ঈদের খরচ মেটাতে পুঁজিবাজারে বাড়ছেই বিক্রয়চাপ

কারসাজির তথ্যদাতার সুরক্ষায় বিধিমালা বিএসইসির

Printed Edition

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক

পুঁজিবাজারে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান সব ধরনের বিনিয়োগকারীরা নিজেদের ঈদের খরচ মেটাতে প্রতিদিনই বাড়াচ্ছে বিক্রয়চাপ। গতকাল টানা দ্বিতীয় দিনের মতো দেশের দুই পুঁজিবাজারেই এ ঘটনা ঘটে। প্রতিদিনই লেনদেন শুরুর কিছুক্ষণের মধ্যেই শুরু হয় বিক্রয়চাপ, তা অব্যাহত থাকছে দিনের শেষ পর্যন্ত। রোববারের ধারাবাহিকতা ধরে রেখে গতকালও দুই পুঁজিবাজারেই সবগুলো সূচকের পতন ঘটে। উভয় বাজারেই লেনদেন হওয়া কোম্পানির ৭০ শতাংশের বেশি দরপতনের শিকার হওয়ার পাশাপাশি হ্রাস পেয়েছে বাজারগুলোর লেনদেনও।

পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রমজানের ঈদ অপেক্ষা কোরবানির ঈদে খরচ হয় বেশি। তাই সবার মধ্যে আগেভাগে টাকা তোলার একটি প্রতিযোগিতা দেখা যায়। আর এতেই দিন দিন তীব্র আকার ধারণ করে বিক্রয়চাপ। সবাই জানে শেয়ার বিক্রি করে টাকা উত্তোলন করতে হলে আগামী বৃহস্পতিবারের আগেই শেয়ার বিক্রি করতে হবে। আর শেষ দিকে বাজার আচরণ কেমন হয় তা কেউ জানে না। সে কারণে এবার আগেভাগেই বিক্রয়চাপে অস্থির হয়ে উঠছে পুঁজিবাজার। তবে এতে প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকেই চাপ তৈরি হয় বেশি। কারণ বেতন বোনাস মিলিয়ে একটি বড় অর্থের জোগান দরকার হয় এসব প্রতিষ্ঠানের। এ কারণেই সৃষ্টি হচ্ছে বিক্রয়চাপ।

প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ২৩ দশমিক ৭ পয়েন্ট অবনতির শিকার হয়। সকালে পাঁচ হাজার ২২৬ দশমিক ১২ পয়েন্ট থেকে লেনদেন শুরু করা সূচকটি বিকেলে লেনদেন শেষে নেমে আসে পাঁচ হাজার ২০৩ দশমিক ১১ পয়েন্টে। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহ হারায় যথাক্রমে ২ দশমিক ১৬ ও ৫ দশমিক ৯৮ পয়েন্ট। অনুরূপভাবে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই গতকাল ৫১ দশমিক ৯১ পয়েন্ট অবনতির শিকার হয়। বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের অবনতি রেকর্ড করা হয় যথাক্রমে ৩৮ দশমিক ৭৬ ও ২৫ দশমিক ২২ পয়েন্ট।

দিনভর বিক্রয়চাপে সূচকের নিম্নমুখী আচরণের ফলে গতকাল বাজারগুলোর লেনদেনেও ভাটা পড়েছে। ডিএসই গতকাল ৭২৬ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করে যা আগের দিন অপেক্ষা ১৪২ কোটি টাকা কম। এটি এক মাসের মধ্যে ডিএসইর সর্বনিম্ন লেনদেন। গত ৭ এপ্রিলের পর ডিএসইর লেনদেন আর এত নীচে নামেনি। লেনদেন কমেছে চট্টগ্রাম শেয়ারবাজারেও। সিএসইতে আগের দিনের ৩২ কোটি টাকা থেকে ১৮ কোটিতে নেমে আসে লেনদেন।

এ দিকে শেয়ারবাজারে অনিয়ম, দুর্নীতি, ইনসাইডার ট্রেডিং ও কারসাজির তথ্য প্রদানকারীর (হুইসেলব্লোয়ার) সুরক্ষা নিশ্চিতে একটি খসড়া বিধিমালা অনুমোদন করেছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। রোববার (১৭ মে) বিএসইসি চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ১০১৫তম জরুরি কমিশন সভায় ‘বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্ট তথ্য প্রকাশ ও তথ্য প্রকাশকারীর সুরক্ষা প্রদান) বিধিমালা- ২০২৬’ এর খসড়ার অনুমোদন মেলে। কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিধিমালাটি শিগগিরই গেজেট আকারে প্রকাশ করা হবে।

