কাওসার আজম
চারদিকে উঁচু দালান, যানজট আর ধুলোর দাপট। এর মধ্যে নরম ঘাস, স্বচ্ছ পানির লেক, দুলতে থাকা বাঁশঝাড় আর নানা প্রজাতির গাছপালা দেখে অনেকেই থমকে দাঁড়াচ্ছেন। কেউ ছবি তুলছেন, কেউ খুঁজে নিচ্ছেন কিছুটা প্রশান্তি। কংক্রিটের শহরেও যে এক টুকরো গ্রামের স্বপ্ন বেঁচে থাকতে পারে, সেটিই ফুটিয়ে তোলা হয়েছে রাজধানীর জাতীয় বৃক্ষমেলায়। মেলার প্রবেশ মুখে প্রায় তিন হাজার বর্গফুট জায়গাজুড়ে প্রকৃতির এমন এক জীবন্ত ক্যানভাসে থমকে দাঁড়াচ্ছেন দর্শনার্থীরা। কিছু সময়ের জন্য তারা ভুলে যাচ্ছেন যানজট, ধুলা আর কংক্রিটে ঘেরা নগরজীবনের ক্লান্তি। অথচ এই সবুজের গল্প কোনো সরকারি প্রকল্পের নয়। এটি একজন মানুষের স্বপ্ন, সাধনা আর দুই দশকের নিরলস সংগ্রামের ফসল। তিনি জাতীয় বৃক্ষরোপণ পুরস্কারপ্রাপ্ত উদ্যোক্তা মো: রকিবুল আমিন।
যিনি শিক্ষার্থী থাকা অবস্থায় ১৪ হাজার টাকার লোকসান দিয়ে উদ্যোক্তা জীবনের পথচলা শুরু করেছিলেন। আজ তার প্রতিষ্ঠিত ‘গার্ডেনিং বাংলাদেশ’ দেশের ল্যান্ডস্কেপিং শিল্পের অন্যতম পথিকৃৎ। শতাধিক প্রকল্প বাস্তবায়ন, প্রায় ১০০ জনের স্থায়ী কর্মসংস্থান, প্রতিদিন আরো ১০০ থেকে ২৫০ জন শ্রমিকের কাজের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে তার প্রতিষ্ঠানে। বছরে চার থেকে পাঁচ কোটি টাকার ব্যবসা করে তিনি প্রমাণ করেছেন, সবুজ শুধু সৌন্দর্যের প্রতীক নয়; এটি হতে পারে সম্ভাবনাময় একটি শিল্প, কর্মসংস্থানের উৎস এবং টেকসই নগর গঠনের শক্তিশালী হাতিয়ার।
শৈশব থেকেই প্রকৃতির প্রতি টান : কুষ্টিয়ার সবুজ পরিবেশে বেড়ে ওঠা রকিবুল আমিনের শৈশব কেটেছে ফুল, গাছ আর পাখির সান্নিধ্যে। পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ার সময়ই নিজের বাড়িতে গোলাপসহ নানা ফুলের বাগান গড়ে তুলেছিলেন। অন্যরা যেখানে পাঁচ ধরনের ফুল লাগাতেন, তিনি চেষ্টা করতেন সাত বা দশ ধরনের ফুল সংগ্রহ করতে। ছোটবেলার সেই আগ্রহই ধীরে ধীরে জীবনের লক্ষ্য হয়ে ওঠে।
মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকে পড়ার সময় প্রকৃতির সৌন্দর্য, দৃশ্যপট ও নান্দনিকতা তাকে গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলেছিল। ইন্টারনেটের সাথে পরিচয়ের পর সাইবার ক্যাফেতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বাগান, ল্যান্ডস্কেপ ও উদ্যান নকশা নিয়ে পড়াশোনা করতেন।
ঢাকায় এসে বদলে যায় ভাবনা : ২০০১ সালে উচ্চশিক্ষার জন্য ঢাকায় এসে ঢাকা কলেজের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। তখনই কংক্রিটের শহরে সবুজের সঙ্কট তাকে নাড়া দেয়। তিনি উপলব্ধি করেন, শহরের মানুষ প্রকৃতি থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। সেই উপলব্ধি থেকেই মানুষের বাসস্থানে প্রকৃতির ছোঁয়া ফিরিয়ে দেয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন।
