গাজার শিক্ষা খাত পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করছে ইসরাইল

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

ফিলিস্তিনি শিক্ষামন্ত্রী আমজাদ বারহাম বলেছেন, শিক্ষার্থীদের শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত করতেই গাজার শিক্ষা খাতকে পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করছে ইসরাইল। জর্দানে আয়োজিত এক আন্তর্জাতিক শিক্ষা সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন। খবর আনাদোলু এজেন্সির। মন্ত্রী বলেন, গাজায় অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়ে গেছে। একই সাথে অধিকৃত পশ্চিমতীর ও পূর্ব জেরুসালেমেও শিক্ষা খাতের ওপর হামলা ও বিধিনিষেধ অব্যাহত রয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, গাজার প্রায় ৮৫ শতাংশ বিশ্ববিদ্যালয় ভবন ধ্বংস করা হয়েছে। এ ছাড়া ৩০৭টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ২৯৩টিই ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে।

তিনি বলেন, এই ধ্বংসযজ্ঞ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এটি একটি ‘পরিকল্পিত ধ্বংসনীতি’, যার লক্ষ্য ফিলিস্তিনি শিক্ষাব্যবস্থাকে ভেঙে ফেলা এবং শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ সঙ্কুচিত করা। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় ইসরাইলি হামলায় ৭২ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাদের বেশির ভাগ নারী ও শিশু। একই সাথে উপত্যকার প্রায় ৯০ শতাংশ অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে গেছে বলে ফিলিস্তিনি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করা হচ্ছে : অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় খাদ্য ও সহায়তা সরবরাহে বাধা দিয়ে ইসরাইল কৃত্রিমভাবে অপুষ্টিজনিত সঙ্কট তৈরি করছে বলে মন্তব্য করেছে আন্তর্জাতিক চিকিৎসা সহায়তাকারী সংস্থা ডক্টরস উইদাউট বর্ডারস (এমএসএফ)। সংস্থাটির মতে, এর ফলে গর্ভবতী নারী ও নবজাতক শিশুরা মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এক চিকিৎসা তথ্যের বিশ্লেষণে এমএসএফ জানিয়েছে, ইসরাইল কর্তৃক প্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহে কঠোর বিধিনিষেধ এবং বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলার কারণে গর্ভবতী নারীদের মধ্যে অপুষ্টির হার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। এর ফলে সময়ের আগেই শিশু জন্মের (প্রি-ম্যাচিউর বার্থ) সম্ভাবনা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এ ছাড়া অপুষ্টিতে আক্রান্ত মায়েদের গর্ভে জন্ম নেয়া শিশুদের মৃত্যুহারও অনেক বেশি বলে সংস্থাটি জানিয়েছে।

এমএসএফের এই বিশ্লেষণটি ২০২৪ সালের শেষভাগ থেকে ২০২৬ সালের শুরুর দিক পর্যন্ত গাজার চারটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে। সংস্থাটি জানায়, ২০২৩ সালের অক্টোবরে ইসরাইলের হামলা শুরুর আগে গাজায় অপুষ্টির সমস্যা প্রায় ছিলই না। ইসরাইলি হামলায় এ পর্যন্ত ৭২ হাজার ৫০০-এর বেশি মানুষ নিহত হয়েছে এবং বর্তমানে গাজার চরম মানবেতর পরিস্থিতির জন্য সরাসরি ইসরাইলি কর্মকাণ্ডই দায়ী। এমএসএফের জরুরি চিকিৎসাবিষয়ক প্রতিনিধি মার্স রোকাসপানা বলেন, ‘এই অপুষ্টি সংকট সম্পূর্ণভাবে কৃত্রিম উপায়ে তৈরি করা হয়েছে। যুদ্ধের আগে গাজায় অপুষ্টি বলতে গেলে ছিলই না। গত আড়াই বছর ধরে মানবিক সহায়তা ও বাণিজ্যিক পণ্যের ওপর পদ্ধতিগত অবরোধ এবং নিরাপত্তাহীনতার কারণে খাবার ও বিশুদ্ধ পানির অভাব তীব্র হয়েছে।’ তিনি আরো জানান, স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো অকেজো হয়ে পড়ায় এবং জীবনযাত্রার মান চরমভাবে নিচে নেমে যাওয়ায় অরক্ষিত জনগোষ্ঠী অপুষ্টির উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুন থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত দু’টি হাসপাতালে চিকিৎসা নেয়া অর্ধেকেরও বেশি গর্ভবতী নারী অপুষ্টিতে ভুগছিলেন। এমনকি সন্তান প্রসবের সময়ও ২৫ শতাংশ নারী অপুষ্টির শিকার ছিলেন। এসব পরিস্থিতিতে জন্ম নেয়া শিশুদের ৯০ শতাংশই ছিল প্রি-ম্যাচিউর এবং ৮৪ শতাংশের ওজন ছিল স্বাভাবিকের চেয়ে কম। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, কম ওজনের শিশুদের মৃত্যুঝুঁকি স্বাভাবিক শিশুদের চেয়ে ২০ গুণ বেশি। গাজার আবাসন খাতের ক্ষয়ক্ষতির চিত্র তুলে ধরে জাতিসঙ্ঘ জানিয়েছে, বর্তমানে উপত্যকাটির ৬০ শতাংশেরও বেশি মানুষ গৃহহীন। পুনর্গঠনের জন্য ৭১ বিলিয়ন ডলারের বেশি প্রয়োজন হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গত বছরের অক্টোবর থেকে গাজায় একটি তথাকথিত ‘যুদ্ধবিরতি’ কার্যকর থাকলেও ইসরাইল নতুন নতুন এলাকা দখল করে নিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী প্রতিদিন ৬০০ ট্রাক খাদ্য ও সহায়তা গাজায় প্রবেশের কথা থাকলেও বাস্তবে মাত্র ১৫০টি ট্রাক ঢুকতে দেয়া হচ্ছে। সম্প্রতি হামাসকে নিরস্ত্র করার ইসরাইলি দাবি প্রত্যাখ্যান করার পর ইসরাইল আবার পূর্ণমাত্রায় হামলা শুরুর হুমকি দিয়েছে।