এর আগে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি কমিশনের ৯৯৯তম সভায় খসড়াটির অনুমোদনের পর মতামত যাচাইয়ের জন্য তা ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়। মূলত পুঁজিবাজারে আইনকানুন প্রতিপালন নিশ্চিতকরণ, ক্ষমতার অপব্যবহার, অর্থ আত্মসাৎ ও পাচার প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে এই বিধিমালা ভূমিকা রাখবে।

বিধিমালা অনুযায়ী, কমিশনে নিবন্ধিত বাজার মধ্যস্থতাকারী, তালিকাভুক্ত কোম্পানি বা এসপিভির কর্মকর্তা-কর্মচারী, পরিচালনা পর্ষদ ও ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য এবং নিরীক্ষকরা হুইসেলব্লোয়ার হিসেবে গণ্য। এসব ব্যক্তি পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্ট কোনো আইন লঙ্ঘন বা প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডের তথ্য নির্ধারিত ফরমে সরাসরি, ডাকযোগে বা ইলেকট্রনিক মাধ্যমে বিএসইসিতে পাঠাতে পারবেন।

বিধিমালায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি যুক্তিসঙ্গত বিশ্বাসের ভিত্তিতে পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্ট অনিয়ম, আইন লঙ্ঘন বা প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে অবগত হলে নির্ধারিত ফরমে কমিশনের চেয়ারম্যানের কাছে তথ্য প্রকাশ করতে পারবেন। তথ্য লিখিতভাবে, সরাসরি, ডাকযোগে বা ইলেকট্রনিক মাধ্যমে প্রেরণ করা যাবে। এতে তথ্য-প্রকাশকারীর পরিচয় কঠোরভাবে গোপন রাখার বিধান রাখা হয়েছে। তথ্য প্রকাশের কারণে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে পদাবনতি, বদলি, চাকরিচ্যুতি, হয়রানি বা বৈষম্যমূলক কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে না বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।

খসড়া অনুযায়ী, কমিশনের অধীনে একজন অতিরিক্ত পরিচালক পদমর্যাদার কর্মকর্তাকে ‘ডিজিগনেটেড অফিসার’ হিসেবে নিয়োগ দেয়া হবে। তিনি তথ্য গ্রহণ, প্রাথমিক যাচাই-বাছাই, রেজিস্টার সংরক্ষণ ও প্রাথমিক মূল্যায়ন প্রতিবেদন প্রস্তুত করবেন। প্রয়োজনবোধে বিষয়টি কমিশনের ইন্সপেকশন, ইনকোয়ারি অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন বিভাগে পাঠানো হবে। প্রাথমিক যাচাইয়ে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট আইন অনুযায়ী তদন্ত ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তবে অভিযোগ তুচ্ছ, হয়রানিমূলক বা ভিত্তিহীন প্রমাণিত হলে তাৎক্ষণিকভাবে কার্যক্রম বন্ধের বিধানও রাখা হয়েছে।

বিধিমালায় আরো বলা হয়েছে, তথ্য-প্রকাশকারীর দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে আরোপিত জরিমানা বা অর্থদণ্ড আদায় হলে কমিশন স্বীয় বিবেচনায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে আর্থিক প্রণোদনা বা সম্মাননা প্রদান করতে পারবে। তবে এ প্রণোদনার পরিমাণ আদায়কৃত অর্থের ২৫ শতাংশের বেশি এবং কোনো অবস্থাতেই ১০ কোটি টাকার বেশি হবে না।

গতকাল ডিএসইতে লেনদেনের শীর্ষে উঠে আসে বীমা খাতের কোম্পানি মেঘনা ইন্স্যুরেন্স। ২৯ কোটি টাকায় কোম্পানিটির ৮৭ লাখ ৬৬ হাজার শেয়ার হাতবদল হয় গতকাল। ১৭ কোটি চার লাখ টাকায় ২২ লাখ ২৪ হাজার শেয়ার বেচাকেনা করে লেনদেনের তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে ছিল প্রকৌশল খাতের ডমিনেজ স্টিল বিল্ডিং সিস্টেমস। ডিএসইর লেনদেনে শীর্ষ ১০ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে ব্রাক ব্যাংক, টেকনোড্রাগস, আর ডি ফুডস, এশিয়াটিক ল্যাবরেটরিজ, কাসেম ইন্ডাস্ট্রিজ, ইস্টার্ণ লুব্রিকেন্ট, এনসিসি ব্যাংক ও শাইনপুকুর সিরামিকস।