পাল্টা আঘাত চালিয়ে যাচ্ছে তেহরান

উত্তাল মধ্যপ্রাচ্য : তেল স্থাপনায় হামলা, হরমুজ প্রণালীতে উত্তেজনা

Printed Edition
ইরানের ছোঁড়া রকেট প্রতিহত করতে ইসরাইলের আয়রন ডোম ডিফেন্স সিস্টেমের তৎপরতা : আলজাজিরা
ইরানের ছোঁড়া রকেট প্রতিহত করতে ইসরাইলের আয়রন ডোম ডিফেন্স সিস্টেমের তৎপরতা : আলজাজিরা

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সমন্বিত সামরিক অভিযান নবম দিনে সঙ্ঘাত আরো তীব্র রূপ নিয়েছে। শনিবার রাতে প্রথমবারের মতো দেশটির তেল সংরক্ষণাগার ও পরিশোধনাগারকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। এর ফলে সঙ্ঘাতের অর্থনৈতিক মাত্রা নতুনভাবে সামনে এসেছে এবং মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে উত্তেজনা আরো বেড়েছে। একই সাথে যুদ্ধের প্রভাব দ্রুত পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে। ইরান পাল্টা হিসেবে ইসরাইলের পাশাপাশি কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোর দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই সঙ্ঘাতে এখন পর্যন্ত কমপক্ষে ১ হাজার ৩৩২ জন নিহত হয়েছেন বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে। নিহতদের বড় অংশই বেসামরিক নাগরিক বলে দাবি করেছে তেহরান।

তেহরানে তেল ডিপোতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড

শনিবার রাতে তেহরানের উপকণ্ঠে অবস্থিত শেহরান তেল সংরক্ষণাগারে বড় ধরনের বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। স্থানীয় গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে বিশাল আগুনের শিখা আকাশে ছড়িয়ে পড়তে দেখা যায়। দূর থেকেও ঘন ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা গেছে।

ইসরাইলি সামরিক বাহিনী দাবি করেছে, তারা এমন জ্বালানি সংরক্ষণাগার ও সংশ্লিষ্ট স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে যেগুলো ইরানের সশস্ত্রবাহিনীর সরবরাহ ব্যবস্থার অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল।

তবে তেহরান এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, হামলায় বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংস করা হয়েছে এবং এটি আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন।

বিশ্লেষকদের মতে, তেল অবকাঠামোয় হামলা এই যুদ্ধে নতুন ধাপের সূচনা করেছে। এর ফলে ইরানের অর্থনীতি ও জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হতে পারে।

আমিরাতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় সিআইএ’র ছয় জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নিহত

সংযুক্ত আরব আমিরাতে (ইউএই) ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার (সিআইএ) ছয় জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন, তাসনিম সংবাদ সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) কর্তৃক ছোড়া একটি ক্ষেপণাস্ত্র মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের ব্যবহৃত একটি আবাসিক স্থাপনায় আঘাত হানে। ফলস্বরূপ, ছয় জ্যেষ্ঠ সিআইএ কর্মকর্তা নিহত এবং আরো দু’জন আহত হন।

সংযুক্ত আরব আমিরাতে একটি সিআইএ স্থাপনা লক্ষ্য করে আইআরজিসির ক্ষেপণাস্ত্র হামলার তথ্য আগের দিন প্রকাশিত হয়েছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’ দাবি

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারো ইরানের কাছে “নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ” দাবি করেছেন। শনিবার রাতে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে তিনি বলেন, এই যুদ্ধ দ্রুত শেষ হওয়ার সম্ভাবনা কম।

তার ভাষায়, “এই সঙ্ঘাত অল্প সময়ের মধ্যে শেষ হবে না। আমরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখছি।”

তিনি আরো স্পষ্ট করেন, ওয়াশিংটন এখনই তেহরানের সাথে কোনো সমঝোতা আলোচনায় যেতে আগ্রহী নয়। কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই অবস্থান যুদ্ধ দ্রুত শেষ হওয়ার সম্ভাবনা আরো কমিয়ে দিয়েছে।

হরমুজ প্রণালীতে নতুন উত্তেজনা : বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। ইরানের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, প্রণালীটি আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো খোলা রয়েছে। তবে সেখানে দিয়ে কোনো মার্কিন বা ইসরাইলি জাহাজ চলাচলের চেষ্টা করলে তা লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে।

