বৈধ পথে স্বর্ণ আমদানির জন্য লাইসেন্স দেয়া হলেও তাতে ব্যবসায়ীদের সাড়া নেই। শুধুই লাইসেন্স নিয়ে বসে আছেন, স্বর্ণ আমদানি করছেন না। এজন্য আমলাতান্ত্রিক জটিলতাকে দায়ী করে উৎসাহ হারিয়ে ফেলছেন বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশনসহ খাত সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, নীতিমালায় এমনভাবে কর কাঠামো দাঁড় করানো হয়েছে যাতে স্বর্ণ আমদানি সম্ভব হচ্ছে না। এমন পরিস্থিতিতে প্রত্যাশিত লক্ষ্যমাত্রায় রাজস্ব আদায় করতে পারছে না জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। পরিস্থিতি বলছে নীতিমালা করার পরও থমকে আছে জুয়েলারি শিল্পের বিকাশ। ফলে দেশে স্বর্ণের চোরাচালান, অর্থপাচার ও কালো টাকার বিস্তার না কমে উল্টো দিন দিন বাড়ছে।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বৈধ পথে স্বর্ণ আমদানির জন্য লাইসেন্স দেয়া হলেও আমদানি সামান্য। বরং লাইসেন্স নিয়ে স্বর্ণ আমদানির পরিবর্তে অবৈধ পথে এনে দেশের চাহিদা পূরণ করা হচ্ছে। স্বর্ণ আমদানিতে নিরুসাহিত হওয়ার কারণ হিসেবে তারা বলছেন, আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে আছে স্বর্ণ নীতিমালা। বৈধ পথে স্বর্ণ আমদানি করলে গহনা তৈরিতে যে খরচ হয়, তার চেয়ে কম দামে দেশের বাজারে স্বর্ণের গহনা পাওয়া যায়।
জুয়েলারি ব্যবসায়ীরা বলছেন, স্বর্ণ আমদানির লাইসেন্স দেয়ার পর সবাই আশা করেছিলেন সোনা চোরাচালান কমে আসবে। দেশের চাহিদা পূরণে বৈধ পথে আসবে স্বর্ণ। এনবিআর কর্মকর্তারাও বলছেন, স্বর্ণ আমদানিতে সাড়া নেই। লাইসেন্স দেয়ার পরও চোরা চালানে ভাটা পড়েনি।
বাংলাদেশ জুয়েলারি সমিতির (বাজুস) মুখপাত্র আনোয়ার হোসেন নয়া দিগন্তকে বলেন, বৈধ পথে স্বর্ণ আমদানি করে গহনা তৈরি করতে যে খরচ হয় তার চেয়ে কম দামে দেশের বাজারে পাওয়া যায়। তিনি বলেন, দেশের স্বর্ণ আমদানি নীতিমালা আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় পড়েছে। সরকারের আমলারা অবৈধ পথে স্বর্ণ পরিবহনের সুযোগ তৈরি করে রেখেছেন। এসব কর্মকর্তা দেশের জুয়েলারি ব্যবসায়ীদের মধ্যে লাইসেন্স দেয়ার পরও আমদানি হচ্ছে না।
তিনি বলেন, বর্তমানে লাগেজের আওতায় এক ভরি স্বর্ণ আনলে সরকারকে চার হাজার টাকা শুল্ক দিতে হয়। এদিকে একই ভাবে বৈধ পথে স্বর্ণ আমদানি করলে সব মিলে সরকারকে ৭ হাজার টাকা পরিশোধ করতে হয়। এতে আমাদের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে। তাই ব্যবসায়ীরা আমদানির পরিবর্তে অবৈধ পথে আসা স্বর্ণ দিয়ে তাদের ব্যবসা পরিচালনা করে থাকে।
সাম্প্রতিক এনবিআর চেয়ারম্যান এক অনুষ্ঠানে বলেছেন স্বর্ণ আমদানির জন্য গত দুই বছরে নানাভাবে নীতিসহায়তা দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। যাতে স্বর্ণ আমদানি হয়। এতে চোরাচালান বন্ধ হবে বলে আশা করা হয়েছিল। এনবিআর চেয়ারম্যান বলছেন এখনো স্বর্ণের বড় বড় চালান ধরা পড়ছে। স্বর্ণ চোরাচালান ঠেকানো আমাদের জন্য বিরাট চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্বর্ণ চোরাচালানের সাথে শুধুমাত্র দেশের স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা জড়িত নয়, স্বর্ণ চোরাচালানের নানাবিধ কারণ রয়েছে।
