হেক্সা স্বপ্ন কি সত্যিই বাস্তবায়ন সম্ভব

Printed Edition

জসিম উদ্দিন রানা

স্বপ্ন, নাকি সতর্কবার্তা? মরক্কোর বিপক্ষে ড্রয়ে প্রশ্নের মুখে ব্রাজিল।

পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল বিশ্বকাপ শুরু করেছিল আকাশছোঁয়া প্রত্যাশা নিয়ে। গ্যালারি-জুড়ে ছিল হলুদ জার্সির ঢেউ, সাম্বা সুরে মুখরিত ছিল পুরো স্টেডিয়াম। কিন্তু খেলা যত গড়িয়েছে, ততই মনে হয়েছে মাঠে যেন ব্রাজিল নয়, নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে নেমেছে মরক্কো। শেষ পর্যন্ত ১-১ গোলের ড্র হলেও ম্যাচের গল্পটা সংখ্যার চেয়ে অনেক বেশি।

ম্যাচের শুরু থেকেই মরক্কো দেখিয়েছে তারা কাতার বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ওঠা দলটি কেবল অতীতের স্মৃতি নয়। তাদের সংগঠিত প্রেসিং, দ্রুত পাল্টা আক্রমণ এবং মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ ব্রাজিলকে বারবার অস্বস্তিতে ফেলেছে। প্রথম ১০ মিনিটেই শটের হিসাবে ৫-১ ব্যবধানে এগিয়ে ছিল অ্যাটলাস লায়ন্সরা। সেই চাপের ধারাবাহিকতায় ২১ মিনিটে ইসমাইল সাইবারি গোল করে মরক্কোকে এগিয়ে দেন। ব্রাজিলের রক্ষণভাগকে এক মুহূর্তে উন্মুক্ত করে দেয়া সেই আক্রমণ ছিল মরক্কোর পরিকল্পিত ফুটবলের নিখুঁত উদাহরণ। যা শিহরণ জাগিয়েছে গ্যালারি ভর্তি পক্ষ-বিপক্ষের দর্শকদের।

বিশেষ করে আশরাফ হাকিমি ছিলেন ব্রাজিলের জন্য এক আতঙ্কের নাম। ডান প্রান্ত দিয়ে তার অবিরাম দৌড়, আক্রমণে অংশগ্রহণ এবং রক্ষণে ফিরে আসার গতি ব্রাজিলের ছন্দ নষ্ট করে দেয়। অনেক সময় মনে হয়েছে এক হাকিমিই যেন পুরো ব্রাজিলকে ব্যস্ত রাখছেন। অন্য দিকে মরক্কোর তরুণ মিডফিল্ডার আয়ুব বুয়াদ্দি মাঝমাঠে এমন কর্তৃত্ব দেখিয়েছেন যে কাসেমিরো-ব্রুনো গিমারাইশদের অভিজ্ঞতাও মøান হয়ে গেছে।

ব্রাজিলের সৌভাগ্য, তাদের দলে এখনো এমন একজন আছেন যিনি এক মুহূর্তে ম্যাচের রঙ বদলে দিতে পারেন। ৩২ মিনিটে ভিনিসিয়াসের অসাধারণ গোল না এলে ম্যাচটি হয়তো ভিন্ন গল্প লিখত। ব্যক্তিগত নৈপুণ্যে করা সেই গোল ব্রাজিলকে শুধু সমতায় ফেরায়নি, সম্ভাব্য লজ্জা থেকেও রক্ষা করেছে। কারণ গোলের বাইরে পুরো ম্যাচে ব্রাজিলের আক্রমণভাগ খুব কম সময়ই নিজেদের নামের প্রতি সুবিচার করতে পেরেছে। মাঝমাঠ থেকে বল ডেলিভারি দেয়া কিংবা দৃঢ় রক্ষণ বলতে কিছুই ছিল না।

আরো উদ্বেগের বিষয় হলো, ব্রাজিলের সমস্যাগুলো নতুন নয়। মাঝমাঠে সমন্বয়ের অভাব, রক্ষণে অবস্থানগত ভুল এবং বল দখলে রেখেও পরিষ্কার সুযোগ তৈরি করতে না পারা, সবকিছুই আবার সামনে এসেছে। দ্বিতীয়ার্ধে কিছুটা নিয়ন্ত্রণ ফিরলেও সেই আধিপত্যকে গোলের সুযোগে রূপ দিতে পারেনি আনচেলত্তির দল। বরং ম্যাচের শেষদিকে গোলরক্ষক অ্যালিসনের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সেভ ব্রাজিলকে পরাজয়ের হাত থেকে বাঁচিয়েছে।

তাহলে প্রশ্ন হলো এমন খেলা খেলে কি হেক্সা সম্ভব?