অন্য দিকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ইরানের নৌবাহিনী কার্যত ধ্বংস হয়ে গেছে। তিনি আরো বলেন, হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচল কমে যাওয়ার কারণ জাহাজ মালিকদের নিজস্ব সিদ্ধান্ত।

তবে সামুদ্রিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় অনেক জাহাজই এখন ওই পথ এড়িয়ে চলার চেষ্টা করছে।

উপসাগরীয় দেশগুলোকে আশ্বাস তেহরানের : ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, তেহরান প্রতিবেশী উপসাগরীয় দেশগুলোর সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়।

রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত এক ভাষণে তিনি বলেন, “আমরা প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে সঙ্ঘাত চাই না। শত্রুপক্ষ অঞ্চলটিতে বিভাজন সৃষ্টি করার চেষ্টা করছে।”

তিনি আরো বলেন, তার আগের কিছু বক্তব্য শত্রুপক্ষ ভুলভাবে ব্যাখ্যা করেছে।

এর আগে পেজেশকিয়ান জানিয়েছিলেন, উপসাগরীয় দেশগুলোর ভূখণ্ড যদি ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক হামলার জন্য ব্যবহার না করা হয়, তাহলে তেহরানও সেসব দেশে হামলা চালাবে না।

তবে বাস্তবে কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ কয়েকটি দেশে ইরানের ড্রোন হামলার খবর পাওয়া গেছে বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

নতুন সর্বোচ্চ নেতা নিয়ে আলোচনা : চলমান যুদ্ধের মধ্যেই ইরানের রাজনৈতিক নেতৃত্ব নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা সামনে এসেছে।

ইরানের এক্সপার্টস অ্যাসেম্বলির সদস্য আয়াতুল্লাহ মোহাম্মদ-মাহদি মিরবাঘেরি জানিয়েছেন, নিহত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির উত্তরসূরি নির্ধারণের বিষয়ে প্রায় ঐকমত্য সৃষ্টি হয়েছে।

ফার্স নিউজ এজেন্সিতে প্রকাশিত এক ভিডিওতে তিনি বলেন, “নতুন নেতৃত্ব নির্ধারণের বিষয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে এবং এ বিষয়ে একটি ঐক্যবদ্ধ মতামত সৃষ্টি হয়েছে।”

তবে সম্ভাব্য উত্তরসূরির নাম এখনো প্রকাশ করা হয়নি। বিশ্লেষকদের মতে, নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্ধারণ ইরানের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক দিকনির্দেশনার ওপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

স্কুলে হামলা নিয়ে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ : মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ দক্ষিণ ইরানের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হামলার ঘটনায় আন্তর্জাতিক তদন্তের দাবি জানিয়েছে।

সংস্থাটির দাবি, ওই হামলায় অন্তত ১৬০ জন নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে বহু শিশু রয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের তদন্তেও ইঙ্গিত পাওয়া গেছে যে স্কুলটিকে সম্ভবত ইচ্ছাকৃতভাবে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল।

কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামলাটি যুক্তরাষ্ট্র পরিচালিত বিমান হামলার অংশ হতে পারে। তবে এ বিষয়ে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

সরকার পতনের সম্ভাবনা কম : মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়ন : ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স কাউন্সিলের একটি মূল্যায়নে উল্লেখ করা হয়েছে- বড় আকারের সামরিক হামলা হলেও তা সহজে ইরানের সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে পারবে না।

প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, ইরানের বিরোধী শক্তিগুলো অত্যন্ত বিভক্ত। ফলে তাদের পক্ষে দ্রুত ক্ষমতা গ্রহণের সম্ভাবনাও কম।

বিশ্লেষকদের মতে, এই মূল্যায়ন যুদ্ধের কৌশল নিয়ে ওয়াশিংটনের অভ্যন্তরেও নতুন প্রশ্ন সৃষ্টি করেছে।

উপসাগরীয় অঞ্চলে হামলা ও উত্তেজনা : যুদ্ধের প্রভাব এখন সরাসরি উপসাগরীয় অঞ্চলেও দেখা যাচ্ছে। তেহরানের তেল ডিপোগুলোতে হামলার পাশাপাশি উপসাগরীয় দেশগুলো তাদের আকাশসীমায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঘটনা জানিয়েছে।

