নেপালকে হারিয়ে ফাইনালে বাংলাদেশ

ক্রীড়া প্রতিবেদক
Printed Edition
  • বাংলাদেশ ২ : ১ নেপাল
  • ( ঋতুপর্ণা, সাগরিকা ) (গীতা রানা )

৬ মিনিট ইনজরি টাইম ভুটানের রেফারি ওম চোকি খেলালেন ১৩ মিনিট! এরপর খেলা শেষের বাঁশি। সাথে সাথেই কান্নায় ভেঙে পড়েন সাগরিকাসহ বাংলাদেশ দলের অন্য সদস্যরা। পরক্ষণেই ছুটলেন সাইড বেঞ্চের দিকে। যেখানে বসা ডিফেন্ডার শিউলী আজিম। আগের দিন মায়ের মৃত্যু সংবাদ শুনতে হয়েছিল তাকে। কিন্তু জাতীয় স্বার্থের কারণে খেলা রেখে ভারত ছেড়ে বাংলাদেশে আসেননি ময়মনসিংহের এই মেয়ে। তার মায়ের মৃত্যুর স্মরণে লাল-সবুজদের সবাই কালো ব্যাজ পরে খেলেছে। ফুটবলাররা পণ করেছিলেন তারা এই ম্যাচটি জিততে চান শিউলী আজিমের জন্য। শেষ পর্যন্ত পিছিয়ে পড়া বাংলাদেশ দল সেই কাজই করতে পেরেছে। তা ঋতুপর্ণা চাকমা ও সাগরিকার গোলে। ২-১ গোলের এই সেমিফাইনালে জয় বাংলাদেশকে টানা তৃতীয়বারের মতো নিয়ে গেছে নারী সাফের ফাইনালে। ৬ জুন ফাইনালে তারা পাচ্ছে ভারত ও ভুটানের মধ্যকার জয়ী দলকে। একই সাথে ২০১০ ও ২০১৪ সালের সাফের সেমিতে নেপালের কাছে হারের বদলাটাও এবার নিলো মারিয়া মাণ্ডারা।

খেলা কি তবে অতিরিক্ত সময়ে গড়াবে। এই যখন টিভি ভাষ্যকারের প্রশ্ন তখনই গোল। আর সেই গোল বাংলাদেশের মোসাম্মদ সাগরিকার। লাল-সবুজদের এই স্ট্রাইকারকে নামানো হয়েছিল বদলি হিসেবে। ৭৮ মিনিটে তার শট নেপালি গোলরক্ষক রঞ্জনা দারুণ দক্ষতায় কর্নার করলেও ইনজুরি টাইমে আর পারেননি। এবার ছোট শামসুন্নাহারের এক খেলোয়াড়কে ড্রিবলিং করে দেয়া সেন্টারে পা লাগিয়ে পিটার জেমস বাটলার বাহিনীসহ পুরো বাংলাদেশের সমর্থকদের উল্লাসে মাতান সাগরিকা। এই সাগরিকা গত বছর অনূর্ধ্ব-২০ সাফে নেপালের বিপক্ষে শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচে করেছিলেন চার গোল।

গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে বাংলাদেশের অসহায় আত্মসমর্পণ ছিল ভারতের কাছে। ০-৩ গোলে সেই হারের ম্যাচে বড় অসহায় ছিল মারিয়া মাণ্ডার দল। যে কারণে গোয়া সাফে ‘এ’ গ্রুপে রানার্সআপ হতে হয়েছিল বাংলাদেশকে। সেই সূত্র ধরেই ১২ বছর পর সেমিতে নেপালের সাথে দেখা। ভারতের কাছে হারের পর কোচ পিটার বাটলার দলে তিন পরিবর্তন আনেন। ডিফেন্ডার সুরমা জান্নাত, মিডফিল্ডার মণিকা চাকমা এবং ফরোয়ার্ড ছোট শামসুন্নারহকে বাদ দেন একাদশ থেকে। প্রথম ১১ জনে ফেরেন ডিফেন্ডার আফঈদা খন্দকার প্রান্তি, মিডফিল্ডার উমেহেলা মারমা এবং ফরোয়ার্ড সৌরভী আকন্দ প্রীতি। তবে এই পরিবর্তনেও কাজ হচ্ছিল না।