ফুটবলে একটি ম্যাচ দিয়ে সবকিছু বিচার করা যায় না। বিশ্বকাপ ম্যারাথনে প্রথম ম্যাচে হোঁচট খেয়েও চ্যাম্পিয়ন হওয়ার উদাহরণ আছে। কিন্তু এই ড্র যে ব্রাজিলকে সতর্কবার্তা দিয়েছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। বিশ্বকাপ জিততে হলে শুধু তারকা ফুটবলার নয়, প্রয়োজন সংগঠিত দলগত ফুটবল। মরক্কোর বিপক্ষে ব্রাজিল সেই পরিচয় দিতে পারেনি। বরং মরক্কো দেখিয়েছে আধুনিক ফুটবলে শৃঙ্খলা, গতি ও কৌশল অনেক সময় নামের জৌলুসকে হার মানিয়ে দিতে পারে।

হেক্সার পথ এখনো বন্ধ হয়নি। কিন্তু যদি ব্রাজিলের মাঝমাঠ এমনই নড়বড়ে থাকে, যদি ভিনিসিয়াসের ব্যক্তিগত জাদুর ওপরই ভরসা করতে হয়, তবে ষষ্ঠ বিশ্বকাপের স্বপ্ন বাস্তবায়ন কঠিন হবে। মরক্কোর বিপক্ষে ম্যাচটি হয়তো এক পয়েন্ট এনে দিয়েছে; কিন্তু একই সাথে ব্রাজিলকে বুঝিয়ে দিয়েছে শুধু হলুদ জার্সি পরে সাম্বা নৃত্য করলেই বিশ্বকাপ জেতা যায় না। মাঠে সেটির প্রমাণও দিতে হয়।

যা বললেন ভিনিসিয়াস

দলের পারফরম্যান্স নিয়ে ভিনিসিয়ুস জুনিয়র নিজেও ছিলেন বেশ হতাশ। মাঠের লড়াইয়ে নিজেদের ভুলগুলো স্বীকার করে নিয়ে তিনি জানান, ‘আমার মনে হয় আমরা প্রথমার্ধে খুব বাজেভাবে শুরু করেছিলাম, যা পরিস্থিতিকে অনেক কঠিন করে তুলেছিল। এর ফলে আমাদের গোল হজম করতে হয়েছে। প্রথম ম্যাচের পর ম্যাচে ছন্দে ফেরা সবসময়ই কঠিন; কিন্তু আমাদের উন্নতি করতে হবে এবং প্রতিনিয়ত বিকশিত হতে হবে। কারণ এটি বিশ্বকাপ, এখানে কোনো ম্যাচই সহজ হবে না।’

ম্যাচসেরা হওয়া ভিনিসিয়াস আরো বলেন, ‘আমাদের বলের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরো বাড়াতে হবে, পজেশন ধরে রাখতে হবে এবং এপাশ-ওপাশ থেকে বল মুভ করতে হবে। কারণ অনেক সময় প্রতিপক্ষ রক্ষণে দাঁড়িয়ে থেকে কাউন্টার-অ্যাটাক করার চেষ্টা করে। তবে এ নিয়ে খুব বেশি কিছু বলার নেই; আমাদের কেবল পরিশ্রম করে যেতে হবে কারণ পরের ম্যাচটি খুব কাছেই।’

বিশ্বকাপের মঞ্চে এমন অগোছালো শুরু কি কেবলই প্রথম ম্যাচের জড়তা, নাকি বড় কোনো সঙ্কটের ইঙ্গিত? আনচেলত্তির দলের সামনে এখন একটাই চ্যালেঞ্জ, পরের ম্যাচে নিজেদের সেরা ফর্মে ফিরে আসা।