কুয়েতে একটি বহুতল ভবনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। কুয়েতি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তাদের আকাশসীমা লঙ্ঘনকারী একঝাঁক ‘শত্রু ড্রোন’ প্রতিহত করতে গিয়ে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

দ্য গার্ডিয়ান ও বিবিসির খবরে বলা হয়েছে, কুয়েতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঘটনায় দুই সীমান্তরক্ষী নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।

কুয়েতের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, রোববারও তারা ‘শত্রুপক্ষীয় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা’ প্রতিহত করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেয়া এক পোস্টে তারা জানায়, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বর্তমানে সক্রিয় রয়েছে।

কুয়েতের জাতীয় তেল কোম্পানি সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে অপরিশোধিত তেল উৎপাদন কমানোর ঘোষণা দিয়েছে।

অন্তত ছয় মাস যুদ্ধ চালাতে পারবে ইরান : দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, ইরান বর্তমান মাত্রার যুদ্ধ অন্তত ছয় মাস চালিয়ে যেতে সক্ষম বলে দাবি করেছে দেশটির ইসলামী বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি)।

আইআরজিসির মুখপাত্র আলী মোহাম্মদ নাইনি এক বিবৃতিতে বলেন, “ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সশস্ত্রবাহিনী বর্তমান গতির এই তীব্র যুদ্ধ অন্তত ছয় মাস চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা রাখে।”

এই দাবি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বক্তব্যের সম্পূর্ণ বিপরীত। ট্রাম্প সম্প্রতি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের অভিযান অত্যন্ত সফল হয়েছে এবং তারা ‘বড় ব্যবধানে জয়ী হচ্ছে।’

আইআরজিসি ইরানের অন্যতম শক্তিশালী সামরিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। সামরিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি রাজনীতি, শিক্ষা ও অর্থনীতিতেও এই সংস্থার ব্যাপক প্রভাব রয়েছে।

মার্কিন সেনা আটক করার দাবি : ইরান দাবি করেছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকজন সেনাকে আটক করেছে। তবে ওয়াশিংটন এই দাবি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে।

ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা আলী লারিজানি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক পোস্টে দাবি করেন, কয়েকজন মার্কিন সেনা বন্দী অবস্থায় রয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র বিষয়টি গোপন করার চেষ্টা করছে।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) আলজাজিরাকে দেয়া এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, কোনো মার্কিন সেনা আটক হওয়ার তথ্য সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।

ইরানকে পাল্টা আঘাতের হুঁশিয়ারি সৌদি আরবের : ইরানের হামলার জেরে সৌদি আরব তেহরানকে কঠোর বার্তা দিয়েছে। রিয়াদ জানিয়েছে, তারা কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষে থাকলেও ইরান যদি সৌদি ভূখণ্ড বা জ্বালানি স্থাপনায় হামলা অব্যাহত রাখে, তাহলে পাল্টা জবাব দেয়া হবে।

বিষয়টির সাথে সংশ্লিষ্ট চারটি সূত্র বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

রয়টার্স জানিয়েছে, দুই দিন আগে সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদ ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচির সাথে কথা বলেন। সেখানে রিয়াদের অবস্থান স্পষ্ট করা হয়।

সূত্রগুলো জানায়, ইরান যদি সৌদি ভূখণ্ডে হামলা অব্যাহত রাখে, তাহলে রিয়াদ তাদের সামরিক ঘাঁটি যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবহারের অনুমতি দিতে বাধ্য হতে পারে। প্রয়োজনে সৌদি আরব সরাসরি প্রতিশোধমূলক হামলাও চালাতে পারে।

তবে এ বিষয়ে সৌদি ও ইরানি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

বিশ্ববাজারে তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী : চলমান যুদ্ধের সরাসরি প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে। হরমুজ প্রণালী ঘিরে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হওয়ায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে গেছে।

যুদ্ধ শুরুর এক সপ্তাহের মধ্যেই ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম প্রায় ২৭ শতাংশ বেড়েছে। ২০২০ সালের কোভিড মহামারির পর এটিই সবচেয়ে বড় সাপ্তাহিক মূল্যবৃদ্ধি।

বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল সরবরাহ হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবহন করা হয়। ফলে এখানে সামরিক সঙ্ঘাত বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা দিতে পারে।

আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নেয়ার আশঙ্কা : মধ্যপ্রাচ্য বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সঙ্ঘাত দ্রুতই আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে।