১৪ হাজার টাকার লোকসান থেকে যাত্রা : উদ্যোক্তা জীবনের শুরুটা মোটেও সহজ ছিল না। ২০০৬ সালে পহেলা ফাল্গুন উপলক্ষে ধার করা ১৪ হাজার টাকা দিয়ে শাহবাগ থেকে গোলাপ কিনেছিলেন। কিন্তু হঠাৎ বৃষ্টিতে সব ফুল নষ্ট হয়ে যায়। বড় ধরনের লোকসানে পড়েন রকিবুল আমিন। হতাশ না হয়ে পরদিন এক চীনা ফুল ব্যবসায়ীর সহযোগিতায় ২০০টি গোলাপ সংগ্রহ করেন। বন্ধুদের নিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে সেই গোলাপ বিক্রি করে লোকসান কাটিয়ে ওঠেন। সেই অভিজ্ঞতাই তাকে ফুল ব্যবসার প্রতি আরো আত্মবিশ্বাসী করে তোলে।
‘একেশিয়া’ থেকে ‘গার্ডেনিং বাংলাদেশ’ : ২০০৮ সালে বসুন্ধরা সিটি শপিং মলে ‘একেশিয়া’ নামে একটি ছোট দোকান চালু করেন। সেখানে ইনডোর প্লান্ট ও ডেকোরেটিভ গাছ বিক্রি শুরু করেন। একদিন প্রায় ৭৫ হাজার টাকার ইনডোর প্লান্ট বিক্রি হওয়ার পর তিনি বুঝতে পারেন, মানুষের ঘরে প্রকৃতি পৌঁছে দেয়ার বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। তবে পরে বসুন্ধরা কর্তৃপক্ষ ফুলের দোকান সরিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত দিলে ব্যবসায় বড় ধাক্কা লাগে। প্রায় দুই বছর অনিশ্চয়তার মধ্যে কাটানোর পর সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাথে যোগাযোগ বাড়ান।
ল্যান্ডস্কেপিংয়ে নতুন দিগন্ত : ২০১৬ সালে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের মাধ্যমে আর্মি স্টেডিয়ামের ল্যান্ডস্কেপিংয়ের দায়িত্ব পান। ডিজাইনভিত্তিক সেই প্রকল্প সফলভাবে বাস্তবায়নের পর একের পর এক নতুন কাজ আসতে থাকে।
২০১৯ সালে প্রতিষ্ঠানের নতুন নাম দেয়া হয় ‘গার্ডেনিং বাংলাদেশ’। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি রকিবুল আমিনকে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি আর্মি স্টেডিয়াম, আর্মি সদরদফতর, বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান, সিলেটের একাধিক রিসোর্ট, নিকুঞ্জ লেক, জিওন রিসোর্টসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে শতাধিক ল্যান্ডস্কেপ প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। প্রতিটি প্রকল্পই আলাদা নকশা ও বৈচিত্র্যের মাধ্যমে তৈরি হয়েছে। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সড়ক, রিসোর্ট, করপোরেট প্রতিষ্ঠান, পোশাক কারখানা, আবাসন প্রকল্প, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, ইকোপার্ক, লেক ও ব্যক্তিগত বাড়িতে সবুজায়নের কাজ করছে।
১০০ স্থায়ী চাকরি, প্রতিদিন কাজ পান আরো ২৫০ জন : রকিবুল জানান, বর্তমানে গার্ডেনিং বাংলাদেশে প্রায় ১০০ জনের স্থায়ী কর্মসংস্থান হয়েছে। এ ছাড়া প্রকল্পভেদে প্রতিদিন ১০০ থেকে ২৫০ জন দৈনিক শ্রমিক কাজ করেন। গত ছয়-সাত বছর ধরে নিয়মিত এ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটিতে ল্যান্ডস্কেপ আর্কিটেক্ট, সিভিল ইঞ্জিনিয়ার, ভাস্কর, শিল্পীসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ কাজ করছেন। দলগত আলোচনার মাধ্যমে প্রতিটি প্রকল্পের পরিকল্পনা ও নকশা তৈরি করা হয়।
