নিজস্ব প্রতিবেদক
আমি বাংলাদেশে ইরানি রাষ্ট্রদূত হিসেবে অনেক দিনের প্রত্যাশা ছিল যে বাংলাদেশে এ ধরনের ইরান যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে আলোচনার একটা প্রক্রিয়া তৈরি হবে। আমরা উভয় পক্ষই এই যুদ্ধের যে পরিণতি, সেটার বিষয়ে মত প্রকাশ করতে পরব। এটা শুধু ইরান যুদ্ধ নয়। আমরা কখনোই যুদ্ধে পক্ষ নই, আমাদের লক্ষ্য একটা সভ্যতা, বিশ্বের কার্পেট, জাফরান পণ্যের দেশ ইরান। আমরা একটি ইসলামী দেশ, আমাদের জনগণ ও সরকার কখনই যুদ্ধের পক্ষে নয়। আমাদের ওপর আমেরিকা ও ইসরাইল হামলা করেছে। এখন আমরা প্রতিরক্ষার অবস্থায় আছি। কাজেই এই যুদ্ধ ইরান যুদ্ধ নয়, এই যুদ্ধটা আমেরিকার পক্ষে থেকে আরোপিত একটি দুর্বার।
গতকাল রাজধানীর বনানীতে দুপুরে হোটেল সারিনায় ইরান যুদ্ধের আঞ্চলিক ও বাংলাদেশ প্রভাব ‘ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি মোকাবেলায় সমন্বিত কৌশলের আহ্বান’ শীর্ষক সেমিনারে এ কথা বলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত জালিল রাহিমি জাহানাবাদি।
‘নেক্সাস ডিফেন্স অ্যান্ড জাস্টিস’ আয়োজিত এই সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ হাসান নাসির। এতে দেশের শীর্ষস্থানীয় ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক, বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, অর্থনীতিবিদ, রাজনীতিবিদ, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা অংশ নেন। এই অঞ্চলের যুদ্ধের প্রভাব নিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে গ্যাস ও জ্বালানি আমদানি করে। হরমুজ প্রণালীতে বাংলাদেশী কিছু জাহাজ আটকে আছে। এজন্য আমরা ওখান থেকে চিঠি লিখেছি তেহরানকে। বাংলাদেশের সরকারের পক্ষ থেকে ডিপ্লোম্যাটিক তৎপরতা আছে। দুই সপ্তাহ আগেও আমি ইরানে গিয়েছি এবং এ বিষয় নিয়ে আমি কথা বলেছি। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইরানের এই চিঠিটি জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলকে দিয়েছে। সেই চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে আমি সেখানে জোর দিয়ে বলেছি, বাংলাদেশের জনগণ মুসলমান। তাদের সাথে আমাদের ভাতৃত্বমূলক ও বন্ধুত্বসুলভ একটা সম্পর্ক রয়েছে। বাংলাদেশ সরকার আমাদের বিভিন্নভাবে সহায়তা দিয়েছে। ওষুধ সহায়তা দিয়েছে, বাংলাদেশ আমাদের প্রকৃত বন্ধু। এখন সিদ্ধান্ত হয়েছে বাংলাদেশের আটকে পড়া জাহাজগুলো কিভাবে পার পেতে পারে এ ব্যাপারে তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছে।
তিনি আরো বলেন, প্রকৃত অবস্থা আমি তুলে ধরছি যে হরমুজকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি খুবই জটিল। সেখানে কে বন্ধু কে শত্রু কে মিত্র সেটা পার্থক্য করাটা একটু কঠিন হয়ে গেছে। অনেক ক্ষেত্রে আমাদের ভয় হয় এই পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালীতে বাংলাদেশের জাহাজ পার হতে গেলে বন্ধু ও শত্রু একাকার হয়ে যেতে পারে এবং হামলার শিকার হতে পারে। আমি আরো জোর দিয়ে কথা বলব যেন বাংলাদেশের জাহাজগুলো এই প্রণালী দিয়ে পার হতে পারে। আর সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে এই সমাধানটা স্থায়ীভাবে সমাধান হোক। যাতে হরমুজ ও বাংলাদেশসহ সবার অর্থনীতির যে সমস্যা সেটা মিটে যায়। তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে বা বিশ্বে যা ঘটছে তা অত্যন্ত তিক্ত। আজকে বিশ্বে একে-অপরের প্রতি নির্ভরশীল। কাজেই যেকোনো প্রান্তে ঘটনা-দুর্ঘটনা যাই ঘটুক না কেন সারা বিশ্বে কমবেশি প্রভাবিত হয়। এখন মধ্যপ্রাচ্যে যে যুদ্ধ চলছে সে যুদ্ধটা মূলত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার বাহানায় এই যুদ্ধটা শুরু করা হয়েছে। এখন আমেরিকা-ইসরাইলসহ সারা বিশ্বের মানুষ জানে এই যুদ্ধটা ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার বাহানা।
এই যুদ্ধটা কেন শুরু করা হয়েছে সে বিষয়ে কয়েকটা পয়েন্ট উল্লেখ করে বলেন, আমেরিকার ধারণা- নতুন বিশ্বব্যবস্থায় চীন হচ্ছে তাদের জন্য একট বড় প্রতিবন্ধক। তারা মনে করে বিশ্বের অর্থনৈতিক-সামরিক আধিপত্যের জন্য চীন বড় বাধা। আমেরিকা মনে করে এশিয়ান ব্লক যেটা এটাকে যেকোনোভাবে দুর্বল করতে হবে। এজন্য তারা ন্যাটোকে সম্পৃক্ত করেছে ইউক্রেন পর্যন্ত, রাশিয়ার সীমান্ত পর্যন্ত। যাতে রাশিয়াকে যুদ্ধে সম্পৃক্ত করা যায়। ইসরাইল যুদ্ধকে বাহানা করে রাশিয়ার বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্লক করে দিয়েছে।
তিনি বলেন, যখন সমস্ত সামরিক শক্তি রাশিয়ার সীমান্তে নিয়ে আসবে এবং তাদের মিত্র শক্তিদের রাশিয়ার সীমান্তে নিয়ে আসবে তখন খুবই স্বাভাবিক রাশিয়া তার জন্য খুবই উদ্বিগ্ন হবে। আমেরিকা রাশিয়াকে অর্থনৈতিকভাবে, সামাজিকভাবে সামরিকভাবে দুর্বল করতে চাচ্ছে। যাতে রাশিয়া কখনো এশিয়ার পক্ষ না নিতে পারে। আমেরিকা মনে করে ৬৭ শতাংশ জ্বালানি মধ্যপ্রাচ্য থেকে সারা বিশ্বে সরবরাহ হয় এবং তারা চীনকে মাইনাস করতে চাইছে। মধ্যপ্রাচ্যে থেকে চীন, জাপান ও বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতে মোটামুটি এশিয়ান যে ব্লকটা তাদেরকে এই জ্বালানি দেয়া হয়। আমেরিকানরা মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি নেয় না। আমরা যখন আমেরিকার সাথে আলোচনায় ছিলাম ঠিক আলোচনার মাঝখানে আমেরিকা ও ইসরাইল হামলা করেছে। এই হামলা করে একটা জটিল পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। এখন হরমুজ নিয়ে যে সমস্যা চলছে, এর মাধ্যমে আসলে মধ্যপ্রাচ্যে জ্বালানি সরবরাহে ব্যঘাত সৃষ্টি করে চীনকে এবং চীনের মিত্র রাশিয়া, এশিয়ায় তার মিত্র দেশকে চাপে রাখতে এই পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে।
আমেরিকা মধ্যপ্রাচ্য থেকে পরে পূর্ব এশিয়া, চীন- এ দিকে অগ্রসর হবে। আমাদের ইরানে একটা প্রবাদ আছে- ‘আমরা যদি কারো পায়ে পাড়া দিয়ে ঝগড়া করতে যাই তখন আমরা এটা বলি, তোমার গরু আমার কুকুরকে কামড় দিয়েছে।’
আমেরিকাকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, ওরা প্রকৃতপক্ষে এশিয়ার দেশগুলো যেমন ইরান, চীন বা চীনের মতো যে দেশগুলো আছে তাদেরকে মানবাধিকার বা বাকস্বাধীনতার অজুহাতে চাপ সৃষ্টি ও প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে। আসলে পুরা বিশ্ব এখন আমেরিকা ও ইসরাইলের আধিপত্য ও আগ্রাসনের কোরবানে পরিণত হয়েছে।
