আবার বাড়ল ফার্নেস অয়েলের দাম

Printed Edition

বিশেষ সংবাদদাতা

  • লিটারে বেড়েছে প্রায় ২০ শতাংশ
  • বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির নতুন চাপ
  • সঙ্কুচিত হতে পারে ব্যবসা-বাণিজ্য

দেশে আবারো বাড়ানো হয়েছে ফার্নেস অয়েলের দাম। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি, মার্কিন ডলারের উচ্চ বিনিময় হার এবং আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে নতুন মূল্য নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রতি লিটার ফার্নেস অয়েলের দাম প্রায় ২০ শতাংশ বাড়িয়ে ৯৪ টাকা ৬৯ পয়সা থেকে ১১৩ টাকা ৫৪ পয়সা করা হয়েছে; অর্থাৎ এক লিটারেই দাম বেড়েছে ১৮ টাকা ৮৫ পয়সা। গতকাল সোমবার জারি করা এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। নতুন মূল্য গতকাল মধ্যরাত থেকেই কার্যকর হবে বলে জানিয়েছে কমিশন।

মাত্র এক মাসের ব্যবধানে দ্বিতীয় দফায় এই মূল্যবৃদ্ধিতে শিল্প, বিদ্যুৎ ও পরিবহন খাতে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এর আগে চলতি বছরের ১২ এপ্রিল ফার্নেস অয়েলের দাম ৭০ টাকা ১০ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৯৪ টাকা ৬৯ পয়সা করা হয়েছিল; অর্থাৎ দুই দফায় খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে জ্বালানিটির দাম প্রায় ৪৩ টাকা বেড়ে গেল।

বিইআরসির তথ্যমতে, গতকাল অনুষ্ঠিত বিশেষ কমিশন সভায় আন্তর্জাতিক বাজারে আমদানি করা পরিশোধিত ফার্নেস অয়েলের গড় মূল্য, ক্রুড অয়েলের এফওবি (ফ্রি অন বোর্ড) মূল্য এবং ডলারের বিনিময় হার বিশ্লেষণ করে নতুন মূল্যহার নির্ধারণ করা হয়েছে। কমিশনের গঠিত বিশেষ কমিটি গত কয়েক মাস ধরে প্ল্যাটস রেট, আমদানি ব্যয় এবং বৈদেশিক মুদ্রার বাজার পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে মূল্য সমন্বয়ের সুপারিশ দেয়। সেই সুপারিশের ভিত্তিতেই নতুন এই দাম কার্যকর করা হয়েছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফার্নেস অয়েলের দাম বৃদ্ধির সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়বে বিদ্যুৎ খাতে। কারণ দেশে এখনো উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বিদ্যুৎকেন্দ্র ফার্নেস অয়েলনির্ভর। বিশেষ করে দ্রুত বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ব্যবহৃত রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল কেন্দ্রগুলোতে এই জ্বালানি ব্যবহার হয় বেশি। ফলে জ্বালানির দাম বাড়লে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়ও বেড়ে যাবে। এতে ভবিষ্যতে পাইকারি কিংবা খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর চাপ তৈরি হতে পারে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) সাবেক এক কর্মকর্তা বলেন, ‘ফার্নেস অয়েলের দাম বাড়লে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পায়। সরকার যদি ভর্তুকি না বাড়ায়, তাহলে শেষ পর্যন্ত গ্রাহক পর্যায়ে এর প্রভাব পড়বে।’ শুধু বিদ্যুৎ খাত নয়, শিল্প উৎপাদন ব্যয়ও বাড়ার আশঙ্কা করছেন উদ্যোক্তারা। দেশের অনেক শিল্পকারখানায় সরাসরি কিংবা পরোক্ষভাবে ফার্নেস অয়েল ব্যবহৃত হয়। বিশেষ করে তৈরী পোশাক, স্টিল, সিরামিক, টেক্সটাইল ও ভারী শিল্প খাতে জ্বালানি ব্যয় উৎপাদন খরচের বড় একটি অংশ। নতুন মূল্য কার্যকর হলে এসব খাতের উৎপাদন ব্যয় আরো বেড়ে যাবে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, এমনিতেই ডলার সঙ্কট, ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহার এবং কাঁচামালের দাম বৃদ্ধির কারণে শিল্প খাত চাপে রয়েছে। এর মধ্যে জ্বালানি ব্যয় বাড়লে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। অনেক ছোট ও মাঝারি শিল্প প্রতিষ্ঠান উৎপাদন কমাতে বাধ্য হতে পারে। অর্থনীতিবিদদের মতে, ফার্নেস অয়েলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের ওপরই পড়বে। কারণ শিল্প উৎপাদন ব্যয় বাড়লে পণ্যের দামও বাড়বে। একই সাথে পরিবহন খরচ বাড়ার কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ ব্যয়ও বৃদ্ধি পাবে। এতে মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, জ্বালানি খরচ বাড়া মানেই পুরো অর্থনীতিতে ব্যয়ের চাপ তৈরি হওয়া। এটি শিল্প উৎপাদন থেকে শুরু করে পরিবহন, কৃষি ও বাজারব্যবস্থায় প্রভাব ফেলে। ফলে মূল্যস্ফীতি আরো বাড়তে পারে। জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক বাজার এখনো অস্থির রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, বৈশ্বিক সরবরাহ সঙ্কট এবং ডলারের শক্তিশালী অবস্থানের কারণে আগামী দিনগুলোতেও জ্বালানি খাতে চাপ অব্যাহত থাকতে পারে। ফলে দেশে আরো মূল্য সমন্বয়ের আশঙ্কা উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না। অন্য দিকে বিইআরসি বলছে, আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে সামঞ্জস্য রেখে জ্বালানির মূল্য নির্ধারণ করা হচ্ছে। এতে সরকারের ভর্তুকির চাপ কমবে এবং জ্বালানি খাতের আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকবে। কমিশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বাজার পরিস্থিতি অনুযায়ী ভবিষ্যতেও প্রয়োজন হলে দাম সমন্বয় করা হবে। তবে সাধারণ ভোক্তাদের মধ্যে এ সিদ্ধান্ত নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, জ্বালানির দাম বাড়ার সুযোগে পরিবহন ভাড়া ও নিত্যপণ্যের দামও বেড়ে যাবে। যদিও সরকার বাজারে অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি ঠেকাতে নজরদারি বাড়ানোর কথা বলছে।

জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু মূল্য সমন্বয়ের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে দক্ষতা বাড়ানো না গেলে ভবিষ্যতেও বারবার জ্বালানির দাম বাড়ানোর চাপ তৈরি হবে। আর এর প্রভাব পড়বে শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর।