নিজস্ব প্রতিবেদক
জাতীয় বাজেটের আকার বড় করার চেয়ে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় রোধ, ঘুষ, দুর্নীতি ও অনিয়ম বন্ধ করে সুশাসন নিশ্চিত করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মন্তব্য করেছেন অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল।
গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে তিনি বলেন, ‘বাজেটের আকার যতই বড় হোক না কেন, কোনো না কোনো কারণে যদি তার ২০ বা ৩০ শতাংশ অর্থই পাচার (সাইফন) হয়ে যায়, তবে সেই বড় বাজেট দিয়ে দেশের খুব একটা লাভ হয় না।’ এ সময় দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান এবং নিজের কার্যালয়ের মিতব্যয়িতা ও সততার উদাহরণ তুলে ধরে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘বাজেটে যে বরাদ্দ দেয়া হয়, সংশ্লিষ্ট সব দফতরের উচিত সততার সাথে এবং ঠিক যতটুকু প্রয়োজন, ততটুকুই খরচ করা।’
অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ের বাজেট সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমি নিজেই প্রতিদিন আমাদের কার্যালয়ের বাজেটের সীমাবদ্ধতা অনুভব করি। অনেক সময় মামলা পরিচালনার খরচসহ বিভিন্ন ব্যয় আমাদের আইন কর্মকর্তারা ব্যক্তিগতভাবে বহন করেন। তা সত্ত্বেও রাষ্ট্রের বৃহত্তর স্বার্থে আমরা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছি।’
অর্থবছরের শেষে তড়িঘড়ি করে বরাদ্দ শেষ করার দীর্ঘ দিনের সরকারি সংস্কৃতি তথা ‘জুন ক্লোজিং’-এর তীব্র সমালোচনা করে তিনি নিজের কার্যালয়ের একটি দৃষ্টান্ত তুলে ধরেন। ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, ‘সরকার যখন কোনো অর্থ বরাদ্দ দেয়, তা নির্দিষ্ট খাতের অধীনে থাকে। আমাদের কার্যালয়ে আসবাবপত্র (ফার্নিচার) কেনার জন্য একটি বাজেট বরাদ্দ ছিল। ৩০ জুনের মধ্যে সেই টাকা খরচ না করলে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যায়। কার্যালয়ের কিছু কর্মকর্তা আমাকে এসে বললেন, ‘স্যার, ৩০ জুনের মধ্যে এই টাকা খরচ না করলে তো বরাদ্দ ফেরত চলে যাবে’। আমি তাদের বললাম, ফেরত গেলে যাক। শুধু বরাদ্দ ফেরত যাবে বলেই কি আমি জনগণের টাকা দিয়ে অপ্রয়োজনীয় আসবাবপত্র কিনব? আমরা ১৯ লাখ টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফেরত দিচ্ছি। আইনগতভাবে আমরা চাইলে এই টাকা নানাভাবে খরচ করতে পারতাম; কিন্তু এই মুহূর্তে আমার অফিসের জন্য ১৯ লাখ টাকার আসবাব কেনার কোনো প্রয়োজন আমি দেখছি না।’
জনগণের অর্থের অপচয় রোধে তিনি নিজে গিয়ে অফিসের আসবাবপত্রের দামাদামি করার একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাও শেয়ার করেন। তিনি বলেন, ‘আমি এখন যে চেয়ারটিতে বসে আছি, সেটির দাম অনেক বেশি ধরা হয়েছিল। আমি নিজেই দোকানে গিয়ে তাদের সাথে কথা বলে দাম কমিয়েছি। এরপর নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে কম দামে সেটি কেনার নির্দেশ দিয়েছি।’ তিনি আরো বলেন, ‘এই টাকা আকাশ থেকে পড়ে না। এগুলো এ দেশের সাধারণ মানুষের কঠোর পরিশ্রম ও ঘামের টাকা। প্রতিটি টাকা দেশের জন্য, মানুষের কল্যাণের জন্য সঠিকভাবে ব্যয় করতে হবে।’
সরকারের উচ্চপর্যায়ের মিতব্যয়িতার উদাহরণ টেনে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘আপনারা দেখেছেন আমাদের প্রধানমন্ত্রী নিজে মাত্র ৮০ বা ৯০ টাকায় দুপুরের খাবার সারেন। আমি নিজে দুইবার এর প্রত্যক্ষ সাক্ষী।’
বিগত সময়গুলোর অনিয়মের সমালোচনা করে দেশের প্রধান আইন কর্মকর্তা বলেন, ‘অতীতে যেভাবে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় ও অপব্যবহার হতে দেখেছি, তেমনটা আর দেখতে চাই না। বাংলাদেশের কোনো নাগরিকই রাষ্ট্রের একটি পয়সাও অপচয় হোক তা আশা করে না। আমরা প্রত্যেকে যার যার অবস্থান থেকে এটি নিশ্চিত করতে চাই। আমাকে এই কার্যালয়ের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে, আমি এখানকার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করব।’
