মুফতি মতিউর রহমান
ইসলাম আগমনের আগে ইহুদিরা আল্লাহর প্রেরিত অনেক নবীকে হত্যা করেছে। নবীরা শরিয়তের কোনো বিধান নিয়ে এলে তাদের মনোপূত না হলেই দাম্ভিকতা দেখিয়েছে না হয় নবীকেই হত্যা করে ফেলেছে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন- ‘এরপর এটা কেমন আচরণ যে, যখনই কোনো রাসূল তোমাদের কাছে এমন কোনো বিষয় নিয়ে উপস্থিত হয়েছে, যা তোমাদের মনের চাহিদামতো নয়, তখনই তোমরা দম্ভ দেখিয়েছ। অতএব কতক নবীকে তোমরা মিথ্যাবাদী বলেছ এবং কতক নবীকে হত্যা করেছ।’ (সূরা বাকারা-৮৭)
ইহুদিদের হাতে নবীদের হত্যার বিষয়টি আল্লাহ তায়ালা কুরআনে বারবার বলেছেন। যেমন- সূরা নিসার ১৫৫ নম্বর আয়াতে তিনি বলেন- ‘এরপর তাদেরকে লানত করেছিলাম তাদের কর্তৃক প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ, আল্লাহর আয়াত অস্বীকার, নবীগণকে হত্যা এবং তাদের অন্তরের ওপর পর্দা লাগানো রয়েছে তাদের এই উক্তির কারণে। অথচ বাস্তবতা হলো, তাদের কুফরির কারণে আল্লাহ তাদের অন্তরে মোহর মেরে দিয়েছেন, এ জন্যই তারা অল্প কিছু বিষয় ছাড়া ঈমান আনে না।’
ইসলাম আসার পরও ইহুদিরা মুসলমানদের চরম বিরোধিতা করেছে এবং বিভিন্নভাবে মুসলিম নিধনে অংশ নিয়েছে। এর কারণ ছিল তাদের বংশে মুহাম্মদ সা:-এর জন্ম না হওয়া। তাদের ধারণা ছিল শেষ নবী তাদের গোত্র থেকে প্রেরিত হবেন, কিন্তু যখন তারা দেখল শেষ নবী মুহাম্মদ সা: মক্কার কুরাইশ বংশে জন্মগ্রহণ করেছেন তখনই তাদের মাথাব্যথা শুরু হয়ে যায়। সে থেকেই তারা মুহাম্মদ সা: ও তার অনুসারীদের বিরুদ্ধে চলে যায় এবং বিভিন্নভাবে চক্রান্ত শুরু করে।
প্রথম চক্রান্ত : রাসূল সা: মদিনা আগমনের পরপরই স্থানীয়-অস্থানীয় সব গোত্রের সাথে সন্ধি-চুক্তিতে আবদ্ধ হন। মদিনার ইহুদিরাও ছিল এই সন্ধি চুক্তির অন্যতম শরিক। সন্ধিচুক্তি অনুসারে ইসলাম ও মুসলিম শক্তির বিরুদ্ধে কোনো নাশকতামূলক কাজে লিপ্ত হওয়া বা ইসলাম বৈরী কোনো শক্তির সাথে যোগাযোগ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ছিল। প্রথম দিকে ইহুদিরাও এ চুক্তি মানতে থাকে কিন্তু মুসলিমদের বিজয় যাত্রা তাদের মনঃপূত হয়নি। অল্প দিনের ভেতরে তাদের চুক্তি ভঙ্গের মুখোশ বেরিয়ে যায় এবং তাদের চিরাচরিত বিশ্বাসঘাতকতামূলক আচরণ ফুটে ওঠে। তারা উপরে উপরে মুসলমানদের সাথে হাত মেলায় আর গোপনে মুসলমানদের চরম শত্রু মুনাফিক সরদার আব্দুল্লাহ ইবনে উবায় ইবনে সালুলের সাথে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। কিছু দিন পরই মক্কার কাফেরদেরকে সাথে নিয়ে মদিনা আক্রমণের মত ব্যক্ত করে এবং মুসলমানদের সমূলে উৎখাত করতে তাদের প্ররোচিত করে।
দ্বিতীয় চক্রান্ত : ইহুদি গোত্র বনি নজির কর্তৃক নবীকে হত্যার ষড়যন্ত্র। মুহাম্মদ সা: একটি আলোচনা সভায় যোগদানের উদ্দেশে বনি নজির গোত্রে গমন করেন। তার সাথে হজরত আবু বকর রা:, হজরত ওমর ও হজরত আলী রা: ছিলেন। ইহুদিরা রাসূল সা:-কে হত্যা করার জন্য আমর ইবনে জাহাশ নামে এক ইহুদিকে নিযুক্ত করে। মহানবী সা: একটি দেয়ালের ছায়ায় বসা ছিলেন। সে ইহুদি দেয়ালসংলগ্ন একটি ঘরের ছাদে উঠে পাথর নিক্ষেপ করে হত্যার প্রস্তুতি নেয়। কিন্তু ওহির মাধ্যমে রাসূল সা: এ ষড়যন্ত্রের বিষয়ে জেনে যান। ফলে তিনি সেখান থেকে নিরাপদে ফিরে আসেন। এরপরই রাসূল সা: বনি নজির গোত্রকে মদিনা থেকে বিতাড়িত করেন। (সিরাতে ইবনে হিশাম-২/১৯০)
