নদীর স্রোত যেমন পলি জমিয়ে পুরনো গতিপথ বদলে দেয়, সময়ও তেমনি বদলে দেয় জনপদের চেহারা। কিন্তু বাংলার গত কয়েক দশকের এই পরিবর্তন কেবল রূপান্তর নয়, বরং এক দীর্ঘশ্বাসের নাম। আমাদের গ্রামীণ জনপদ থেকে একে একে হারিয়ে যাচ্ছে হাজার বছরের লালিত সংস্কৃতি, কৃষি উপকরণ আর লোকজ জীবনের প্রতিটি স্পন্দন। যে সোনার সময়ের গল্প আমরা পূর্বপুরুষদের কাছে শুনতাম, আজ তা যান্ত্রিকতার করালগ্রাসে বিলীন প্রায়। আমরা তথাকথিত উন্নয়নের মহাসড়কে উঠেছি ঠিকই, কিন্তু পেছনে ফেলে এসেছি আমাদের আত্মার স্পন্দন- আমাদের লোকজ ঐতিহ্য।
একসময় বাংলার সকাল মানেই ছিল লাঙ্গল-জোয়াল আর মই হাতে কৃষকের মাঠে যাওয়া। কিষাণ আর বলদের সেই মিতালি আজ যান্ত্রিক ট্রাক্টর আর পাওয়ার টিলারের শব্দে ম্রিয়মাণ। ‘কোথায় গেল গরুর গাড়ি, কোথায় গরুর হাল’- এই প্রশ্ন কেবল কবির নয়, বরং এটি একটি মৃতপ্রায় কৃষি সভ্যতার দীর্ঘশ্বাস। একসময় মেঠো পথে গরুর গাড়ির চাকার ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ আর ডিঙ্গি নৌকার রঙিন পালের যে দৃশ্য ক্যানভাসে জীবন্ত ছিল, আজ তা কেবল জাদুঘরের স্থিরচিত্র। আধুনিকতার যান্ত্রিকতা আমাদের শ্রম লাঘব করেছে সত্য, কিন্তু কেড়ে নিয়েছে প্রকৃতির সাথে মানুষের সেই আদিম ও অকৃত্রিম সখ্য।
বাংলাভাষা জীবন থেকে হারিয়ে যাচ্ছে মাটির কলস আর সেই কলসের শীতল পানি। ফ্রিজের কৃত্রিম শীতলতায় আমরা অভ্যস্ত হয়েছি ঠিকই, কিন্তু মাটির কলসের সেই মাটির ঘ্রাণমাখা তৃপ্তি আজ আর নেই। একসময় শিলপাটায় বাটা ঝাল কিংবা কাঠের ঢেঁকিতে ছাঁটা চালের যে পুষ্টি ও স্বাদ ছিল, আজ তা ব্লেন্ডার আর রাইসমিলের যান্ত্রিকতায় কর্পূরের মতো উবে গেছে। গ্রামীণ রমণীদের হাতে বোনা রঙিন শিকা, যা ঘরের শোভা বাড়াত, তা আজ প্লাস্টিকের আধুনিক আসবাবপত্রের ভিড়ে নিখোঁজ। বিয়ে বাড়িতে কলাপাতায় মেজবানি আহার কিংবা গীতের সেই জমজমাট আসর- সবই আজ কমিউনিটি সেন্টারের কৃত্রিমতায় বন্দী।
আমাদের ইকোসিস্টেম বা পরিবেশ থেকেও অনেক পরিচিত মুখ আজ বিদায় নিয়েছে। শকুনের সেই বিশাল ডানা, কাকের সজাগ দৃষ্টি কিংবা রাতের নির্জনতায় শিয়াল মামার ‘হুক্কা হুয়া’ ডাক- সবই যেন রূপকথার গল্প। আধুনিক কীটনাশক আর মোবাইল টাওয়ারের বিকিরণে গ্রামবাংলার এসব প্রাণীকুল আজ বিপন্ন। রাত জেগে হারিকেন বা কুপি জ্বালিয়ে চিঠি লেখার সেই আবেগ ও ব্যাকুলতা আজ ৫ ইঞ্চির স্মার্টফোনের ‘ইনস্ট্যান্ট মেসেজিং’-এ হারিয়ে গেছে। কেরোসিনের গন্ধমাখা হারিকেনের আলো আর নেই, আছে শুধু এলইডি বাল্বের যান্ত্রিক উজ্জ্বলতা, যেখানে আলো আছে কিন্তু মায়া নেই।