সহায়তা বহরের কর্মীদের ওপর নির্যাতন

গাজায় মানবিক সহায়তা পৌঁছে দিতে যাওয়া ‘গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা”-এর আটক কর্মীদের ওপর যৌন সহিংসতা, শারীরিক নির্যাতন ও অপমানজনক আচরণের অভিযোগ উঠেছে ইসরাইলি হেফাজতের বিরুদ্ধে। গত বৃহস্পতিবার বহরটির পক্ষ থেকে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে এসব অভিযোগ তুলে ধরা হয়। খবর আনাদোলু এজেন্সির।

বিবৃতিতে বলা হয়, গত ২৯ এপ্রিল ক্রীট উপকূলের কাছে আন্তর্জাতিক নৌসীমায় ইসরাইলি বাহিনী বহরটির জাহাজগুলো আটক করে। এরপর আটক ১৭৭ জন কর্মীর অনেকেই নির্যাতনের শিকার হন। মুক্তি পাওয়া কর্মীদের সাক্ষ্যে ‘পদ্ধতিগত শারীরিক ও যৌন সহিংসতার’ বর্ণনা পাওয়া গেছে বলে দাবি সংগঠনটির। অভিযোগে বলা হয়, অন্তত চারজন কর্মী যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। দু’জনের ব্যক্তিগত অঙ্গে স্পর্শ করে নির্যাতন চালানো হয়। এ ছাড়া অনেককে অশালীন ভাষা, অপমানজনক আচরণ ও শারীরিক হামলার মুখে পড়তে হয়েছে। সংগঠনটি আরো জানায়, আটক ব্যক্তিদের শীতের মধ্যে গরম কাপড় ছাড়াই রাখা হয় এবং পর্যাপ্ত খাবার, পানি ও বিছানার ব্যবস্থা করা হয়নি। এতে কয়েকজনের শরীরে তাপমাত্রাজনিত জটিলতা দেখা দেয়। এখনো ব্রাজিলীয় কর্মী থিয়াগো আভিলা ও ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত স্প্যানিশ নাগরিক সাইফ আবু কেশেককে মুক্তি দেয়া হয়নি। তারা অনশন চালিয়ে যাচ্ছেন বলেও দাবি করা হয়েছে। গ্লোবাল সুমুদ বহর বলেছে, ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি প্রকাশকারীদের ‘অমানবিক’ করে তুলতেই এমন আচরণ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক মহলের কাছে তারা নিরপেক্ষ তদন্ত ও দায়ীদের বিচারের দাবি জানিয়েছে। ২০০৭ সাল থেকে গাজায় অবরোধ চালিয়ে আসছে ইসরাইল। চলমান যুদ্ধে ৭২ হাজারের বেশি মানুষ নিহত এবং লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন বলে ফিলিস্তিনি সূত্র জানিয়েছে।

