বিতর্ক উসকে দিতে কলকাঠি নাড়ছে পতিত আ’লীগ

সোস্যাল মিডিয়ায় ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে গুজব ছড়িয়ে সরকারি দল ও বিরোধী দলের মধ্যে একটি বিতর্ক সৃষ্টি করে দেশের মধ্যে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টির জন্য পেছন থেকে কলকাঠি নাড়ছে পতিত আওয়ামী লীগ। এর আগে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট নজিরবিহীন পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও একের পর এক ইস্যু তৈরি করে সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে ব্যাপক তৎপরতা চালিয়েছিল দলটি। ওই সময় সরকারের কঠোর নীতির কারণে তাদের সেই তৎপরতা বেশি দূর আগাতে পারেনি।

মনিরুল ইসলাম রোহান
Printed Edition

সোস্যাল মিডিয়ায় ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে গুজব ছড়িয়ে সরকারি দল ও বিরোধী দলের মধ্যে একটি বিতর্ক সৃষ্টি করে দেশের মধ্যে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টির জন্য পেছন থেকে কলকাঠি নাড়ছে পতিত আওয়ামী লীগ। এর আগে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট নজিরবিহীন পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও একের পর এক ইস্যু তৈরি করে সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে ব্যাপক তৎপরতা চালিয়েছিল দলটি। ওই সময় সরকারের কঠোর নীতির কারণে তাদের সেই তৎপরতা বেশি দূর আগাতে পারেনি। গেল ১২ ফেব্রুয়ারি পতিত আওয়ামী লীগবিহীন অনুষ্ঠিত হয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট সরকার গঠন করে। আর পতিত দলটি রাজনৈতিক মাঠ উত্তপ্ত করার জন্য লোকবল সঙ্কটে এখন সোস্যাল মিডিয়াকে বেছে নিয়েছে। দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নামে ভুয়া ফটোকার্ড ও বিতর্কিত কন্ট্যান্ট তৈরি করে নামে-বেনামে গুজব ছড়িয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনকে উত্তপ্ত করার মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে প্রাসঙ্গিক করে পতিত দলটি আলোচনায় থাকার কৌশল হিসেবে নিয়েছে বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে।

সূত্র বলছে, সম্প্রতি এহসান চৌধুরী নামক একটি ফেসবুক আইডি থেকে এআই ব্যবহার করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং জাইমা রহমানের একটি আপত্তিকর ছবি তৈরি করে পোস্ট করা হয়। পরে ওই আপত্তিকর পোস্টের স্ক্রিনশট এডিট করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিবির নেতা আব্দুল্লাহ আল মাহমুদের ফেসবুক আইডি বসিয়ে ভুয়া ফটোকার্ড ছড়িয়ে দেন কুমিল্লার ছাত্রলীগ নেতা গাজী আশরাফুল আলম শ্রাবণসহ আওয়ামী লীগপন্থী কয়েকজন একটিভিস্ট। পরে এ ঘটনা ছাত্রদল-শিবিরের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি করে এবং এ ঘটনায় শাহবাগ থানার মধ্যে মবের শিকার হন ডাকুস নেতা মোসাদ্দেকসহ আরো কয়েকজন। এ বিষয়টি সরকারি প্রতিষ্ঠান পিআইবিসহ কয়েকটি ফ্যাক্ট চেকার প্রতিষ্ঠানও ঘটনাটি যাচাই করে ঘটনার সত্যতা পেয়েছেন।

