেবে গত ১০ এপ্রিল বাগেরহাটের মিরাজ শেখের গুমের ঘটনা ঘটেছে বলে তিনি মনে করেন।



