ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন-ইসরাইলি যুদ্ধ অবৈধ : চীন

বেইজিংয়ে চীনা ও ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠক

Printed Edition
ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন-ইসরাইলি যুদ্ধ অবৈধ : চীন
ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন-ইসরাইলি যুদ্ধ অবৈধ : চীন

মিডল ইস্ট আই

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের শুরু করা যুদ্ধকে ‘অবৈধ’ বলে মন্তব্য করেছে চীন। বুধবার বেইজিংয়ে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচির সাথে এক বৈঠকে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই এই মন্তব্য করেন। বৈঠকে ওয়াং ই বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, উত্তেজনা প্রশমনে দ্রুত একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতি জরুরি এবং সঙ্কট নিরসনে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সরাসরি সংলাপ শুরু হওয়া প্রয়োজন। এই সঙ্কট সমাধানে চীন সক্রিয়ভাবে ভূমিকা রাখতে প্রস্তুত বলেও জানান তিনি। চীনের এই অবস্থানকে স্বাগত জানিয়ে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের পদক্ষেপের বিরুদ্ধে বেইজিংয়ের অবস্থান ইরানের প্রতি তাদের বন্ধুত্বপূর্ণ মনোভাবের প্রতিফলন। তিনি বলেন, এই হামলা সরাসরি আগ্রাসনের শামিল এবং আন্তর্জাতিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন। আরাকচি আরো জানান, তেহরান কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমেই নিজেদের অধিকার ও স্বার্থ রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে যেকোনো সমাধান হতে হবে ন্যায্য ও সর্বাঙ্গীণ- এমন শর্তেই তারা চুক্তিতে সম্মত হবে।

বেইজিংয়ে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই এর সাথে বৈঠক করেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি। গতকাল বুধবার চীনের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সিনহুয়া এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। বৈঠকে দুই দেশের সম্পর্কের পাশাপাশি বর্তমান আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, আরাকচির এই বেইজিং সফর তাৎপর্যপূর্ণ। বেইজিংয়ে আসার মাত্র এক সপ্তাহ আগে, আরাকচি রাশিয়া সফর করেছিলেন। ওই সফরে তিনি রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের সাথে বৈঠক করেন। মস্কো সফরের পরপরই তার এই চীন সফর মধ্যপ্রাচ্য ও বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এ দিকে এই সফরের প্রেক্ষাপটে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও চীনকে আহ্বান জানিয়েছেন, তারা যেন ইরানকে জানায়, তাদের বর্তমান পদক্ষেপ দেশটিকে ‘বিশ্বব্যাপী বিচ্ছিন্নতার’ দিকে ঠেলে দিচ্ছে। উল্লেখ্য, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই সফরের এক সপ্তাহ পরই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চীন সফরের পরিকল্পনা রয়েছে। সফরকালে চীনের শীর্ষ নেতা শি জিনপিংয়ের সাথে তার বৈঠক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই’র সাথে বৈঠকের পর আরাকচি বলেন, ‘আলোচনায় আমরা আমাদের বৈধ অধিকার ও স্বার্থ রক্ষায় সর্বোচ্চ চেষ্টা করবো। আমরা শুধুমাত্র একটি ন্যায্য ও ব্যাপক চুক্তি গ্রহণ করবো।’ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সাথে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে চীনে ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এটি প্রথম সফর। ইরানি সংবাদমাধ্যম পার্সটুডে জানিয়েছে, ইরানের স্বার্থ রক্ষা করে এমন কোনো স্থায়ী ও ন্যায়সঙ্গত সমাধান ছাড়া তেহরান অন্য কিছু মেনে নেবে না, ওয়াশিংটনকে স্পষ্ট বার্তা দিয়ে বলেছেন আরাকচি।

