ভিসি নিয়ে ডুয়েটে দফায় দফায় সংঘর্ষ : ২০ শিক্ষার্থী আহত

হেলমেট পরে বহিরাগতদের হামলা

Printed Edition

গাজীপুর জেলা ও মহানগর প্রতিনিধি

গাজীপুরে অবস্থিত ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (ডুয়েট) নবনিযুক্ত ভাইস চ্যান্সেলরের (ভিসি) যোগদানকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়েছে। এতে উভয় পক্ষের ইটপাটকেলের আঘাতে বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন।

জানা গেছে, নবনিযুক্ত ভিসির অপসারণ এবং নিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নিয়োগের দাবিতে অব্যাহত আন্দোলন কর্মসূচিতে হেলমেট পরিহিত ও বহিরাগতদের হামলার অভিযোগ করেছে শিক্ষার্থীদের একপক্ষ। অপরপক্ষ বিশ^বিদ্যালয়ের পরিবেশ অশান্ত করতে নানা তৎপরতা চালাচ্ছে বলে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে গতকাল দিনব্যাপী দফায় দফায় সংঘর্ষ চলে। এতে অন্তত ২০ ছাত্র আহত হয়েছেন। সংঘর্ষ থামাতে পুলিশ কাঁদানেগ্যাস ও রাবার বুলেট ছুড়েছে বলে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা দাবি করেছেন। ছাত্রদের একাংশের দাবি ডুয়েটের অবকাঠামো ও গবেষণাগার উন্নয়নের জন্য প্রায় ৮৬৬ কোটি ৫৫ লাখ টাকা বরাদ্দের একটি বড় প্রকল্প একনেকে অনুমোদিত হয়েছে। এটি ঘিরে অসৎ উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে একটি চক্র সক্রিয় থাকতে পারে।

দেখা গেছে, ডুয়েট ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীরা ও বহিরাগতরা মুখোমুখি অবস্থায় আছে। সংঘর্ষ চলাকালে বিশ^বিদ্যালয় এলাকায় যানচলাচল বন্ধ থাকায় এসএসসি পরীক্ষার্থীসহ স্থানীয় কয়েক লাখ মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েন। শিক্ষার্থীরা বলছেন, বহিরাগতদের হামলা ও সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা ক্যাম্পাসকে অবরুদ্ধ করে রাখায় তারা জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত; পুলিশের আচরণে আস্থা রাখতে পারছেন না। তবে পরিস্থিতি বর্তমানে নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

জানা গেছে, সরকার সম্প্রতি শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইকবালকে ডুয়েটের নতুন ভিসি হিসেবে নিয়োগ দেয়। এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারির পর থেকেই ডুয়েটের সাধারণ শিক্ষার্থীরা তা প্রত্যাখ্যান করে আন্দোলনে নামেন। বৃহস্পতিবার রাত থেকে বিক্ষোভ, মানববন্ধন ও সড়ক অবরোধ কর্মসূচি পালন করে আসছিলেন তারা। শিক্ষার্থীদের দাবি, ভিসি ডুয়েটের শিক্ষকদের মধ্য থেকেই নিয়োগ দিতে হবে।

পূর্বঘোষিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে গতকাল সকালে শিক্ষার্থীরা ‘লাল কার্ড’ কর্মসূচি পালন করতে শহীদ মিনার এলাকায় জড়ো হন। এ সময় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে একপর্যায়ে ত্রিমুখী সংঘর্ষ হয়।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সংঘর্ষ চলাকালে পুলিশের পাশাপাশি হেলমেট পরিহিত কিছু বহিরাগত ব্যক্তিকেও ঘটনাস্থলে দেখা গেছে। তবে তারা কারা বা কোন পক্ষের ছিল, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা দাবি করেন, তাদের কর্মসূচি সম্পূর্ণ সাধারণ শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন। ডুয়েট একটি বিশেষায়িত প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ায় এখানকার শিক্ষাব্যবস্থা, গবেষণাকার্যক্রম ও প্রশাসনিক বাস্তবতা সম্পর্কে অভ্যন্তরীণ শিক্ষকদের অভিজ্ঞতা বেশি। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন ও গবেষণার স্বার্থে অভ্যন্তরীণ শিক্ষক থেকেই ভিসি নিয়োগ প্রয়োজন।

এদিকে ছাত্রদের একটি অংশ দাবি করেছে, ডুয়েটের অবকাঠামো ও গবেষণাগার উন্নয়নের জন্য প্রায় ৮৬৬ কোটি ৫৫ লাখ টাকা বরাদ্দের একটি বড় প্রকল্প একনেকে অনুমোদিত হয়েছে। প্রকল্পটি ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৯ সালের জুন পর্যন্ত বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে। এই বরাদ্দের টাকা নিয়ে একটি চক্র অসৎ উদ্দেশ্যে নানা কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে পারে।

গাজীপুর সদর মেট্রো থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো: আমিনুল ইসলাম জানান, শিক্ষার্থীদের ইটপাটকেল নিক্ষেপে তিনি নিজেসহ অন্তত পাঁচ পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। এ ছাড়া কয়েকজন পথচারীও আহত হয়েছেন। তবে বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।

গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের আরএমও ডা: ফরহাদ হোসেন জানান, হাসপাতালে আট ছাত্র ও ছয় পুলিশ চিকিৎসা নিয়েছেন।

বিভিন্ন সংগঠনের নিন্দা

এদিকে এই সংঘর্ষের ঘটনায় বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন পৃথক বিবৃতি দিয়েছে। বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির ডুয়েট শাখার সভাপতি ও সেক্রেটারি এক বিবৃতিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে বহিরাগতদের মাধ্যমে হামলা চালানো হয়েছে। হামলায় জড়িতদের দ্রুত চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় আনতে হবে।

আর কেন্দ্রীয় সভাপতি নূরুল ইসলাম ও সেক্রেটারি জেনারেল সিগবাতুল্লাহ এক যৌথ বিবৃতিতে অভিযোগ করেন, আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রদল, যুবদল ও বহিরাগত সন্ত্রাসীরা হামলা চালিয়েছে। সেই সাথে আন্দোলনকারীদের ওপর টিয়ার শেল ও গুলি নিক্ষেপসহ সাংবাদিকদের কাজেও বাধা দেয়া হয়েছে।

অপর দিকে ছাত্রদলের পক্ষ থেকে দেয়া পৃথক বিবৃতিতে অভিযোগ করা হয়, সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে ছাত্রশিবির সংশ্লিষ্ট কিছু কর্মী ক্যাম্পাসে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করছে। ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেতারা এ ঘটনায় জড়িতদের চিহ্নিত করে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানান।

এ দিকে একটি সূত্র জানিয়েছে, নবনিযুক্ত ভিসি ক্যাম্পাসে ঢুকতে না পেরে ডুয়েট সংলগ্ন ইউএনও অফিসে বসে যোগদানপত্রে সই করেছেন। তবে এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এ অবস্থায় বর্তমানে ক্যাম্পাসে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।