নতুন ষড়যন্ত্র বলছে বিএনপি, বাধা দেয়া বেআইনি দাবি আ’লীগের

হাসিনার দেশে ফেরা নির্ভর করছে ‘রাজনৈতিক বোঝাপড়ার’ ওপর!

Printed Edition

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল

ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘শিগগিরই দেশে ফিরবেন’- এমন একটি বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ পাওয়ার পর দেশের রাজনীতিতে তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। এর আগেও একাধিকবার তিনি দেশে ফেরার কথা বললেও পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে ভারতীয় একটি গণমাধ্যমে দেয়া তার সাম্প্রতিক এ বক্তব্যটিকে ঘিরে এবার নানান রাজনৈতিক সমীকরণ ও মত দেখা যাচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, উপযুক্ত রাজনৈতিক প্রোপট তৈরি হলেই কেবল বাংলাদেশে শেখ হাসিনার ফিরে আসার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। এ েেত্র ভারতের মোদি সরকার ও বাংলাদেশের বর্তমান মতাসীনদের মধ্যে একটি গভীর রাজনৈতিক বোঝাপড়া হলেই কেবল তা সম্ভব।

এ দিকে গণ-অভ্যুত্থানে অংশ নেয়া প্রায় সব রাজনৈতিক দলই স্পষ্ট জানিয়েছে, শেখ হাসিনা ও তার দল আওয়ামী লীগকে রাজনীতি করার কোনো সুযোগ এ দেশের জনগণ আর দেবে না। তাদের মতে, দীর্ঘ মেয়াদে ফ্যাসিবাদের চর্চা এবং ফ্যাসিবাদী কার্যক্রমের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ বাংলাদেশকে চরম সঙ্কটের মধ্যে ফেলে দিয়েছে; তাই বাংলাদেশের মানুষ তাদের আর সহজে গ্রহণ করবে না। আবার কোনো কোনো রাজনৈতিক দল ও শক্তির দাবি, বর্তমান বিএনপি সরকারের নানামুখী ব্যর্থতা ও মন্থর নীতির সুযোগেই আওয়ামী লীগ আবার সক্রিয় হওয়ার সাহস পাচ্ছে। তাদের মতে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মূল দাবি ছিল তিনটি- আমূল রাষ্ট্রীয় সংস্কার, গণহত্যার বিচার ও অবাধ নির্বাচন। এ তিনটির পূর্ণাঙ্গ ও দ্রুত বাস্তবায়ন না হওয়ায় আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অস্তিত্ব পুরোপুরি বিলীন করা সম্ভব হয়নি।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, চব্বিশের ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানের মুখে মতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশ ছাড়ার পর থেকে বিভিন্ন সময়ে তার রাজনীতিতে ফেরা না-ফেরা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সম্প্রতি ভারতীয় গণমাধ্যমে ‘শিগগিরই’ দেশে ফেরার যে বক্তব্য প্রকাশ হয়েছে, তাতে নতুন করে এই বিতর্ক সামনে এলো। উল্লেখ্য, বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন ও পরবর্তী সময়ে নির্বাহী আদেশে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং দলটির নিবন্ধনও স্থগিত রয়েছে। একই সাথে চব্বিশের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়েছে। এ ছাড়া আগের একাধিক দুর্নীতির মামলাতেও তার সাজা রয়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে, শেখ হাসিনার দেশে ফিরে আসা অথবা নতুন করে আওয়ামী লীগের রাজনীতি শুরু করা কতটা বাস্তবসম্মত বা চ্যালেঞ্জের? বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা দলটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম গণমাধ্যমে দাবি করেছেন, ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের জন্য এই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়েছে। এটা সম্পূর্ণ বেআইনি ও অসাংবিধানিক। শেখ হাসিনা অবশ্যই দেশে ফিরবেন। তারও রাজনীতি করার অধিকার রয়েছে। তাকে দেশে আসতে বাধা দেয়া বা হুমকি দেয়া সংবিধানের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।’

