অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ শেষ হওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা দেশের আর্থিক খাতের অসামঞ্জস্যতাসহ নানা কারণে বেশ কিছুদিন দেশের পুঁজিবাজারগুলো মন্দার মধ্য দিয়ে পার করলেও আবার ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে। আগের দু’সপ্তাহের ধারাবাহিকতায় সমাপ্ত সপ্তাহটির শুরুটাও ভালো ছিল না। সপ্তাহের প্রথম দু’দিন দুই বিক্রয়চাপে পুঁজিবাজার সূচকের বড় অবনতি ঘটলেও পরবর্তী সময়ে ক্রমান্বয়ে ঘুরে দাঁড়ায় দুই বাজার। সপ্তাহের শেষদিনের বাজার আচরণ বিনিয়োগকারীদের সামনের দিনগুলোর জন্য আরো ভালো বার্তা দিলো। এ দিন সূচকের বড় উন্নতি দিয়েই সপ্তাহ শেষ করল পুঁজিবাজারগুলো।
পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন গতকাল পুঁজিবাজারগুলো প্রত্যাশিত আচরণই করেছে। আগের দু’দিনের বাজার আচরণই বলে দিচ্ছিল বাজারে বিক্রয়চাপ ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাচ্ছে। তার কারণ ঈদ পরবর্তী একটি ভালো বাজারের প্রত্যাশায় এ মুহূর্তে বিনিয়োগকারীরা নিজেদের অবস্থান সংহত করছেন, যার প্রমাণ গতকালের বাজার আচরণ। আগামী সপ্তাহের প্রথম দু’দিন বাজার চালু থাকলেও বিক্রয়চাপ সৃষ্টি হওয়ার খুব একটা ভয় নেই। কারণ ওই দু’দিন শেয়ার বিক্রি করলেও কেউ টাকা উত্তোলনের সুযোগ পাচ্ছেন না। তা বড় কোনো সমস্যা সৃষ্টি না হলে ওই দু’দিনও ভালো কাটবে পুঁজিবাজারের।
প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ৪১ দশমিক ৭৪ পয়েন্ট বৃদ্ধি পায়। সকালে পাঁচ হাজার ২২২ দশমিক ৩৮ পয়েন্ট থেকে লেনদেন শুরু করা সূচকটি বৃহস্পতিবার লেনদেনশেষে পৌঁছে যায় পাঁচ হাজার ২৬৪ দশমিক ১২ পয়েন্টে। চলতি মাসের শুরু থেকে এই প্রথম বাজারগুলো বড় কোনো বিক্রয়চাপ ছাড়া সাবলীলভাবে দিন পার করল। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিডএসই শরিয়াহর উন্নতি ঘটে যথাক্রমে ২০ দশমিক ৫৩ ও ৭ দশমিক ৭১ পয়েন্ট। অনরূপভাবে এ দিন দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই ২১ দশমিক ৩১ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখে। বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের উন্নতি রেকর্ড করা হয় যথাক্রমে ৪১ দশমিক ৪২ ও ৩৪ দশমিক ২৪ পয়েন্ট।
গতকাল দুই বাজারে সূচকের উন্নতি ঘটলেও লেনদেনের চিত্র ছিল ভিন্ন। ঢাকা বাজারে গতকাল ৮৬৭ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি হয়, যা আগের দিন অপেক্ষা ২৬ কোটি টাকা বেশি। বুধবার ডিএসই’র লেনদেন ছিল ৮৪১ কোটি টাকা। তবে লেনদেন হ্রাস পেয়েছে চট্টগ্রাম শেয়ারবাজারে। গতকাল সিএসই’র লেনদেন ছিল ৩০ কোটি টাকা যা আগের দিনের চেয়ে ১৬ কোটি টাকা কম। বুধবার সিএসই’র লেনদেন ছিল ৪৬ কোটি টাকা।
গতকাল বিভিন্ন ব্রোকার হাউজে বিনিয়োগকারীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, তারা ঈদ-পরবর্তী ভালো বাজারের প্রত্যাশায় নিজেদের বিনিয়োগ সংহত করার চেষ্টা করছেন। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেয়া সিদ্ধান্তে এমনিতেই তাদের পুঁজির বড় অংশ একপ্রকার নেই হয়ে গেছে। এ ছাড়াও কোবিড-সহ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নানা ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে তাদের দীর্ঘদিন টানা লোকসানের মধ্য দিয়ে পার করতে হয়েছে। তারপরও তারা বাজারের সাথে রয়েছেন নতুন গণতান্ত্রিক সরকারের সময় একটি ভালো পুঁজিবাজার পাবেন এই প্রত্যাশায়। এখন সময়ই বলে দেবে আগামী দিনগুলোতে পুঁজিবাজার তাদের প্রত্যাশার কতটুকু দিতে পারবে।
