ক্রীড়া প্রতিবেদক
দামি গাড়ি হঁাঁকিয়ে একে একে আসছেন কর্মকর্তারা। ক্লাব ভবনে কিছুক্ষণ বসে প্রয়োজনীয় কাজ সেরে তারা চলে যাচ্ছেন। সাথে আগামীকাল আবার আসবো এই আশ^াস। এই হলো বতর্মানে মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব লিমিটেডের পরিবেশ। কর্মকর্তাদের এই ব্যাপক উপস্থিতির নেপথ্য ৯ মার্চ দর্শকপ্রিয় এই ক্লাবের নির্বাচন। নির্বাচনে জিতে ক্লাবের দায়িত্ব পাওয়ার জন্যই এই তোড়জোড়। সাথে আছে ক্লাব কর্মকর্তাদের দুই গ্রুপে ভাগ হয়ে একে-অপরের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়া। ক্লাব কর্মকর্তাদের মধ্যে যখন এই অবস্থা তখন করুণ দশা ক্লাবের ফুটবলার এবং কোচিং স্টাফদের। তারা লম্বা সময় ধরে বেতন পাচ্ছেন না। দেশী ও বিদেশী ফুটবলাররা পাচ্ছেন না চার মাসের বেতন। আর কোচিং স্টাফদের বেতন বকেয়া সাত মাসের। তাই প্রশ্ন, নির্বাচনের পর কি জেগে উঠবে মোহামেডান। সব বিভাগে শক্তিশালী দল গড়ে কি শিরোপার জন্য দল গড়া সম্ভব হবে। মোহামেডান ক্লাব কর্মকর্তা মোস্তাকুর রহমান এ নিয়ে কোনো কথাই বলতে চাইলেন না। নাম প্রকাশে মোহামেডানের সাথে ঘনিষ্ঠ একজন জানান, কোনো পরিবর্তনই হবে না। যেভাবে চলার সেভাবেই চলবে। ভালো লোক নির্বাচিত না হলে কোনো লাভই হবে না। গতকাল ছিল নির্বাচনে মনোনয়নপত্র কেনার শেষ দিন।
নির্বাচন কেন্দ্রিক কর্মকর্তারা যখন ক্লাব ভবনের ভেতরে নির্বাচনী ছক কষছেন তখন বাইরে ফুটবলারদের হাহাকার। কোচিং স্টাফদের একজন একটু জোর গলায় বলতে থাকলেন, আমরা সাত মাস বেতন পাই না আর কর্মকর্তারা ক্ষমতা দখলের জন্য নির্বাচন নিয়ে কী ব্যস্ত। অথচ আমাদের বকেয়া বেতনের কোনো খোঁজ নেই। পরশু বিকেলে ঠিক সেই সময়ই প্র্যাকটিস শেষে ক্লাব ভবনে প্রবেশ করছিল মোহামেডান ফুটবল দল।
১ সভাপতি এবং ১৬ জন পরিচালকের জন্য ভোট দেবেন ৩৬৬ জন কাউন্সিলর। ১ মার্চ মনোনয়ন পত্র জমা দেয়ার তারিখ। প্রত্যাহারের তারিখ ৩ মার্চ। সর্বশেষ মোহামেডান ক্লাবে নির্বাচন হয়েছিল ২০২১ সালের ৬ মার্চ। সেই কমিটির মেয়াদ ২০২৩ সালের ৫ মার্চ শেষ হয়ে যায়। ওই মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটিই এখনো দায়িত্ব পালন করছেন। সময় শেষ হওয়ার তিন বছর পর এবার নির্বাচনী প্রক্রিয়া।
ক্লাব সভাপতি কে হবেন সেটিই একটি আলোচ্য। একটি পক্ষ বিএনপি নেতা বরকত উল্লাহ বুলুকে সভাপতি হিসেবে চাচ্ছে। অন্য পক্ষ তা মানতে চাচ্ছে না। তারা বিকল্প হিসেবে বিএনপি নেতা মির্জা আব্বাস, শিল্প, বাণিজ্য, বস্ত্র ও পাটপ্রতিমন্ত্রী শরীফুল আলম, সাবেক ফুটবল কমিটির চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার গোলাম মোহাম্মদ আলমগীরকেও সভাপতি করতে চেয়েছিল। তবে এদের কেউই সভাপতি পদে মনোনয়নপত্র কেনেননি। বরকত উল্লাহ বুুলু প্রথমে সভাপতি পদে মনোনয়নপত্র কিনেছেন। এরপর গতকাল সভাপতি পদে মনোনয়নপত্র ক্রয় করেছেন বিএনপি নেতা জয়নাল আবদিন ফারুক, সাজিদ এ এ আদেল, পারটেক্স গ্রুপের শওকত আজিজ রাসেল। অবশ্য এই তিনজন একই সাথে পরিচালক পদেও মনোনয়নপত্র ক্রয় করেছেন।