বাজুসের এক কর্মকর্তা নয়া দিগন্তকে বলেন, বিদেশ থেকে বৈধভাবেই কেউ ব্যাগে করে স্বর্ণ আনলে প্রতি ভরিতে ভ্যাট দিতে হয় মাত্র ৪ হাজার টাকা। আর একজন ব্যবসায়ী স্বর্ণ আমদানি করলে ৭ হাজার টাকার ভ্যাট দিতে হয়। এই অসম প্রতিযোগিতার কারণেই দেশে বৈধ পথে স্বর্ণ আমদানি কম হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায় ডিলার লাইসেন্স দেয়ার পর ২০২০-২১ অর্থবছরে ১২টি প্রতিষ্ঠানকে ৩০৬.৭৬ কেজি স্বর্ণ আমদানির অনুমোদন দেয়া হয়। কিন্তু সেই থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের এপ্রিল মাস পর্যন্ত নীতিমালা অনুসরণ করে আমদানি হয়েছে মাত্র ৬০ কেজি স্বর্ণ। এর মধ্যে চলতি অর্থবছরে এখন পর্যন্ত কোনো স্বর্ণ আমদানি হয়নি। লাইসেন্স পাওয়ার ছয় মাসের মধ্যে বৈধভাবে প্রথমবার সোনা আমদানি করেছে ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ড। প্রথম দিকে দুবাই থেকে ১১ হাজার গ্রাম (৯৪৩ ভরি) পাকা সোনা বা ২৪ ক্যারেট সোনার বার এনেছে তারা। লাইসেন্স পাওয়া আরেকটি প্রতিষ্ঠানও সোনা আমদানির জন্য ঋণপত্র (এলসি) খুলেছে। তবে শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠান আমদানি করতে পারেনি।
তথ্যে দেখা যায়, স্বর্ণ আমদানির ডিলারশিপ লাইসেন্স দেয়া হয়েছে একটি ব্যাংকসহ ১৮ প্রতিষ্ঠানকে। লাইসেন্স পাওয়া প্রতিষ্ঠানের তালিকায় আছে বাজুস সাধারণ সম্পাদক দিলীপ কুমার আগরওয়ালার ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ড। এ ছাড়াও আমিন, ভেনাস ও শারমিন জুয়েলার্সের মতো প্রতিষ্ঠানের নাম আছে। আর একমাত্র ব্যাংক হিসেবে রয়েছে বেসরকারি খাতের মধুমতি ব্যাংক।
জানা যায়, দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে বার্ষিক প্রায় ১৫ থেকে ২০ মেট্রিক টন স্বর্ণের চাহিদা রয়েছে। কিন্তু বৈধ পথে আমদানির সুযোগ না থাকায় এর বেশির ভাগ পূরণ হচ্ছে চোরচালানের মাধ্যমে আসা স্বর্ণ দিয়েই। এতে প্রতি বছর বড় অঙ্কের রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার।
এনবিআর কর্মকর্তারা বলেছেন, বাজারে এত এত সোনা, অথচ আমদানি না থাকার উত্তর জানা নেই। উত্তরটা খুঁজতে চান তারা। সোনা চোরাচালানের ৯৯ শতাংশই ধরা না পড়ার কারণ হিসেবে তারা বলছেন, যাত্রীরা যারা বিদেশ থেকে সোনা আনেন, তাদের ব্যাগেজ রুলসের আওতায় কর দিতে হয়। কিন্তু যারা আমদানি করেন, তাদের ক্ষেত্রে কর অনেক বেশি। প্রবাসীরা সোনা নিয়ে আসেন, তাদের ক্যারিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ব্যাগেজ রুলসের অপব্যবহার করা হচ্ছে। ব্যাগেজ রুলস পরিবর্তন করা হবে। যাতে ব্যবসায়ীরা ভালোভাবে ব্যবসা করতে পারেন।
এদিকে বাজুস নেতারা বলছেন, স্বর্ণের ব্যবসা সহজ করতে ৪ বছর আগে আমদানির লাইসেন্স দেয়া হয়। দুই বছর ব্যবসায়ীরা আর্থিক কারণে আমদানি করতে পারেনি। এনবিআরের উচিত করহার কমানো। আমদানি পদ্ধতি সহজ করতে হবে।
আমদানির লাইসেন্স পেতেও তদবির বাণিজ্য হয়েছে উল্লেখ করে বাজুস কর্মকর্তারা বলছেন, প্রকৃত ব্যবসায়ীদের লাইসেন্স দেয়া হয়নি। বৈধ পথে স্বর্ণ আমদানি জন্য ১৮টি প্রতিষ্ঠানকে লাইসেন্স দেয়া হলেও প্রকৃত ব্যবসায়ী মাত্র চার থেকে পাঁচজন, বাকিগুলো তদবিরবাজ। এর মধ্যে ক্রিকেটার সাকিব আল হাসানও রয়েছেন। ওই তদবিরবাজরা কী সোনা আমদানি করবে, তারা স্বর্ণ ব্যবসার কিছু বোঝে না। যারা প্রকৃত ব্যবসায়ী তাদের লাইসেন্স দিতে হবে। জুয়েলারি ব্যবসায়ীরা বলছেন, স্বর্ণ আমদানির প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে। পণ্যের মান নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসটিআইয়ের অনুমোদন পেতেই ১০ থেকে ১৫ দিন লেগে যায়। মান নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে এই সময় আরো কমাতে হবে। এরপর বিমানবন্দর থেকে স্বর্ণ ছাড়াতে হয়। এই প্রক্রিয়ার মধ্যে যদি আবার স্বর্ণের দাম পড়ে যায়, তাহলে ওই ব্যবসায়ীকে লোকসান গুনতে হয়। এজন্য পরিবহনের সময় কমানোর ক্ষেত্রে লাইসেন্সপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান যাতে সরাসরি স্বর্ণ বহন করতে পারে এ ধরনের সুযোগ দিতে হবে।