বাংলাভাষা ললনার সাজে একসময় ছিল কাঁচের চুড়ি আর রেশমি ফিতার বাহার। হাতে বোনা রুমালের সুতোর কারুকাজে ফুটে উঠত প্রেমের না বলা কথামালা। সেই সৃজনশীলতা আজ ‘রেডিমেড’ বাজারের সস্তা প্লাস্টিকের নিচে চাপা পড়েছে। পালকি বেহারার সেই ‘হুন হুনা হুন’ সুর আজ আর মেঠোপথে প্রতিধ্বনি তোলে না। একসময় কলুর বলদের চোখ বন্ধ করে ঘানি টানার দৃশ্য কিংবা হুক্কা টানার সেই দীর্ঘ আড্ডা-সবই আজ ইতিহাসের অংশ। এই যে বদলে যাওয়া, এটি কেবল উপকরণের বদল নয়, বরং এটি আমাদের চারু ও কারুকলা সংস্কৃতির অপমৃত্যু।
একজন সমাজবিজ্ঞানী হিসেবে আমি যখন দেখি, আমাদের সামাজিক কাঠামোর প্রাথমিক স্তরগুলো ধসে পড়ছে, তখন হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়। প্রবন্ধের সবচেয়ে বেদনাদায়ক অংশটি হলো- ‘সবচেয়ে ব্যথা পাই যখন দেখি কুরআন শিক্ষার মক্তবটা আর নেই।’ মক্তব কেবল ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ছিল না, এটি ছিল সামাজিক সংহতি ও নৈতিকতার হাতেখড়ি। ভোরের আলোয় শিশুদের কুরআন পাঠের যে পবিত্র ধ্বনি গ্রামকে মুখরিত করত, তা আজ আধুনিক কিন্ডারগার্টেনের যান্ত্রিকতায় নির্বাসিত। নৈতিক শিক্ষার এই অভাবই আজ সমাজে বিশৃঙ্খলা ও মূল্যবোধের অবক্ষয়ের অন্যতম কারণ।
যান্ত্রিকতা আমাদের দিয়েছে বেগ, কিন্তু কেড়ে নিয়েছে আবেগ। আমরা এখন অনেক বেশি আধুনিক, কিন্তু অনেক কম মানবিক। আমাদের লাঙ্গল, জোয়াল, পালকি আর মক্তব- এই উপকরণগুলো ছিল আমাদের হাজার বছরের পরিচয়ের স্মারক। এগুলো হারিয়ে যাওয়া মানে আমাদের জাতি সত্তার একটি বড় অংশ পঙ্গু হয়ে যাওয়া। সময় এসেছে আবার শেকড়ের দিকে তাকানোর। আধুনিক বিজ্ঞানের সাথে আমাদের এই লোকজ ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির মেলবন্ধন ঘটাতে না পারলে, আগামীর প্রজন্ম হবে এক শিকড়হীন যান্ত্রিক প্রজন্ম। আমাদের হারানো সেই সোনার সময় আর সোনার মানুষগুলোকে খুঁজে পেতে হলে ফিরে যেতে হবে শুদ্ধাচার আর লোকজ সংস্কৃতির চারণভূমিতে।
লেখক : প্রভাষক সরকারি ইন্দুরকানী ডিগ্রি কলেজ, পিরোজপুর