নেপালি মেয়েরা আগের দুই ফাইনালে হারের প্রতিশোধ নিতে শুরু থেকেই মারিয়া মাণ্ডাদের উপর চড়াও হয়। বাংলাদেশ দলের দুর্বল মিডফিল্ডের সুবাদে তারা এতটাই দাপটের সাথে খেলতে থাকে যে বারবারই মনে হচ্ছিল এই বুঝি বল চলে যাচ্ছে লাল সবুজদের জালে। ২২ মিনিটেই সেই গোল। কর্নার থেকে আসা বল ঠিক মতো ফিস্ট করতে ব্যর্থ গোলরক্ষক মিলি আক্তার। সেই বক্সের ভেতর পড়লে ডান পায়ের আলতো চিপে তা জালে পাঠান গীতা রানা। ৩৪ মিনিটে নেপালের আরেকটি গোল প্রচেষ্টা ঠেকান গোলরক্ষক মিলি। ৩৬ মিনিটে কপাল গুণে রক্ষা পায় বাংলাদেশ। প্রীতি রাইয়ের দূরপাল্লার শট মিলির হাতের ছোঁয়া নিয়ে ক্রসবারে প্রতিহত হয়। কিছুক্ষণ পর তাদের আরেকটি গোল প্রচেষ্টাও ব্যর্থ।

অবস্থা বেগতিক দেখে কোচ বাটলার ৪০ মিনিটে উমেহলা ও প্রীতিকে তুলে মাঠে নামান ছোট শামসুন্নাহার ও তহুরা খাতুনকে। এতে খেলায় গতি বাড়ে সাফ চ্যাম্পিয়নদের। এরই ধারাক্রমে প্রথমার্ধের ইনজুরি টাইমে তারকা ফরোয়ার্ড ঋতুপর্ণা চাকমার কর্নার কিক সরাসরি জালে যায়। নারী ফুটবলে বাংলাদেশের এটি চতুর্থ অলিম্পিক গোল। এর আগে ২০১৯ সালে মিয়ানমারের বিপক্ষে এএফসি অনূর্ধ্ব-১৬ ফুটবলে মণিকা চাকমা, গত বছর অনূর্ধ্ব-২০ নারী সাফে ভুটানের বিপক্ষে শান্তি মার্ডি, এ বছর অনূর্ধ্ব-১৯ নারী সাফে ভুটানের বিপক্ষে মামনি চাকমা এই কর্নার থেকে অলিম্পিক গোল করেছিলেন।

বিরতির পর মাঠে আসেন মণিকা চাকমা। তুলে নেয়া হয় মমিতা খাতুনকে। মণিকা মাঠে নেমে থিতু হওয়ার আগেই ফের গোলের সুযোগ তৈরি করে নেপাল। তবে এবারো কপাল মন্দ। কাউন্টার অ্যাটাক থেকে রেখা পাউডেল আগুয়ান মিলিকে পরাস্ত করে পোস্টে শটও নেন। তবে তা সাইড পোস্টে প্রতিহত হয়। এরপর শুরু হয় বাংলাদেশ দলের পাল্টা আক্রমণ। ৫৪ মিনিটে ছোট শামসুন্নাহারের শট বার ঘেঁষে যায়। মিনিট দশেক পর মণিকার হেডের গন্তব্যও বারের উপর দিয়ে। ৬৮ মিনিটে নেপালের কৃষ্ণা চৌধুরীর শটও অল্পের জন্য জালে যায়। ৭২ মিনিটে আনিকার বদলে মাঠে নামা সাগরিকা ৭৮ মিনিটে পোস্টে দারুণ এক শট নেন। তবে তা নেপালি কিপারের দৃঢ়তায় কর্নার হয়। এরপর ইনজুরি টাইমে ছোট শামসুন্নাহারের সেন্টার থেকে ডান পায়ের টোকায় গোয়ার মারগাঁও এর জহরলাল নেহরু স্টেডিয়ামে লাল-সবুজদের উল্লাসে মাতান সাগরিকা। শেষ মুহূর্তে মিলি একটি শট ঠেকালে ফাইনাল নিশ্চিত হয় দুইবারের চ্যাম্পিয়নদের।