সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে এবার আসছে গুচ্ছগ্রাম-৩য় পর্যায় প্রকল্প কার্যক্রম। ভূমিহীন, গৃহহীন, ঠিকানাহীন এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও নদীভাঙনের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে পুনর্বাসনের উদ্দেশ্যে তৃতীয় পর্যায়ের এই গুচ্ছগ্রাম প্রকল্প। এতে ২০ হাজার ভূমিহীন পরিবারকে পুনর্বাসনের জন্য নেয়া প্রকল্পটির বাস্তবায়নে পাঁচ বছরে খরচ ধরা হয়েছে ৭৬৩ কোটি ৭০ লাখ টাকা। এ দিকে প্রকল্প প্রস্তাবনা দলিলে (ডিপিপি) শুদ্ধতা না হওয়ায় দফায় দফায় ফেরত যাচ্ছে ডিপিপি। শুধু ২০২৫ সালের মার্চ থেকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এ নিয়ে আটদফা ফাইল চালাচালি হয়েছে। এখন আবারো পুনর্গঠিত প্রকল্প প্রস্তাবনা অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে বলে পরিকল্পনা কমিশন ও ভূমি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে। উল্লেখ্য, ১৯৯৭ সালে তৎকালীন সরকার প্রথম বৃহৎ আকারে ‘গুচ্ছগ্রাম (ক্লাস্টার ভিলেজ)’ প্রকল্প গ্রহণ করে।
ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে থাকা ভূমিহীন ও ছিন্নমূল পরিবারগুলোকে এক জায়গায় এনে মাথা গোঁজার ঠাঁই নিশ্চিত করার জন্য এই প্রকল্প নেয়া হয়। সুবিধাবঞ্চিত পরিবারগুলোকে স্থায়ী বাসস্থান প্রদানের মাধ্যমে তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করা ও নদীভাঙন বা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সর্বস্ব হারানো মানুষদের পুনর্বাসন করতে স্বাধীনতা-পরবর্তী বৃহত্তর নোয়াখালী জেলায় ৪টি গুচ্ছগ্রাম প্রতিষ্ঠা করে এক হাজার ৪৭০টি ভূমিহীন পরিবারকে পুনর্বাসন করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীনে আদর্শগ্রাম প্রকল্প-১, আদর্শগ্রাম প্রকল্প-২, গুচ্ছগ্রাম (সিভিআরপি) প্রকল্প এবং গুচ্ছগ্রাম-২য় পর্যায় (সিভিআরপি) প্রকল্পের আওতায় সর্বমোট এক লাখ ২৭ হাজার ৫৪০টি ভূমিহীন গৃহহীন পরিবারকে পুনর্বাসন করা হয়। এরপর আবার গুচ্ছগ্রাম-১ (প্রথম পর্যায়) প্রকল্প ২০০৯ সালে শুরু হয়। পরবর্তীতে, জলবায়ু উদ্বাস্তুদের জন্য ‘গুচ্ছগ্রাম-২য় পর্যায় (ক্লাইমেট ভিকটিমস রিহ্যাবিলিটেশন)’ প্রকল্পটি অক্টোবর ২০১৫ থেকে জুন ২০২০ মেয়াদে বাস্তবায়ন করা হয়। এর উদ্দেশ্য, শুধুমাত্র ঘর দেয়া নয়, বরং পুনর্বাসিত পরিবারগুলোর জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি এবং সহজ শর্তে বা জামানতবিহীন ঋণ প্রদানের মাধ্যমে তাদের স্বাবলম্বী করে তোলা।
গুচ্ছগ্রাম-৩য় পর্যায় : ভূমি মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, মূলত ২০২৫ সালে এই প্রকল্পের প্রস্তাবনা তৈরির কাজ শুরু হয়। ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীনে ভূমিহীন, গৃহহীন, ঠিকানাহীন এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও নদী ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে পুনর্বাসনের উদ্দেশ্যে ৭৬৩ কোটি ৭০ লাখ টাকা ব্যয়ে ৫ বছরের জন্য প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়, যা চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ২০৩০ সালের ডিসেম্বর মেয়াদে বাস্তবায়ন করা হবে। প্রথম প্রস্তাবনায় ৭৭৬ কোটি ৬২ লাখ টাকা ব্যয়ে ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০৩০ সালের জুন পর্যন্ত ৫ বছর মেয়াদে প্রকল্প প্রস্তাবনা তৈরি করা হয়। এখানে ২০ হাজার ভূমিহীন পরিবারকে পুনর্বাসনের জন্য পরিকল্পনা নেয়া হয়।
দুই মন্ত্রণালয়ে দফায় দফায় সভা : পরিকল্পনা কমিশনের কৃষি, পানিসম্পদ ও পল্লীপ্রতিষ্ঠান বিভাগের সংশ্লিষ্টরা জানান, ওই ডিপিপি নিয়ে পরিকল্পনা কমিশনের কৃষি, পানি সম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগে মূল্যায়ন কমিটির সভা হয় ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে। তাতে ১৫টি সুপারিশসহ ডিপিপি সংশোধনের জন্য ফেরত দেয়া হয়। সেই আলোকে ডিপিপি সংশোধন করে আবার পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়। তখন ব্যয় ধরা হয় ৭৭০ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। এরপর ২০২৬ সালের ১৩ জানুয়ারি আবার পিইসি হয়। সেই সভা থেকে ১১টি সুপারিশ দেয়া হয়। এরপর খরচ আরো কমিয়ে ৭৬৪ কোটি টাকায় এনে সংশোধিত ডিপিপি পাঠানো হয় কমিশনে। তাতেও বেশ কিছু ত্রুটি ও বিচ্যুতি পায় পিইসি। কিছু সুপারিশ যথাযথভাবে প্রতিপালন করা হয়নি বলে কমিশন থেকে জানা গেছে। পুনর্গঠিত ডিপিপিতে গুচ্ছগ্রাম-৩ প্রকল্পের ব্যয় আরো কমিয়ে ৭৬৩ কোটি ৭০ লাখ টাকায় আনা হয়। আর এই প্রকল্পটি চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত এডিপিতে বরাদ্দবিহীন অননুমোদিত প্রকল্পের তালিকা বা সবুজপাতায় অন্তর্ভুক্ত আছে।
আগে বাস্তবায়িত প্রকল্পগুলো : দু’টি মন্ত্রণালয়ের অধীনে ইতঃপূর্বে আদর্শগ্রাম প্রকল্প-১, আদর্শগ্রাম-২, গুচ্ছগ্রাম (ক্লাইমেট ভিকটিমস রিয়্যাবিলিটেশন প্রকল্প, গুচ্ছগ্রাম-২য় পর্যায় (ফ্লাইমেট ভিকটিমস রিহ্যাবিলিটেশন প্রজেক্ট) প্রকল্পের আওতায় জুলাই ১৯৮৮ হতে জুন ২০২৪ পর্যন্ত ৩ হাজার ৩২৫টি আদর্শগ্রাম এবং গুচ্ছগ্রামে এক লাখ ২৭ হাজার ৮৭৩টি ভূমিহীন গৃহহীন, ঠিকানাহীন, নদীভাঙ্গা পরিবারকে পুনর্বাসন করা হয়েছে। গুচ্ছগ্রাম-২য় পর্যায়ে (ক্লাইমেট ভিকটিমস রিহ্যাবিলিটেশন প্রজেক্ট) প্রকল্পটি মোট ৯১৭ কোটি ৯৪ লাখ টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে অক্টোবর ২০১৫ হাত জুন ২০২৪ পর্যন্ত মেয়াদে বাস্তবায়ন হয়েছে। গুচ্ছগ্রাম-২য় পর্যায় (ক্লাইমেট ভিকটিমস রিহ্যাবিলিটেশন প্রজেক্ট) প্রকল্পের প্রকল্প সমাাপ্ত প্রতিবেদন (পিসিআর) বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ থেকে অনুমোদন হয়েছে। গুচ্ছগ্রাম-২য় পর্যায় (ক্লাইমেট ভিকটিমস রিহ্যারিলিটেশন প্রজেক্ট) প্রকল্পের ধারাবাহিকতায় ভূমিহীন, গৃহহীন, ঠিকানাহীন এবং দুর্যোগ ও নদীভাঙনের ফলে দুর্গত পরিবারকে পুনর্বাসনের উদ্দেশ্যে তৃতীয় পর্যায়ে প্রকল্প।
প্রকল্পের ব্যাপারে ভূমি মন্ত্রণালয় বলছে, বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার ২০২৬ এর চতুর্থ অধ্যায়ের অঞ্চলভিত্তিক সুষম উন্নয়ন অংশে প্রত্যেক নাগরিকের অন্যতম মৌলিক অধিকার বাসস্থান নিশ্চিতকল্পে গুচ্ছগ্রাম আবাসন নির্মাণ, সীমিত আয়ের ও বস্তিবাসী মানুষের জন্য আবাসন সুবিধা প্রদানের কথা বলা হয়েছে। বলা হয়েছে, ভাসমান ও ছিন্নমূল জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন ও নিরাপদ পুনর্বাসনের লক্ষ্যে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণের কথা। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে এই গুচ্ছগ্রাম ৩য় পর্যায় প্রকল্প। প্রকল্পটি এখন অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে।