একটি ফ্যাসিবাদমুক্ত, গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের দিকে দেশের নতুন যাত্রা নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে তিনি বলেন, প্রত্যেকে যদি দেশপ্রেম ও সততার সাথে দায়িত্ব পালন করেন, তবে বাংলাদেশের অগ্রগতি বাজেটের আকারের ওপর নয়, বরং তার সঠিক ব্যবহারের ওপর নির্ভর করবে।
হাইকোর্টে বিরতিহীন চলবে শিশু রামিসা হত্যার বিচার
অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো: রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেছেন, হাইকোর্টে বিরতিহীন ভাবে চলবে শিশু রামিসা হত্যা-ধর্ষণ মামলার বিচার। আমরা রাষ্ট্রপক্ষ থেকে মামলা শুনানিতে কোনো মুলতবি আবেদন করব না। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতন মামলা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শুনানির জন্য প্রধান বিচারপতি বিশেষ বেঞ্চ গঠন করেছেন। বিশেষ বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তীর আদালতে আজ রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা হিসেবে বলেছি, আমরা রামিসা হত্যা মামলার শুনানিতে কোনো মুলতবির আবেদন করব না। বিরতিহীনভাবে শুনানি করব।
তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, আগামী রোববার হাইকোর্টের কার্যতালিকায় রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা মামলাটি থাকতে পারে।
আলোচিত এই মামলা হাইকোর্টে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানির জন্য অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজলের নেতৃত্বে বিশেষ টিম গঠন করা হয়েছে। টিমে রয়েছেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার ওসমান চৌধুরী, ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মেহেদী হাসান, ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল জামিউল হক ফয়সাল ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল দেওয়ান হুমায়ুন কবির রিপন।
অ্যাটর্নি জেনারেল নিজেই এ তথ্য নিশ্চিত করে বলেন আমি নিজে হাইকোর্টে রামিসা হত্যা মামলার যুক্তিতর্ক শুনানিতে অংশ নেবো। এ ছাড়া আমাদের টিমের সবাই রামিসা হত্যা ও ধর্ষণ মামলা শুনানির জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করছেন।
অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, হাইকোর্টে বিরতিহীনভাবে চলবে শিশু রামিসা হত্যা-ধর্ষণ মামলার বিচার। আমরা রাষ্ট্রপক্ষ থেকে মামলা শুনানিতে কোনো মুলতবি আবেদন করবো না। রাষ্ট্রের প্রধান কর্মকর্তা বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতন মামলা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শুনানির জন্য প্রধান বিচারপতি বিশেষ বেঞ্চ গঠন করেছেন। বিশেষ বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী মহোদয়ের আদালতে রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা হিসেবে বলেছি, আমরা রামিসা হত্যা মামলার শুনানিতে কোনো মুলতবির আবেদন করবো না। বিরতিহীনভাবে শুনানি করব।
তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, আগামী রোববার হাইকোর্টের কার্যতালিকায় রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা মামলাটি থাকতে পারে।
এর আগে গত ৯ জুন রাজধানীর পল্লবীতে ৮ বছরের শিশু রামিসা ধর্ষণ ও হত্যার দায়ে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি সোহেল রানা ও স্বপ্না আক্তারের মৃত্যুদণ্ড (ডেথ রেফারেন্স) অনুমোদনের নথি হাইকোর্টে আসে। দুই আসামির ফাঁসির রায়ে ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন স্বাক্ষরের পর ডেথ রেফারেন্স হাইকোর্টে পাঠানো হয়। ফৌজদারি কোনো মামলায় আসামির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরে হাইকোর্টের অনুমোদন লাগে, যা ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন) মামলা হিসেবে পরিচিত।