ইরানের মিত্র গোষ্ঠীগুলো ইতোমধ্যে লেবানন, সিরিয়া ও ইরাকে সক্রিয় রয়েছে। অন্য দিকে উপসাগরীয় দেশগুলোতে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি থাকায় সঙ্ঘাত আরো বিস্তৃত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বৈশ্বিক রাজনীতি ও অর্থনীতিতেও বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা এখন এক গভীর সঙ্কটের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট-ইসরাইল জোটের সঙ্ঘাত দ্বিতীয় সপ্তাহে প্রবেশ করায় পুরো অঞ্চলজুড়ে অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা আরো বাড়ছে।

যুক্তরাষ্ট্র এখন যুদ্ধের ফাঁদে পড়েছে : লারিজানি

ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব বলেছেন, আমেরিকা ও তার মিত্রদের মূল লক্ষ্য ছিল ইরানকে ভেঙে টুকরো টুকরো করা। কিন্তু ইরানি নেতাদের বলিষ্ঠ ভূমিকা ও দক্ষ পরিচালনায় সে চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে গেছে। তাসনিম নিউজের এক প্রতিবেদন বলছে, আলী লারিজানি আট দিনের যুদ্ধ পরিস্থিতির বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, অতীতেও ট্রাম্প ও তার সহযোগিরা এবং ইসরাইলসহ মধ্যপ্রাচ্যে তাদের অনুগত কিছু দেশের কর্তাব্যক্তিরা তাদের বিভিন্ন কথাবার্তায় ইরানকে বিধ্বস্ত দেশে পরিণত করার কথা বলত। তাদের লক্ষ্য কেবল ইরানের সরকার ব্যবস্থায় পরিবর্তন নয় বরং ইরানকে ভেঙে টুকরো টুকরো করা।

তিনি বলেন, শত্রুরা বড় ধরনের আঘাত হেনে ইরানের জনগণকে মানসিকভাবে দুর্বল করে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু তা ঘটেনি। কারণ ইরানি জাতি অতীত অভিজ্ঞতা ও প্রাচীন সভ্যতা ও সংস্কৃতির অধিকারী। মার্কিনিরা ভেবেছিল অন্য দেশের মতো ইরান এক আঘাতেই পর্যুদস্ত হয়ে যাবে, ধ্বসে পড়বে কিন্তু কার্যত শত্রুরাই যুদ্ধের ফাঁদে পড়েছে।

এদিকে রুশ সামরিক বিশেষজ্ঞ অ্যালেক্সান্ডার এস্তাপানোভ বলেছেন, পশ্চিম এশিয়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সব সামরিক ঘাঁটি ইরানের হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর মোকাবিলায় খুবই ভঙ্গুর ও আত্মরক্ষায় অক্ষম। রুশ গবেষণা প্রতিষ্ঠান রানিপার এই বিশেষজ্ঞ বলেন, মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাসহ সব ধরনের নিরাপত্তা অবকাঠামোর অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রের হামলা ঠেকাতে সক্ষম নয়।

এস্তাপানোভ আরো বলেছেন, এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে সুরক্ষা দিতে যেসব সাজ-সরঞ্জাম ব্যবহার করা হয় সেগুলোর মান নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠলেও এসব সামগ্রী ব্যাপক মাত্রায় ইউরোপের দেশগুলোতে পাঠানো হচ্ছে। হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রের মোকাবিলায় এইসব মার্কিন প্রতিরক্ষা সামগ্রীর ধ্বংস যে অনিবার্য তা সুনিশ্চিত।

ইরানের সংসদ স্পিকার মোহাম্মাদ বাকের কলিবফ বলেছেন, যদি যুদ্ধ এভাবেই চলতে থাকে তবে তেল বিক্রির কোনো পথ থাকবে না এবং তা উৎপাদনের ক্ষমতাও থাকবে না। এক্সে দেয়া এ পোস্টে তিনি বলেন, ট্রাম্প বলেছিলেন তেলের দাম খুব বেশি বাড়বে না। এখন যখন তা বেড়েছে, তিনি বলছেন শিগগিরই তা কমে আসবে। যদি যুদ্ধ এভাবেই চলতে থাকে, তাহলে তেল বিক্রির কোনো পথ থাকবে না এবং তা উৎপাদনের ক্ষমতাও থাকবে না। যুদ্ধের কারণে শুধু আমেরিকার স্বার্থই নয়, বরং গোটা অঞ্চল এবং বিশ্বের অন্য দেশগুলোর স্বার্থও নেতানিয়াহুর ভ্রান্ত চিন্তা ও ধারণার কারণে ছাই হয়ে যাবে।