চীনকে ‘ঘনিষ্ঠ বন্ধু’ অভিহিত করে চলমান পরিস্থিতিতে বেইজিংয়ের অবস্থান ও সহযোগিতার জন্য তেহরান কৃতজ্ঞ বলে জানান আরাকচি। ইরান ও চীনের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরো জোরদার হবে, এমন আশা প্রকাশ করেছেন তিনি। অপরদিকে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রকে চলমান যুদ্ধবিরতি বজায় রাখার আহ্বান জানান। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালীতে আরোপিত সব ধরনের অবরোধ তুলে নেয়া দরকার বলে মন্তব্য করেছেন তিনি। ওয়াং ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সামরিক আগ্রাসনের তীব্র সমালোচনা করে বলেন, এই সঙ্ঘাতের পরিণতি এই অঞ্চলের বাইরেও বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত।

একটি কূটনৈতিক প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিয়ে আরাকচি বেইজিংয়ের ধারাবাহিক অবস্থানের জন্য, বিশেষ করে ওয়াশিংটন ও তেলআবিবের নিন্দা জানানোর জন্য ধন্যবাদ জানান এবং চীনকে একজন ‘আন্তরিক বন্ধু’ ও কৌশলগত অংশীদার হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে তেহরান ও বেইজিংয়ের মধ্যে সহযোগিতা আরো গভীর হবে। ইরানের মন্ত্রী চলমান যুদ্ধকে একটি ‘প্রকাশ্য আগ্রাসন’ এবং ‘আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন’ বলে অভিহিত করেন এবং বলেন, ইরান তার অধিকার দৃঢ়ভাবে রক্ষা করার পাশাপাশি কূটনীতির পথ অনুসরণ করবে।

আরাকচি ৪০ দিনের এই সঙ্ঘ(াত চলাকালে ‘যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের দ্বারা সংঘটিত অপরাধসমূহ’, যার মধ্যে মানবিক আইনের লঙ্ঘনও অন্তর্ভুক্ত, সে বিষয়ে ওয়াংকে অবহিত করেন। তিনি জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদের ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে চীনের ‘নীতিগত অবস্থানের’ প্রশংসা করেন এবং আশা প্রকাশ করেন যে, বর্তমানে পরিষদের আবর্তনশীল সভাপতিত্বে থাকা বেইজিং পরিস্থিতি আরো খারাপ হওয়া রোধ করতে সাহায্য করবে। জবাবে ওয়াং ইরানের জনগণের সহনশীলতার প্রশংসা করেন এবং ইরানের সার্বভৌমত্ব, ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা ও জাতীয় নিরাপত্তার প্রতি চীনের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি শক্তি প্রয়োগের বিরুদ্ধে বেইজিংয়ের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন এবং সংলাপের মাধ্যমে যুদ্ধ শেষ করা ও স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে চীনা নেতৃত্বের প্রস্তাবিত চার দফা পরিকল্পনাকে সমর্থন জানান।

উভয়পক্ষ দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য সহযোগিতার অগ্রগতিও পর্যালোচনা করেছে এবং উচ্চ-পর্যায়ের আলোচনা অব্যাহত রাখতে সম্মত হয়েছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ওয়াং এবং আরাকচির মধ্যে অন্তত তিনটি ফোনালাপের পর এই সফরটি অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এর মধ্যে ১৫ এপ্রিলের একটি কথোপকথনও রয়েছে, যেখানে আরাকচি নিরাপত্তা পরিষদে মার্কিন-সমর্থিত একটি প্রস্তাবের বিরোধিতা করার জন্য চীন ও রাশিয়ার প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, এই পদক্ষেপটি পরিস্থিতি আরো খারাপ হওয়া থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করেছে। কুইন্সি ইনস্টিটিউট ফর রেসপনসিবল স্টেটক্রাফটের বোর্ড সদস্য আমির হান্দজানি বলেন, ‘শি জিনপিংয়ের সাথে ট্রাম্পের শীর্ষ সম্মেলনের আগে তেহরান ও বেইজিং তাদের স্বার্থ সমন্বয় করছে।’