অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
গত কয়েক বছরের মধ্যে এ মুহূর্তে পুঁজিবাজার আচরণ নিয়ে স্বস্তি খুঁজে পাচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা। শেষ দিনটি বাদ দিলে গত সপ্তাহের প্রায় পুরোটাই ইতিবাচক ছিল পুঁজিবাজার। সূচকের উন্নতির পাশাপাশি লেনদেনেও একটি সম্মানজনক অবস্থান ধরে রেখেছে পুঁজিবাজারগুলো। কোনো কোনো দিন সূচকের উন্নতি ঘটার পরও সংশোধন ঘটেছে বাজারে, যা বিনিয়োগকারীদের জন্য অস্বস্তির কারণ হয়নি। আর এরই মাঝে বিনিয়োগের মুনাফা তুলে নিতেও সমস্যা হচ্ছে না তাদের। বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, পুনর্গঠিত বিএসইসির নেয়া উদ্যোগ ও সরকারের নীতি সহায়তার ঘোষণা দুই মিলে একটি গতিশীল ও স্বচ্ছ পুঁজিবাজারের দিকে এগোচ্ছে দেশ।
গত সপ্তাহের পাঁচটি কার্যদিবসের মধ্যে চারটিতেই কমবেশি সূচক ধরে রাখে পুঁজিবাজার। শেষটিতে সংশোধনের শিকার হলেও তাকে স্বাভাবিক বলেই ধরে নিয়েছেন বিনিয়োগকারীরা। এ সময় বাজারে বিভিন্ন খাতে ভারসাম্য ফিরে আসতে দেখা যায়। আগের সপ্তাহে যেখানে ব্যাংক ও বীমা খাতে সংশোধন ঘটেছিল গত সপ্তাহে এ খাতগুলোতে মূল্যবৃদ্ধি ঘটে। একই সময় ভালো ও মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানিতে ফেরার ইঙ্গিত ছিল বিনিয়োগকারীদের, যা বাজারের টেকসই হওয়ার জন্য প্রয়োজন। এর মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে স্বল্পমূলধনী ও অপেক্ষাকৃত দুর্বল কোম্পানি নিয়ে যে অযৌক্তিক খেলা চলছিল তা থেকে বেরিয়ে আসতে শুরু করেন তারা। এতে স্বাভাবিক আচরণে ফিরতে শুরু করে বাজার।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গত সপ্তাহে ৯৬ দশমিক ৩৪০ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখে। ৫ হাজার ৮০৪ দশমিক ০৬ পয়েন্ট থেকে রোববার সপ্তাহ শুরু করা সূচকটি বৃহস্পতিবার লেনদেন শেষে পৌঁছে যায় ৫ হাজার ৯০০ দশমিক ৩৬ পয়েন্টে। একই সময় ডিএসইর দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহর উন্নতি রেকর্ড করা হয় যথাক্রমে ৪৯ দশমিক ৮৭ ও ১৭ দশমিক ৭৫ পয়েন্ট।
সূচকের উন্নতির ফলে সপ্তাহটিতে বাজারটির লেনদেনেও উন্নতি ঘটে। এ সময় ডিএসই মোট ৭ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করে যা আগের সপ্তাহ অপেক্ষা ৬ দশমিক ৫৮ শতাংশ বেশি। আগের সপ্তাহে বাজারটির মোট লেনদেন ছিল ৬ হাজার ৯১৯ কোটি টাকা।
একই হারে উন্নতি ঘটে বাজারটির গড় লেনদেনেরও। আগের সপ্তাহের ১ হাজার ৩৮৩ কোটি টাকার স্থলে গতসপ্তাহে ডিএসইর গড় লেনদেন দাঁড়ায় ১ হাজার ৪৭৪ কোটি টাকা।
সূচকের উন্নতির ফলে গত সপ্তাহে ডিএসইর বাজার মূলধনে যোগ হয়েছে ৭ হাজার ৪৯ কোটি টাকা, যা আগের সপ্তাহ অপেক্ষা এক শতাংশ বেশি। আগের সপ্তাহে ডিএসইর মূলধন ছিল ৭ লাখ ৩ হাজার ৮৩৪ কোটি টাকা।
এ দিকে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) ১০২০তম কমিশন সভায় অনুমোদিত ‘বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (মার্জিন) বিধিমালা, ২০২৫’-এর সংশোধনী খসড়া নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত অসম্পূর্ণ ও বিভ্রান্তিকর সংবাদের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি।