এ দিকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত আর্থিকভাবে দুর্বল তিনটি কোম্পানির কার্যক্রম ঘিরে অনুসন্ধানমূলক পরিদর্শন শুরু করতে যাচ্ছে ডিএসই। এ ল্েয কোম্পানিগুলোর আর্থিক সমতা, শেয়ার লেনদেন ও সার্বিক কার্যক্রম খতিয়ে দেখতে আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
পরিদর্শনের আওতায় থাকা কোম্পানিগুলো হলো অ্যাকটিভ ফাইন কেমিক্যালস লিমিটেড, এএফসি অ্যাগ্রো বায়োটেক লিমিটেড এবং লিব্রা ইনফিউশন লিমিটেড। বর্তমানে তিনটি কোম্পানিই শেয়ারবাজারের ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে অবস্থান করছে। ডিএসইর আবেদনের পরিপ্রেেিত এসব প্রতিষ্ঠানের ওপর অনুসন্ধানমূলক পরিদর্শনের অনুমতি দিয়েছে কমিশন।
বিএসইসি সূত্রে জানা গেছে, সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর আর্থিক অবস্থার অবনতি, পরিচালন কার্যক্রম, শেয়ার লেনদেনের ধরন এবং বিনিয়োগকারীদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট নানা বিষয় খতিয়ে দেখা হবে। একই সাথে সাম্প্রতিক সময়ে কোম্পানিগুলোর শেয়ারদরের অস্বাভাবিক গতিবিধিও পর্যালোচনার আওতায় আসবে। সম্প্রতি বিএসইসির মার্কেট ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন বিভাগ থেকে এ-সংক্রান্ত নির্দেশনা ডিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে পাঠানো হয়েছে।
ডিএসই’র ওয়েবসাইটে পাওয়া কোম্পানিগুলোর তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, অ্যাকটিভ ফাইন কেমিক্যালস এবং এএফসি অ্যাগ্রো বায়োটেক টানা তিন বছর ধরে শেয়ারহোল্ডারদের কোনো ধরনের লভ্যাংশ দেয়নি। পাশাপাশি কোম্পানি দু’টির উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের হাতে সম্মিলিতভাবে ন্যূনতম ৩০ শতাংশ শেয়ার ধারনের বিএসইসির নির্দেশনাও মানা হচ্ছে না। আবার আর্থিক ও পরিচালনগত দুর্বলতা থাকা সত্ত্বেও চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ সময়ে কোম্পানি দু’টির শেয়ারদর উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
অন্য দিকে ১৯৯৪ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া ওষুধ ও রসায়ন খাতের স্বল্প মূলধনের কোম্পানি লিব্রা ইনফিউশন একসময় ভালো লভ্যাংশ দেয়ার ইতিহাস থাকলেও গত চার বছর ধরে কোনো লভ্যাংশ ঘোষণা করেনি। অথচ গত এক বছরে কোম্পানিটির শেয়ারদর সর্বনিম্ন ৫৪৭ টাকা ও সর্বোচ্চ ৮৫০ টাকায় পৌঁছেছিল। গত এক মাসে কোম্পানিটির শেয়ারদর ধারাবাহিকভাবে বাড়তে দেখা গেছে। আদৌ কোম্পানিটি বর্তমানে উৎপাদনে আছে কি না তা যাচাই করবে ডিএসই।
বিএসইসির নির্দেশনায় বলা হয়েছে উপরোক্ত তিন কোম্পানি অ্যাকটিভ ফাইন কেমিক্যালস, এএফসি অ্যাগ্রো বায়োটেক ও লিব্রা ইনফিউশনের ওপর অনুসন্ধানমূলক পরিদর্শন কার্যক্রম পরিচালনার বিষয়ে ডিএসইর একাধিক আবেদন কমিশনের নজরে এসেছে। এসব আবেদন বিবেচনায় নিয়ে কমিশন সংশ্লিষ্ট তিন কোম্পানির ওপর পরিদর্শন কার্যক্রম পরিচালনার অনুমোদন দিয়েছে।