পরিচালক পদে মনোনয়নপত্র কেনা অন্যরা হলেন জহির আহমেদ, আমিরুল ইসলাম বাবু, নাসির উদ্দিন চৌধুরী, আবু হাসান চৌধুরী প্রিন্স, বিএনপি নেতা মির্জা আব্বাসের ছেলে মির্জা ইয়াসির আব্বাস, নিলোফার চৌধুরী মনি, সরকার মাহবুব আহমেদ, লোকমান হোসেন ভূঁঁইয়া, সারওয়ার হোসেন, জামাল রানা, আব্দুর রব মাহাবুব, এম এ সালাম, খায়রুল কবির খোকন, গ্রুপ ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ আলমগীর, মোহাম্মদ মঞ্জুর আলম, ছাঈদ হাছান কানন, প্রকৌশলী কবীর আহমেদ ভূঁইয়া, এনায়েত হোসেন সিরাজ, আবুল কালাম, মোস্তফা কামাল, সৈয়দ রুম্মান বিন ওয়ালী সাব্বির, মাহবুব উল আনাম, মাহমুদ হাসান খান, মোস্তাকুর রহমান, রিয়াজ উদ্দিন, আরিফুল হক প্রিন্স, মিজানুর রহমান ও জাকির হোসেন চৌধুরী।
একটি সূত্র বলছে সরকারের উপরের মহলের নির্দেশ ছাড়া হয়তো কেউ এবার ক্লাবের সভাপতি পদে নির্বাচন করতে পারবে না। অবশ্য সবাই মিলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সমোঝাতার ভিত্তিতে নির্বাচন করার চেষ্টা চলছে। সেই চেষ্টার কথা জানান মোস্তাকুর রহমান। এক কর্মকর্তার মতে, সমঝোতা হলে খুবই ভালো। নির্বাচন গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরি করলেও এতে পারস্পরিক শত্রুতা বাড়ে।
ক্লাবের সমর্থকরা যোগ্য সংগঠক চান। যারা ক্লাব চালাতে পারবেন এমন লোক। ক্লাবটি দক্ষ সংগঠক শূন্য হয়ে গেছে বলেই ক্লাবটির আজ এই অবস্থা।
তবে এরই মধ্যে সুখবর, মোহামেডান ক্লাব ফিফার নিষেধাজ্ঞা মুক্ত হয়েছে। ইরানি ফুটবলার মাইসামের করা অভিযোগে ফিফা সাদাকালো শিবিরকে নতুন ফুটবলার রেজিস্ট্রেশনে নিষেধাজ্ঞা জারি করে। মাইসাম ৬০ হাজার ডলার বকেয়া বলে ক্লাবের বিপক্ষে অভিযোগ করে ফিফার কাছে। ফলে বাধ্য হয়েই মোহামেডান ক্লাব তার বকেয়া দেয়া শুরু করেছে। আপাতত ১০ হাজার ডলার দেয়া হয়েছে। ক্লাবের সাবেক ফুটবল কমিটির চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার গোলাম মোহাম্মদ আলমগীর এ ১০ হাজার ডলার দেন। দুঃসময়ে তিনি ক্লাবটির পাশে ছিলেন। তবে যখন একটি মামলায় কারাগারে ছিলেন তখন কেউ তার খোঁজও নেননি। এতে রাগে ক্ষোভে পরবর্তীতে ফুটবল কমিটির চেয়ারম্যানের পদ ছেড়ে চলে যান আলমগীর।
ক্লাব কর্মকর্তাদের এই দলাদলিই প্রভাব ফেলেছে মাঠে। এখন চেয়ার দখলের জন্য তারা মরিয়া। সংশ্লিষ্টদের মতে, সমাধান এক্ষেত্রে একটাই সমঝোতার ভিত্তিতে একটি ঐক্যবদ্ধ কমিটি করা। শেষ পর্যন্ত তা না হলে হয়তো আগামীতেও বাজে সময় যাবে ক্লাবটির। গত বাংলাদেশ প্রিমিয়ার ফুটবল লিগের চ্যাম্পিয়নরা এবার ভালো অবস্থানে নেই। কারণ তারা ধরে রাখতে পারেনি গতবারের নামকরা খেলোয়াড়দের। এ দিকে ক্লাবে কেমন কমিটি হওয়া উচিত এই বিষয়ে আজ ক্লাব ভবনে সংবাদ সম্মেলন করবে মোহামেডান সমর্থকরা।