তিনি বলেন, আমরা কখনই পরমাণু অস্ত্র বানাতে চাই না এবং আমরা টেরোরিস্ট না। ফিলিস্তিন ও লেবানন তারাও সন্ত্রাসবাদী রাষ্ট্র নয়। তারা অত্যন্ত শান্ত এবং শান্তিপ্রিয় রাষ্ট্র। আসলে এগুলো একটা বাহানা। তারা আমাদের ওপর চাপ ও আধিপত্য বিস্তারের জন্য বাহানা সৃষ্টি করতে চায়।
তিনি বলেন, আমি এই অনুষ্ঠানের মধ্যে একটা বিষয়ে আলোচনা করতে চাই তা হলো- এটা মনে হচ্ছে আমার কাছে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ের আলোচনা হচ্ছে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে কোনো কথা বলার অভিপ্রায় আমার নেই। আমরা যুদ্ধের মধ্যে আছি। আমরা চাই না আমাদের পক্ষে কেউ যুদ্ধ করুক। আমাদের অন্য কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে কথা বলার অভিপ্রায় নেই।
তিনি বলেন, আমরা যেহেতু আপনাদের বন্ধু, সে হিসেবে দুই-একটা কথা বলতে চাই। কোনো দেশে যখন বিপ্লব হয় তখন মানুষ মনে করে পরের দিনই সব কিছু সমাধান হয়ে যাবে। আসলে বাস্তবতা এমন নয়। বাংলাদেশেও বিপ্লব হয়েছে এবং একটা সুষ্ঠু নির্বাচন হয়েছে। নির্বাচনের পরে একটা সরকার গঠিত হয়েছে। এখন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে হজরত মুসার মতো লাঠি নাই যে লাঠি দিয়ে সাগরে আঘাত করবে আর নীল নদ দিয়ে রাস্তা হয়ে যাবে। তিনি বলেন, এই দেশের অর্থনীতি ঠিক করতে হলে অন্তত ৫-১০ বছর লাগবে। আমেরিকার সাথে আলোচনার বিষয়ে বলব- সকালে এক ধরনের আলোচনা করছি তারা রাতে গিয়ে হামলা করছে। আমরা এখন এই পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছি যে আমরা আমেরিকার সাথে কোনো বিষয়ে সমঝোতা করছি না। ট্রাম্প সাহেব দেখা গেছে সকালে, দুপুরে, বিকেলে, রাতে অনবরত টুইট করছেন, যা একটার সাথে আরেকটা বার্তার মিল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
এখন আমেরিকার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে ইরান পরাজিত হয়েছে, তারা বিজয়ী হয়েছে, ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। ইরানি সরকারও তারা পরিবর্তন করে দিয়েছে। আমরা ট্রাম্প সাহেবকে শুভেচ্ছা জানাব। কিন্তু সারাবিশ্ব এটা বিবেচনা করুক কতটুকু ট্রাম্প বিজয়ী হয়েছে।
আমি বন্ধুরাষ্ট্রকে বলতে চাই- ইরানকে যদি তারা পরাজিত করতে পারে তবে তারা পরে যাবে তুরস্কে। এরপর আসবে পাকিস্তানে এবং তারা বলবে বেলুচিস্তানকে তোমরা আলাদা করে দাও।
এরপর মিসর ও সৌদি আরবসহ ধাপে ধাপে ধরবে। কিন্তু আমরা এখানে বড় একটা বাঁধ হিসেবে দাঁড়িয়েছি। আমরা দাঁড়িয়ে থাকব। অনেকে আমরা দেখি বাংলাদেশ সরকারের সমালোচনা করে, এ ব্যাপারে একটা কথা আমরা বলতে চাই- সাত মিলিয়ন অর্থাৎ ৭০ লাখ বাংলাদেশী বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে বিভিন্ন দেশে কাজ করছে। বাংলাদেশ সরকার যে উদ্বিগ্ন, এই উদ্বেগটা সরকারের মধ্যে কাজ করে, সেটা জাতির স্বার্থে, দেশের স্বার্থেই। আমি মনে করি আমার ভাই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সবাই পরামর্শ দিবেন, আমরাও বন্ধুরাষ্ট্র হিসেবে থাকব ইনশাআল্লাহ।