ইরানের প্রেসিডেন্টের বক্তব্যের অপব্যাখ্যা : ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, শত্রুরা আমার বক্তব্যের ব্যাপারে খুবই অপরিপক্ষ চিন্তাভাবনা করেছে এবং তারা চায় প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে ইরান যুদ্ধে লিপ্ত থাকুক। প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান বলেন, শত্রুরা অন্য দেশের সাথে আমাদের বিরোধ ও মতপার্থক্য জিইয়ে রাখতে চায়।

ইরানের প্রেসিডেন্ট বলেন, কোনো দেশ থেকে যদি আমাদের দেশে হামলা চালানোর দুঃসাহস কেউ দেখায় তাহলে আমরাও পাল্টা হামলা চালিয়ে জবাব দিতে বাধ্য হবো। এই জবাব দেয়ার অর্থ এটা নয় যে ওই দেশটির সাথে আমাদের সমস্যা আছে এবং ওই দেশটির জনগণকেও আমরা কষ্ট দিতে চাই না একান্ত বাধ্য না হলে।

তিনি বলেন, আমাদের দেশ ও জনগণের ওপর যত বেশি চাপ দেয়া হবে আমরাও ততবেশি কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখাবো। কোনো দেশ আমাদেরকে আঘাত করার চেষ্টা করলে আমরা সর্বশক্তি নিয়ে প্রতিরোধ করব এবং আমাদের স্বেচ্ছাসেবী ও সশস্ত্র বাহিনী দেশের প্রতিটি আনাচে-কানাচে মোতায়েন রয়েছে। শত্রুরা আমাদের ব্যাপারে যে অলীক স্বপ্নে বিভোর রয়েছে তা তাদেরকে দুমড়ে-মুচড়ে দেবে। ইরান কারো মোড়লিপনা, জুলুম ও আগ্রাসনের সামনে মাথা নত করবে না

ইরানের তেল-গ্যাস লুটের জন্যেই যুদ্ধ : হোয়াইট হাউজের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা এবং মার্কিন জাতীয় জ্বালানি পরিষদের নির্বাহী পরিচালক জেরাড আইজেন ফক্স নিউজ চ্যানেলে এক নজিরবিহীন স্বীকারোক্তি দিয়ে ঘোষণা করেছেন যে ওয়াশিংটন ইরানের জ্বালানি তেল সম্পদকে পুরোপুরি ইরানিদের হাত থেকে বের করে নিতে চায়। তিনি বলেন, ইরানে আগ্রাসনের পেছনে ওয়াশিংটনের আসল লক্ষ্য হলো ইরানের জাতীয় সম্পদ লুট করা যাতে নিজের ও মিত্রদের অর্থনৈতিক ও জ্বালানি স্বার্থ অবৈধভাবে হাসিল করা নিশ্চিতভাবে সম্ভব হয়।

আইজেন বলেছেন, আমরা যা করতে চাই তা হলো জ্বালানি তেলের এই বিশাল রিজার্ভকে ইরানিদের হাত থেকে পুরোপুরি বের করে নেয়া যাতে হরমুজ প্রণালী নিয়ে আর কখনো উদ্বিগ্ন থাকতে না হয়।

এমন সময় ওয়াশিংটনের পক্ষ হতে এই স্বীকারোক্তি আসল যখন পশ্চিম এশিয়ায় উত্তেজনা তুঙ্গে উঠেছে এবং তেলের বিশ্ব-বাজারে তীব্র অস্থিতিশীল অবস্থা দেখা দিয়েছে।

বিশেষজ্ঞ ও পর্যবেক্ষকরা বলছেন, ইসলামী ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন-ইসরাইলি আগ্রাসন দীর্ঘকাল ধরে চলতে থাকলে পশ্চিম এশিয়াসহ বিশ্বব্যাপী জ্বালানি নিরাপত্তা খাতে নানা সঙ্কট দেখা দিতে পারে দীর্ঘ মেয়াদে এবং জ্বালানি তেলের দর তীব্র গতিতে ঊর্ধ্বমুখি হতে পারে।