রয়টার্স
চাঁদের মাটিতে শুধু পা ফেলাই শেষ কথা নয়, এবার লক্ষ্য সেখানে দীর্ঘমেয়াদি বৈজ্ঞানিক উপনিবেশ গড়ে তোলা এবং সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে একদিন লাল গ্রহ মঙ্গলে পাড়ি জমানো। প্রায় ৫৪ বছর পর মানবজাতির এই চন্দ্রবিজয়কে বাস্তবে রূপ দিতে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছে। আগামী দিনের মহাকাশযাত্রার জন্য চার সদস্যের একটি বিশেষ দল ঘোষণা করেছে সংস্থাটি, যাদের অফিসিয়ালি নাম দেয়া হয়েছে ‘পৃথিবীর প্রথম তারকা বহর’।
তবে এই ঘোষণার সাথে সাথে নিজেদের মহাকাশ পরিকল্পনায় বড় ধরনের কৌশলগত রদবদল এনেছে নাসা। অনেকেই ভাবছিলেন ‘আর্টেমিস-৩’ মিশনের মাধ্যমেই মানুষ সরাসরি চাঁদের মাটিতে নামবে। কিন্তু নাসা জানিয়েছে, ২০২৭ সালের এই অভিযানে কোনো চন্দ্রাবতরণ বা লুনার ল্যান্ডিং হচ্ছে না। এটি মূলত একটি জটিল ও মহাগুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষামূলক মহাকাশ মিশন। এই অভিযানে ওরিয়ন মহাকাশযানে চেপে নভোচারীরা প্রায় দুই সপ্তাহ পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে অবস্থান করবেন। সেখানে বিভিন্ন জটিল মহাকাশযান ও আধুনিক প্রযুক্তির মধ্যকার পারস্পরিক সংযোগ এবং পরিচালনা ব্যবস্থা বাস্তব পরিবেশের মুখোমুখি করে নিখুঁতভাবে পরীক্ষা করা হবে। নাসার মূল লক্ষ্য হলো, চূড়ান্ত চন্দ্রাবতরণের পূর্বে ওরিয়নের সাথে বেসরকারি মহাকাশ সংস্থা স্পেসএক্স ও ব্লু অরিজিনের চন্দ্র ল্যান্ডারের কার্যক্ষমতা ও নিরাপদ সমন্বয় নিশ্চিত করা। নাসার বর্তমান পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই অভিযানের সফলতার ওপর ভিত্তি করে ২০২৮ সালে ‘আর্টেমিস-৪’ মিশনের মাধ্যমে অ্যাপোলো-১৭-এর পর প্রথমবারের মতো চাঁদের বুকে মানুষ নামানো হবে।
অভিজ্ঞ মহাকাশচারীদের ‘তারকা বহর’
ঘোষিত এই চার সদস্যের দলটিকে নাসার প্রশাসক জ্যারেড আইজ্যাকম্যান ‘আর্থস ফার্স্ট স্টারফ্লিট’ বা পৃথিবীর প্রথম তারকা বহর হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। এই নামকরণের মাধ্যমে তিনি বার্তা দিয়েছেন যে, বর্তমানের মহাকাশ গবেষণা শুধু কোনো একক রাষ্ট্রের সরকারি গণ্ডিতে আটকে নেই; এটি এখন বৈশ্বিক অংশীদারিত্ব ও বেসরকারি খাতের এক নতুন যুগ।
এই ঐতিহাসিক দলের নেতৃত্বে থাকছেন মার্কিন মেরিন কোরের সাবেক কর্নেল ও অভিজ্ঞ নভোচারী র্যান্ডি ব্রেসনিক, যার মহাকাশে ১৫০ দিনেরও বেশি সময় কাটানোর অভিজ্ঞতা রয়েছে। পাইলট হিসেবে যোগ দিচ্ছেন ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার লুকা পারমিতানো, যিনি আর্টেমিস প্রজেক্টে সুযোগ পাওয়া প্রথম ইউরোপীয়। মিশন বিশেষজ্ঞ হিসেবে থাকছেন ফ্র্যাঙ্ক রুবিও, যিনি মহাকাশে টানা ৩৭১ দিন কাটিয়ে মার্কিন নাগরিক হিসেবে দীর্ঘতম মহাকাশযাত্রার অনন্য রেকর্ড গড়েছেন। আর চতুর্থ সদস্য হিসেবে থাকছেন নবাগত প্রকৌশলী ও রোবট প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ আন্দ্রে ডগলাস, যার কারিগরি দক্ষতা চন্দ্রঘাঁটি পরিচালনায় বিশেষ ভূমিকা রাখবে।
চন্দ্র পোশাকে ইতালীয় ফ্যাশনের কারিগরি
নভোচারীদের জন্য তৈরি নতুন পোশাক বা স্পেসস্যুটে ইতালির বিলাসবহুল ব্র্যান্ড ‘প্রাডা’র যুক্ত থাকার বিষয়টি ইদানীং বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। তবে এটি ফ্যাশনের জন্য নয়, বরং প্রযুক্তিগত প্রয়োজনে। প্রাডা সরাসরি নাসার জন্য পোশাক বানাচ্ছে না। তারা মূলত নাসার মূল ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান ‘অ্যাক্সিয়ম স্পেস’-কে উন্নত সুতা, বিশেষ ফেব্রিক ও উৎপাদন প্রযুক্তির বিষয়ে কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে। এই সমন্বয়ে তৈরি হয়েছে নতুন ‘অ্যাক্সআইএমইউ’ স্পেসস্যুট, যার ভেতরে থাকা জলীয় শীতলীকরণ ব্যবস্থা নভোচারীদের চাঁদের তীব্র তাপমাত্রা, ধুলা ও ক্ষতিকর মহাজাগতিক বিকিরণ থেকে সুরক্ষা দেবে।
চাঁদ পেরিয়ে লক্ষ্য যখন মঙ্গল
২০২৬ সালে আর্টেমিস-২ মিশনে নভোচারীরা চাঁদের চারপাশ ঘুরে নিরাপদে পৃথিবীতে ফিরে আসার পরপরই এই নতুন অভিযানের রূপরেখা স্পষ্ট করা হলো। আর্টেমিস-২ গভীর মহাকাশে মানুষের টিকে থাকার সামর্থ্য প্রমাণ করেছে। আর এখন আর্টেমিস-৩-এর কাঁধে রয়েছে বিভিন্ন মহাকাশযানের পারস্পরিক সমন্বয় প্রমাণের গুরুদায়িত্ব। অ্যাপোলো মিশন যা শুরু করেছিল, আর্টেমিস প্রজেক্ট তা পূর্ণতা দিতে চলেছে। চাঁদের বুকে পা না রাখলেও এই মিশনের সফলতাই নির্ধারণ করবে মানবজাতির পরবর্তী চন্দ্রঘাঁটি এবং মঙ্গল অভিযানের ভবিষ্যৎ রোডম্যাপ।