বিএসইসির মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক ম্:ো আবুল কালাম স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, কমিশনের ১০২০তম সভায় মার্জিন বিধিমালা, ২০২৫-এর সংশোধন প্রস্তাবের (খসড়া) অনুমোদনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হলেও, সংশোধিত খসড়াটি জনমত যাচাইয়ের জন্য প্রকাশের আগেই বিভিন্ন গণমাধ্যমে এ বিষয়ে অসম্পূর্ণ, বিভ্রান্তিকর এবং বাস্তবতাবিবর্জিত তথ্য প্রকাশ করা হচ্ছে। এতে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অযাচিত বিভ্রান্তির সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে কমিশন স্পষ্ট করেছে, মার্জিন বিধিমালা, ২০২৫ সংশোধনের প্রধান উদ্দেশ্য হলো বর্তমান বিধিমালা বাস্তবায়নের সময় যে বাস্তব ও ব্যবহারিক জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে, সেগুলো দূর করা। পাশাপাশি বিধিমালাকে আরো সহজ, কার্যকর ও বাস্তবসম্মত করে বাজারসংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের জন্য এর প্রয়োগ আরও সুবিধাজনক করে তোলাই এ উদ্যোগের লক্ষ্য।
এতে আরো বলা হয়েছে, সংশোধনী প্রস্তাব তৈরির সময় মার্জিন সুবিধা গ্রহণকারী বিনিয়োগকারী, স্টক ব্রোকার, মার্চেন্ট ব্যাংক, বাজার মধ্যস্থতাকারী এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য অংশীজনের মতামত ও বাস্তব অভিজ্ঞতাকে গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় নেয়া হয়েছে। কমিশনের লক্ষ্য একটি কার্যকর, বাস্তবমুখী এবং বিনিয়োগকারী-সহায়ক মার্জিন ব্যবস্থাপনা কাঠামো গড়ে তোলা।
বিএসইসি আরো জানিয়েছে, সংশোধিত খসড়া বিধিমালাটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। কমিশন সভায় অনুমোদিত খসড়াটি শিগগিরই জনমত যাচাইয়ের জন্য জাতীয় দৈনিক পত্রিকা এবং কমিশনের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে। এরপর অংশীজন ও সাধারণ জনগণের মতামত গ্রহণ করে প্রয়োজনীয় পর্যালোচনার মাধ্যমে ‘বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (মার্জিন) বিধিমালা, ২০২৫’-এর সংশোধনী চূড়ান্ত করা হবে। এ কারণে জনমত যাচাইয়ের আগেই সংশোধিত বিধিমালাকে ঘিরে অনুমাননির্ভর বা আংশিক তথ্য প্রকাশ করে বিভ্রান্তি সৃষ্টি না করার জন্য সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি আহ্বান জানিয়েছে কমিশন। বিএসইসির মতে, প্রকৃত খসড়া প্রকাশের পর বিধিমালার উদ্দেশ্য, পরিধি এবং সংশোধনের যৌক্তিকতা সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট সবার সুস্পষ্ট ধারণা তৈরি হবে।
প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে আরো উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন সব সময় বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণ ও সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করে। মার্জিন রুলসের এ সংশোধনী উদ্যোগও সেই নীতিরই ধারাবাহিকতা।
গত সপ্তাহে ডিএসইতে লেনদেনের শীর্ষ কোম্পানি ছিল খাদ্য ও আনুসঙ্গিক খাতের কোম্পানি লাভেলো আইসিক্রিম। গড়ে প্রতিদিন ৪৪ কোটি ৫৩ লাখ টাকার শেয়ার হাতবদল হয় কোম্পানিটির যা বাজারটির মোট লেনদেনের ৩ দশমিক ০২ শতাংশ। গড়ে প্রতিদিন ৩৮ কোটি ২৯ লাখ টাকার শেয়ার বেচাকেনা করে লেনদেনের দ্বিতীয় স্থানে ছিল টেক্সটাইল খাতের মালেক স্পিনিং। ডিএসইর লেনদেনের শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে বাংলাদেশ শিপিং করপোারেশন, ব্র্যাক ব্যাংক, লাফার্জ হোলসিম বাংলাদেশ, সামিট অ্যালাইয়েন্স পোর্ট, বিএসআরএম স্টিলস, বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস, ইস্টার্ন হাউজিং ও মেঘনা ইন্স্যুরেন্স।