বছরে আয় ৪ থেকে ৫ কোটি টাকা : বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক আয় প্রায় চার থেকে পাঁচ কোটি টাকা। তবে রকিবুলের দাবি, চাইলে আয় আরো অনেক বাড়ানো সম্ভব ছিল। কিন্তু ব্যবসার মুনাফার বড় অংশই তিনি প্রতিষ্ঠান সম্প্রসারণ, কর্মীদের জীবনমান উন্নয়ন, পরিবেশ রক্ষা ও সামাজিক উদ্যোগে ব্যয় করেন। তিনি বলেন, ল্যান্ডস্কেপিং শুধু ব্যবসা নয়; এটি সমাজ, পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য প্রয়োজনীয় একটি উদ্যোগ।
পরিবেশ রক্ষায় নানা উদ্যোগ : গার্ডেনিং বাংলাদেশ শুধু বাগান তৈরি করে না। প্রতিষ্ঠানটি মাটির উর্বরতা উন্নয়ন, বর্জ্য অপসারণ, পানি সংরক্ষণ এবং পরিবেশবান্ধব ল্যান্ডস্কেপিং নিয়েও কাজ করছে।
রকিবুলের নতুন ভাবনা ‘জিরো সয়েল’-অর্থাৎ কোনো খোলা মাটি অনাবৃত না রাখা। তার মতে, প্রতিটি খোলা জায়গা ঘাস, লতা বা অন্য উদ্ভিদ দিয়ে ঢেকে দেয়া গেলে নগরের তাপমাত্রা কমবে, জীববৈচিত্র্য রক্ষা পাবে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবও কমবে।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও স্বীকৃতি : ২০২২ সালে নেদারল্যান্ডসে অনুষ্ঠিত বিশ্বের সবচেয়ে বড় হর্টিকালচার প্রদর্শনীতে বাংলাদেশ অংশ নেয়। সেখানে বাংলাদেশের স্টল দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে। সেই স্টলের ল্যান্ডস্কেপিংয়েও কাজ করেছে গার্ডেনিং বাংলাদেশ। দেশে টানা কয়েকটি জাতীয় বৃক্ষমেলায় অংশ নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি ল্যান্ডস্কেপিংকে সাধারণ মানুষের কাছে পরিচিত করে তুলেছে।
জাতীয় পুরস্কারের স্বীকৃতি : সবুজায়নে দীর্ঘদিনের অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রণালয় রকিবুল আমিনকে ‘বৃক্ষরোপণে জাতীয় পুরস্কার-২০২৫’-এ বৃক্ষ গবেষণা, সংরক্ষণ ও উদ্ভাবন বিভাগে সম্মানিত করেছে। তার ভাষায়, এই পুরস্কার গন্তব্য নয়; বরং আরো বড় দায়িত্বের সূচনা।
তরুণদের জন্য সম্ভাবনার নতুন শিল্প : রকিবুল আমিনের বিশ্বাস, ল্যান্ডস্কেপিং বাংলাদেশের উন্নয়নের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠবে। এই শিল্পে আগামী দিনে হাজার হাজার শিক্ষিত তরুণের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। তার স্বপ্ন, বাংলাদেশের প্রতিটি শহর, গ্রাম, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, অফিস, ছাদ ও বারান্দায় সবুজের উপস্থিতি নিশ্চিত করা।
তিনি বলেন, ‘আমরা শূন্য হাতে শুরু করেছিলাম। আজ ল্যান্ডস্কেপিংকে একটি শিল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার পথে অনেকটা এগিয়েছি। আমি বিশ্বাস করি, আগামী দিনে এই খাত দেশের অর্থনীতি, পরিবেশ ও কর্মসংস্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। একটি সবুজ বাংলাদেশ গড়াই আমাদের লক্ষ্য।’