এ বিষয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘সরকার তো আইন করে বা নির্বাহী আদেশে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছে। মানুষ তো আর সরাসরি ভোট দিয়ে হাসিনাকে রিজেক্ট করার সুযোগ পায়নি, কারণ তারা ভোটে সেই সুযোগই পায়নি। ফলে ওই জায়গায় একটি রাজনৈতিক দুর্বলতা রয়ে গেছে। যত দিন জনগণের একটি অংশের পরো সমর্থন বা রাজনৈতিক শূন্যতা থাকবে, তত দিন শেখ হাসিনার কামব্যাক করার মনস্তাত্ত্বিক সম্ভাবনাটা থেকেই যায়।’

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার তীব্র আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা বাংলাদেশ ছেড়ে ভারতে যান এবং বর্তমানে সেখানেই অবস্থান করছেন। এরই মধ্যে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি জয়লাভ করে সরকার গঠনের পর, দেশের বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ঝটিকা মিছিল করে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দেয়ার একধরনের চেষ্টা দৃশ্যমান হচ্ছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশের একটি নির্দিষ্ট অংশের মানুষ ঐতিহ্যগতভাবে এই দলটিকে সমর্থন করে। আওয়ামী লীগ ভোটের রাজনীতিতে গণ-প্রত্যাখ্যাত না হয়ে আইনি আদেশে নিষিদ্ধ হওয়ায়, একধরনের জনসমর্থন পুঁজি করেই তারা ফেরার চেষ্টা করছে। তবে ঠিক কিভাবে বা কোন প্রক্রিয়ায় আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনা ফিরবেন, সেটি এখনই সুনির্দিষ্ট করে বলা মুশকিল। কেউ কেউ বলছেন, পর্দার আড়ালে চলমান ভূরাজনীতি ও আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে অনেক কিছুই ঘটে, যা সাধারণ মানুষের দৃশ্যপটের বাইরে থাকে। হয়তো অনেক পরে এর প্রকৃত রূপ জানা যাবে।

তবে বিএনপিসহ প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা বলছেন, কেবল চব্বিশের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার ও রায়ের মুখোমুখি হওয়ার জন্যই বাংলাদেশে শেখ হাসিনাকে ফিরে আসতে হবে। এ ছাড়া অন্য কোনো উপায়ে বা বীরের বেশে তার আসার কোনো সুযোগ নেই।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সরকারের প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক ও শিল্প বিষয়ক উপদেষ্টা এবং বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধের যে নির্বাহী আদেশ রয়েছে, সেটি বাতিলের কোনো সিদ্ধান্ত বা পরিকল্পনা এখন পর্যন্ত সরকারের নেই। তিনি আরো বলেন, ‘শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আদালতে বিচার চলছে এবং সেই বিচারপ্রক্রিয়া অব্যাহত আছে। এরই মধ্যে একটি মামলায় তার মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়েছে এবং আরো অসংখ্য অপরাধের বিচার চলছে। তিনি যদি এই স্বাধীন বিচারপ্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে চান, তবে যেকোনো ফাইটে দেশে আসতেই পারেন, তাকে স্বাগত। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে হাসিনার এ ধরণের উসকানিমূলক বক্তব্য দেশের অর্জিত স্থিতিশীলতা বিনষ্ট করার নতুন কোনো গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ বলেই আমরা মনে করি।’

এ দিকে আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই সরকার শেখ হাসিনাকে ফেরত চায় বলে স্পষ্ট মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে আমরা ভারতকে আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানিয়েছি। দুই দেশের এক্সট্রাডিশন (প্রত্যর্পণ) চুক্তি অনুসারেও অনুরোধ করা হয়েছে- আমরা শেখ হাসিনাকে ফেরত চাই এবং আমরা চাই তিনি দেশের প্রচলিত আদালতের মুখোমুখি হোন। এখন তিনি নিজেই যদি বলেন আসতে চান, তবে তো ভালোই, কারণ আমরাও তাকে আইনগতভাবে ফেরত চাচ্ছি।’

অন্য দিকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর নেতারাও মনে করছেন, শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরলে সবার আগে আইনের মুখোমুখি হতে হবে। দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, ‘শেখ হাসিনাকে আগে আদালতের দেয়া আইনি সাজা ভোগ করতে হবে। তার আগে রাজনীতি করার কোনো সুযোগ এ দেশের জনগণ তাদের দেবে না। যেহেতু তারা ফ্যাসিবাদ এবং দীর্ঘ স্বৈরাচারী কার্যক্রমের মাধ্যমে বাংলাদেশকে চরম সঙ্কটের মধ্যে ফেলে দিয়েছিল, তাই বাংলাদেশের মানুষ তাদের আর সহজে রাজনীতিতে গ্রহণ করবে না।’

জাতীয় নাগরিক পার্টির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী মনে করেন, বর্তমান নির্বাচিত সরকারের কিছু প্রশাসনিক শিথিলতা ও ব্যর্থতার সুযোগেই আওয়ামী লীগ আবার সক্রিয় হওয়ার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মূল দাবি ছিল তিনটি- সংস্কার, বিচার ও নির্বাচন। এ তিনটির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন যথাসময়ে না হওয়ায় আওয়ামী লীগ এখনো টিকে থাকার খড়কুটো পাচ্ছে।’ আওয়ামী লীগ ভবিষ্যতে রাজনীতিতে ফিরতে পারবে কি না- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘যদি আওয়ামী লীগকে দল হিসেবে আসতে হয়, তবে অবশ্যই তাদের ঐতিহাসিক গণহত্যার বিচারের মুখোমুখি হতে হবে। তারা রাজনীতি শুরু করতে পারবে কি না, বিচারের কাঠগড়াতেই সেই রায় নির্ধারিত হবে।’

গত মঙ্গলবার শেখ হাসিনা এক বিবৃতিতে বলেছেন, খুব দ্রুত তিনি বাংলাদেশে নিজের চেনা জমিতে ফিরতে চলেছেন। একই সাথে বাংলাদেশে হওয়া সাম্প্রতিক ত্রয়োদশ নির্বাচন এবং নবগঠিত বিএনপি সরকারের তীব্র সমালোচনা করেন আওয়ামী লীগ নেত্রী। তিনি বলেন, ‘আমার অনুপস্থিতি মানেই আমার নীরবতা নয়। আমি প্রতিটি মুহূর্তে দেশের মানুষের অধিকারের জন্য দেশে না থেকেও সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছি।’

এ দিকে শেখ হাসিনার দেশে ফিরে আসা নিয়ে রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে নির্বাচন-উত্তর প্রথম আন্তর্জাতিক সংবাদ সম্মেলনে বিদেশী সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন তারেক রহমান বলেছিলেন, শেখ হাসিনাকে ভারত থেকে ফেরাতে আইনি ও কূটনৈতিক পথেই হাঁটবে তার সরকার। তিনি স্পষ্ট করেন, বিচারব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ নিজস্ব গতিতে চলতে দেয়া হবে এবং আইনের শাসন মেনেই সব কিছুর ফয়সালা হবে।

বিএনপি মনে করে, তারেক রহমানের নেতৃত্বে দীর্ঘ এক দশক পর দেশে যখন একটি গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক সংস্কারের পথ সুগম হয়েছে, ঠিক তখন শেখ হাসিনার এ ধরনের উসকানিমূলক ঘোষণা দেশের আইনশৃঙ্খলার স্বাভাবিক পরিস্থিতি বিঘিœত করার একটি আন্তর্জাতিক চক্রান্ত।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার এই আকস্মিক ঘোষণা বাংলাদেশের সমকালীন রাজনীতিতে এক নতুন মেরুকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তারা বলছেন, হাসিনার ‘খুব শিগগিরই’ দেশে ফেরার বার্তাটি এক দিকে যেমন কোণঠাসা হয়ে পড়া আওয়ামী লীগের তৃণমূল নেতাকর্মীদের জন্য টিকে থাকার মনস্তাত্ত্বিক খড়কুটো, তেমনি নতুন সরকারের জন্য ফ্যাসিবাদ পুনরুত্থানের বিরুদ্ধে সতর্ক থাকার একটি নতুন অ্যালার্ম বা সতর্কবার্তা। শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনা কবে, কিভাবে দেশে ফিরবেন বা তার আইনি পরিণতি কী হবে, তা মূলত আগামী দিনের পরিবর্তিত অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি, আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থার দৃঢ়তার ওপরই নির্ভর করছে।