সূত্র আরো বলছে, ভুয়া ফটোকার্ড ও গুজবের ওপর ভিত্তি করে দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্রদল ও শিবিরের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। কোথাও কোথাও সংঘর্ষের মতো ঘটনাও ঘটছে। আর ওইসব ভুয়া ফটোকার্ড ও গুজব নির্ভর সংবাদ সোস্যাল মিডিয়ায় ছাত্রলীগসহ পতিত আওয়ামী লীগের অ্যাক্টিভিস্টরা মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে দিচ্ছে। এর আগেও অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে রাজপথে গড়ে ওঠা আন্দোলনগুলোর নেপথ্যে কলকাঠি নেড়েছেন ছাত্রলীগ, যুবলীগসহ আওয়ামী লীগ সমর্থিত লোকজন।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে নজিরবিহীন পতনের পর জুডিশিয়াল ক্যুর মাধ্যমে ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারকে উৎখাত করার জন্য ভয়াবহ পরিকল্পনা করেছিল আওয়ামী লীগ। সেটি ব্যর্থ হওয়ার পর গ্রাম পুলিশের আন্দোলন, আনসারদের আন্দোলন, পোশাক শ্রমিকদের অসন্তোষ, সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবীদের আন্দোলন, সচিবালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আন্দোলন, সাত কলেজের শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, এনবিআরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আন্দোলনসহ গত দেড় বছরে গড়ে ওঠা বড় বড় আন্দোলনের ওপর ভর করে সরকার পরিবর্তনের তৎপরতা চালিয়েছিল পতিত দলটি। এমনকি গোপালগঞ্জে ও সচিবালয়ে বড় ধরনের বিশৃঙ্খলার পেছনে পতিত আওয়ামী লীগের নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা সক্রিয় ভূমিকা পালন করে বলে জানা গেছে। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটা বড় আকারের রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টির ক্ষেত্র যে তৈরি করা হচ্ছে, তার নানা লক্ষণ স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। সামাজিক মাধ্যমে নামে-বেনামে অশ্লীল ও আপত্তিকর এআই জেনারেটেড ছবি ছড়িয়ে আগুনে ঘি ঢালার প্রাথমিক কাজটা শুরু করছে ছাত্রলীগ। তারপর সেই ঘটনার রেশ ছড়িয়ে পড়ছে ক্যাম্পাসগুলোতে। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ঘটনার কথাই ধরা যাক! রিউমার স্ক্যানারের মতে, কিভাবে একটি বেনামী পেজ থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আপত্তিকর ছবিটি অনেকের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। পরে এ নিয়ে ছাত্রদল ও ডাকসু নেতাদের মধ্যে উত্তেজনা শুরু হয়। প্রতিটি ঘটনার সূত্রপাতটা আসলে এভাবেই হচ্ছে এবং পরে তা গড়াচ্ছে রাজপথে। রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তাপ ছড়াচ্ছে। একে-অপরের ওপরে দোষারোপের রাজনীতির বিষবাষ্প মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ছে। রূপ নিচ্ছে ভয়াবহ সঙ্ঘাতে। আর এ ঘটনা দূর থেকে দেখে উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ছেন আওয়ামী সমর্থক ও অ্যাক্টিভিস্টরা।

বিশিষ্ট রাজনীতি বিশ্লেষক শাহজাহান শুভর মতে, ‘গুপ্ত’, জামায়াত-শিবির, এনসিপি বা যেকোনো নাম দিয়ে ‘জুলাই’ অভ্যুত্থানের সামনের সারির নেতাদের ওপর একটা দমন-পীড়নের প্রকল্প বেশ আগেই শুরু হয়েছে। এতদিন সেই প্রকল্প শুধু মাঠে গড়ানোর অপেক্ষায় ছিল! এই প্রকল্পের উদ্যোক্তা হলো ‘ডিপ স্টেট’, আওয়ামী লীগ ও ভারত। এক সপ্তাহের মধ্যে দেখা গেলো, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের অন্তত পাঁচ থেকে ছয়টি ক্যাম্পাসে হামলা, মারামারির ঘটনা ঘটেছে। ছাত্রদল অন্য কোনো সংগঠনকেই সহ্য করতে চাইছে না। এজন্য তারা ছাত্রলীগ ও ভাড়াটে সন্ত্রাসী দিয়ে ছাত্রদের কোপানো শুরু করেছে। তিনি মনে করেন, জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি সুপার মেজোরিটি নিয়ে সরকার গঠন করার পর নানাভাবে থউস্কানিটা আবারো শুরু হয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে নামে-বেনামে অশ্লীল ও আপত্তিকর এআই জেনারেটেড ছবি ছড়িয়ে আগুনে ঘি ঢালার প্রাথমিক কাজটা শুরু করছে ছাত্রলীগ। যা সোস্যাল মিডিয়ায় ছাত্রলীগ গুজব ছড়িয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে একটি অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে মোটামুটি সফল হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট রাজনীতি বিশ্লেষক ড. আবদুল লতিফ মাসুম বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে যেসব আন্দোলন হয়েছিল তার নেপথ্যে ছিল আওয়ামী লীগ। নানা কৌশলে তারা একটি অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করে রাজনৈতিক ফায়দা নিতে চেয়েছিল। সেটা যদিও তখন সফল হয়নি। তিনি বলেন, এখন নির্বাচিত সরকারের সময় মাঠের আন্দোলনে সফল হবে না ভেবে সোস্যাল মিডিয়াকে বেছে নিয়েছে আওয়ামী লীগ। প্রধানমন্ত্রীসহ দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে বিতর্কিত ও ভুয়া ফটোকার্ড তৈরি করে সোস্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে, যাতে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে রাজনৈতিক সম্পর্কে টানাপড়েন দেখা দেয়। এর ফলে দেশে একটি অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে পতিত দলের লোকজন যাতে সুবিধা ভোগ করতে পারে। এজন্য সরকার ও বিরোধী দলকে সতর্ক থাকতে হবে।