তৃতীয় চক্রান্ত : খাইবরে বিষপান করিয়ে রাসূলকে হত্যা চেষ্টা। বিতাড়িত ও বহিষ্কৃত ইহুদিরা খাইবার এলাকায় মিলিত হয় এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিভিন্নভাবে ষড়যন্ত্র করতে থাকে। পরবর্তীতে মুহাম্মদ সা: তাদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করলে তারা সম্মুখযুদ্ধে পরাজিত হয়। তখন এক ভক্তের ছদ্মবেশে মহানবী সা:-কে দাওয়াত দিয়ে বিষ পান করিয়ে হত্যা করার চেষ্টা করে। কিন্তু আল্লাহ তায়ালার রহমতে তিনি বেঁচে যান, তবে তার সাথে থাকা একজন তৎক্ষণাৎ শহীদ হন। (সিরাতে ইবনে হিশাম-২/৩৩৪)
চতুর্থ চক্রান্ত : ওহুদ যুদ্ধে কাফেররা সাময়িক বিজয় লাভ করার পর তারা সম্মিলিত শক্তি নিয়ে মুসলমানদেরকে উৎখাত করার জন্য উঠেপড়ে লেগে যায়। এর পেছনে যার সবচেয়ে বেশি অবদান ছিল সে হলো ইহুদি কা’ব ইবনে আশরাফ। তার প্ররোচনায় মূলত মক্কার কাফেররা মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। পরবর্তীতে রাসূল সা: একটি কাফেলা প্রেরণ করে কা’ব ইবনে আশরাফকে হত্যা করেন। (বুখারি-৪০৩৭)
রাসূল সা.-এর ইন্তেকালপরবর্তী ষড়যন্ত্র : রাসূল সা.-এর ইন্তেকালের পর খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন হজরত আবু বকর রা:। এ সময় অনেক অমুসলিম গোত্র রাসূলের ইন্তেকালের পর ইসলামের কিছু বিষয় নিয়ে বিদ্রোহ করে। কেউ জাকাতকে আবার কেউ মদিনার কেন্দ্রীয় ভূমিকে অস্বীকার করার চেষ্টা করে। কিন্তু হজরত আবু বকর রা:-এর দৃঢ় অঙ্গীকারের ফলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। এরপর খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন হজরত ওমর ফারুক রা:। তার অসম ব্যক্তিত্ব ও প্রভাব, অনুপম চরিত্র ও মাহাত্ম্য এবং সচেতনতায় সাময়িকভাবে হলেও শত্রুরা সব ধরনের অপচেষ্টা থেকে বিরত থাকতে বাধ্য হয়। তার যুগে মুসলিম বাহিনী সিরিয়া, ইরাক, ফিলিস্তিন, মিসর, ইরান ও ইয়েমেন পরিপূর্ণভাবে জয় করে।
তারপরে খলিফা হন হজরত উসমান রা:। শুরুর দিকে মুসলমানদের বিজয়যাত্রা অব্যাহত থাকে। কিন্তু মুসলমানদের এ বিজয় মুনাফিক ও ইহুদিরা কখনোই সহ্য করতে পারেনি। প্রকাশ্যে মোকাবেলার সুযোগ না পেয়ে তারা গোপন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। বাইরে থেকে নয়; বরং ভেতর থেকেই চক্রান্তের সুযোগ নেয়। উসমান রা:-এর দয়া ও সহিষ্ণুতা তাদের এই কাজ আরো সহজ করে দেয়। এ সময় আব্দুল্লাহ বিন সাবা নামে এক ইহুদি মুসলমান হওয়ার দাবি করে এবং আগে থেকে মুসলিম সমাজে অবস্থানরত মুনাফিকদের গোপন তৎপরতায় যোগ দেয়। অল্প দিনের মধ্যেই সে তার অসাধারণ সাংগঠনিক প্রতিভা ও নিরলস প্রচেষ্টার মাধ্যমে সব মুনাফিককে ছাড়িয়ে যায়।
সে ও তার মুনাফিক সঙ্গীরা মিলে হজরত ওসমান রা:-এর বিরুদ্ধে বিষোদগার শুরু করে। মুসলমানদের মধ্যে ফাটল সৃষ্টি করে তাকে শহীদ করে। পরবর্তী সময়ে হজরত আলী রা:-এর ছত্রছায়ায় এসে শুরু করে নতুন ষড়যন্ত্র।
হজরত আলী রা:-এর সাথে যুদ্ধ বাধিয়ে মুসলিম উম্মাহর রক্ত প্রবাহিত করে। পরবর্তী সময়ে ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে হজরত আলী রা:-কে শহীদ করে। তার পুত্র হাসান রা: একই ষড়যন্ত্রের জালে শহীদ হন। পরবর্তী সময়ে কারবালার প্রান্তরে হজরত হুসাইন রা:-এর শাহাদাত একই সূত্রে গাঁথা। (বিদায়া ওয়ান নিহায়া)
মুসলিম উম্মাহর মধ্যে অনৈক্য আর ষড়যন্ত্রের যে সূত্রপাত অভিশপ্ত ইহুদিরা শুরু করেছিল বর্তমানেও সেটি বন্ধ হয়নি। তাদের বিষদাঁত যতদিন উপড়ে ফেলা না হবে ততদিন এ ধারা অব্যাহত থাকবে।
লেখক : মুদাররিস, জামিয়া মাহমুদিয়া অলিনগর শিকদারবাগ মাদরাসা, আশুলিয়া, সাভার ঢাকা