পশ্চিমতীরে হামলা

অধিকৃত পশ্চিমতীরে একাধিক সামরিক অভিযানে দুই ফিলিস্তিনিকে আটক এবং অন্তত চারজনকে আহত করেছে ইসরাইলি বাহিনী। গত বৃহস্পতিবার হেবরন, রামাল্লাহ, তুলকারেম ও জেনিনসহ বিভিন্ন এলাকায় অভিযান, গুলি ও হামলা ঘটে বলে জানিয়েছে ফিলিস্তিনি সূত্রগুলো। খবর আনাদোলু এজেন্সির। ফিলিস্তিনি রেড ক্রিসেন্ট জানায়, তুলকারেম শহরের পূর্বে আনাব সামরিক তল্লাশি চৌকির কাছে এক ফিলিস্তিনিকে ইসরাইলি সেনারা মারধর করে গুরুতর আহত করে। পরে তাকে হাসপাতালে নেয়া হয়। ফিলিস্তিনি বার্তা সংস্থা ওয়াফা জানায়, ৩৩ বছর বয়সী ওই ব্যক্তি কাজ করার সময় কয়েক ঘণ্টা আটকে রেখে নির্যাতনের শিকার হন। একই সময়ে তুবাসের উত্তরের আকাবা শহরের এক ফিলিস্তিনিকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডেকে নিয়ে আটক করা হয়। জেনিনের পশ্চিমে বুরকিন গ্রামেও অভিযান চালিয়ে কয়েকটি বাড়িতে তল্লাশি এবং দোকানপাট বন্ধ করে দেয় ইসরাইলি বাহিনী। রামাল্লাহর উত্তরে দেইর দিবওয়ান গ্রামে সংঘর্ষ চলাকালে এক তরুণ গুলিবিদ্ধ হন। স্থানীয় সূত্র জানায়, ইসরাইলি সেনারা কাঁদানে গ্যাস ও শব্দবোমা ছুড়লে সংঘর্ষ শুরু হয়। দক্ষিণাঞ্চলের হেবরনের আল-জাহিরিয়া এলাকায় আরো দুই ফিলিস্তিনি শ্রমিক সেনাদের গুলিতে আহত হন। এ দিকে জাতিসঙ্ঘ জানিয়েছে, চলাচলে কঠোর বিধি-নিষেধের কারণে পশ্চিমতীরে গবাদিপশুর মুখ ও খুর রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। বিশেষ করে যাযাবর ও পশুপালননির্ভর জনগোষ্ঠী খাদ্য ও জীবিকার ঝুঁকিতে রয়েছে। সময়মতো টিকা ও পশুচিকিৎসা সেবা পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে বলেও সতর্ক করেছে সংস্থাটি। ফিলিস্তিনি তথ্যমতে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে পশ্চিমতীরে ইসরাইলি হামলা, অভিযান ও বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতায় অন্তত এক হাজার ১৫৫ ফিলিস্তিনি নিহত, প্রায় ১১ হাজার ৭৫০ জন আহত এবং প্রায় ২২ হাজার মানুষ আটক হয়েছেন।

আল-আকসা প্রাঙ্গণে অনুপ্রবেশ

অধিকৃত পূর্ব জেরুজসালেমের আল-আকসা মসজিদ প্রাঙ্গণে একদল ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারী প্রবেশ করেছে বলে জানিয়েছে জেরুসালেম গভর্নরেট। গত বৃহস্পতিবার ইসরাইলি পুলিশের নিরাপত্তায় এ অনুপ্রবেশ ঘটে। বিবৃতিতে বলা হয়, সাবেক কনেসেট সদস্য ইয়েহুদা গ্লিকের নেতৃত্বে বসতি স্থাপনকারীরা মসজিদ প্রাঙ্গণে প্রবেশ করে। একই সময়ে আল-বুরাক প্রাচীর এলাকায় প্রায় ১০০ সেনার স্নাতক অনুষ্ঠানও আয়োজন করে ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত দৃশ্যে দেখা যায়, ইসরাইলি পতাকা হাতে নিয়ে বসতি স্থাপনকারীরা মসজিদ এলাকায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। আল-বুরাক প্রাচীর মুসলিম ও ইহুদি-উভয় ধর্মাবলম্বীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ স্থান। ফিলিস্তিনি কর্মকর্তারা অভিযোগ করেছেন, কয়েক দশক ধরে পূর্ব জেরুসালেমের আরব ও ইসলামী পরিচয় মুছে ফেলতে ধারাবাহিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরাইল। তাদের মতে, আল-আকসা মসজিদকে কেন্দ্র করেও একই নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে।