হাসান মাহমুদ রিপন সোনারগাঁও (নারায়ণগঞ্জ)
নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ে মেঘনা নদী খননের (ড্রেজিং) নামে নিয়মনীতি উপেক্ষা করে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের মহোৎসব চলছে। স্থানীয় প্রশাসনের নজরদারির অভাবে দিন দিন বেপরোয়া হয়ে উঠেছে একটি প্রভাবশালী চক্র। দিনের বেলায় নিয়ম মেনে নদীখননের কথা থাকলেও বাস্তবে রাতের আঁধারে ড্রেজার বসিয়ে অবাধে বালু লুট করা হচ্ছে। অপরিকল্পিতভাবে বালু কাটার ফলে মেঘনা নদীর তীরবর্তী ঐতিহ্যবাহী আনন্দবাজার হাট, মেঘনা এলপিজি ও আমান সিমেন্ট ফ্যাক্টরিসহ বিশাল এলাকা নদীতে বিলীন হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) থেকে মুন্সীগঞ্জের ‘চাকদা ড্রেজিং অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (প্রাইভেট) লিমিটেড’ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেঘনা নদী খননের কার্যাদেশ পায়। নিয়ম অনুযায়ী, দিনের বেলায় অনুমোদিত কাটিং ড্রেজারের মাধ্যমে নদী খনন করে নির্ধারিত স্থানে বালু ফেলার কথা। কিন্তু ইজারাদারেরা সেই নিয়ম মানছেন না। সন্ধ্যা নামলেই নদীর আনন্দবাজার হাট সংলগ্ন এলাকায় শুরু হয় ২০ থেকে ২৫টি শক্তিশালী ড্রেজারের বিকট শব্দ। সারা রাত নদীর তলদেশ থেকে বালু কেটে বাল্কহেডে ভরে তা অন্যত্র বিক্রি করে দিচ্ছে চক্রটি।
অভিযোগ রয়েছে, বিএনপির কেন্দ্রীয় কয়েকজন নেতার মাধ্যমে সোনারগাঁওয়ের ব্যবসায়ী মোমেন সিকদার এই ইজারা পান। পরে স্থানীয় যুবদল নেতা ও পিরোজপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান প্রার্থী মাসুম রানার নেতৃত্বে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট এই খননকাজের নিয়ন্ত্রণ নেয়। এই চক্রে মেঘনা উপজেলার চালিভাঙ্গা ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতি আব্দুল বারেক এবং নলচর গ্রামের রবিউল্লাহ রবিসহ বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের কয়েকজন নেতাকর্মী জড়িত রয়েছেন। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় প্রশাসনকে ম্যানেজ করে তারা এই বালু লুটপাট চালাচ্ছেন। এই সিন্ডিকেটের কারণে হুমকির মুখে পড়েছে আনন্দবাজার, ছনপাড়া, টেকপাড়া, খামারগাঁও ও পূর্ব দামোদরদীসহ বিস্তীর্ণ এলাকা। গত বর্ষায় এই চক্রের বালু কাটার কারণে পিরোজপুর ইউনিয়নের নুনেরটেক গ্রামের প্রায় ৩০টি বসতভিটা নদীতে বিলীন হয়ে গিয়েছিল।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক বাসিন্দা জানান, বালু কাটার ড্রেজারগুলোতে সার্বক্ষণিক অস্ত্রধারী লোকজন পাহারা দেয়। ফলে প্রাণভয়ে স্থানীয় কেউ প্রতিবাদ করার সাহস পায় না। রাতে ড্রেজারের শব্দে ঘুমানো যায় না, আর কথা বলতে গেলে মামলা-হামলার হুমকি দেয়া হয়। পরিবেশ রক্ষা উন্নয়ন সোসাইটির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হোসাইন বলেন, সরকার পরিবর্তন হয়, কিন্তু বালু দস্যুদের দাপট কমে না। আনন্দবাজার হাট শুধু বাণিজ্যকেন্দ্র নয়, এটি এই অঞ্চলের ইতিহাস ও জীবিকার প্রধান অবলম্বন।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নদীপাড়ের এক নারীর কান্নাজড়িত ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। যেখানে তিনি আক্ষেপ করে বলেন, রাতের বেলা ড্রেজার দিয়ে বালু কেটে নেয়ায় আমাদের ঘরবাড়ি সব ভেঙে গেছে। চেয়ারম্যান, মেম্বার, এমপি কিংবা রাজনৈতিক দল; কেউ আমাদের দিকে চেয়ে দেখছে না। আমরা এখন কোথায় যাব, কী খাব? অন্যদিকে, সোনারগাঁও পৌরসভা ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক ফরহাদ সিকদার ফেসবুকে এক পোস্টে উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে লিখেছেন, সরকারি টেন্ডারের কাজ রাতে কেন হবে? ইউএনও এবং ওসির দায়িত্ব কী, তা জনগণকে পরিষ্কার করা উচিত।
অভিযোগের বিষয়ে মোমেন সিকদার বলেন, আমি শুধু কাজ দেখভাল করছিলাম, পরে বিএনপির নেতারা কাজটির নিয়ন্ত্রণ নিয়েছেন। রাতের আঁধারে অবৈধ কাজের দায় আমার না। যুবদল নেতা মাসুম রানা তার সম্পৃক্ততা অস্বীকার করে দাবি করেন, তিনি কেবল বালু কাটার জন্য তার ড্রেজারটি ভাড়া দিয়েছেন। সোনারগাঁওয়ের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও প্রতœসম্পদ সংরক্ষণ কমিটির আহ্বায়ক কবি শাহেদ কায়েস বলেন, দীর্ঘ আন্দোলন শেষে ২০১৪ সাল থেকে এখানে বালু কাটা বন্ধ ছিল। আবারো রাজনৈতিক প্রভাবে বালু উত্তোলন শুরু হওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ।
বিআইডব্লিউটিএ নারায়ণগঞ্জের উপপরিচালক মোবারক হোসেন বলেন, সরেজমিন পরিদর্শনে গিয়ে দেখেছি বর্তমানে মাত্র একটি ড্রেজার বৈধ। রাতে যে বালু উত্তোলন হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ অবৈধ। জড়িতদের বিরুদ্ধে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনায় আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। সোনারগাঁও থানার ওসি গোলাম সারোয়ার জানান, অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে পুলিশের পক্ষ থেকে প্রশাসনকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করা হচ্ছে।
সোনারগাঁও ইউএনও আসিফ আল জিনাত বলেন, বিআইডব্লিউটিএর অনুমতি সাপেক্ষে খনন চলছে। তবে রাতে বালু লুটের বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে। জনবল সঙ্কট ও রাতের বেলা নদীতে অভিযানের কিছু ঝুঁকির কারণে আমাদের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক রায়হান কবির বলেন, রাতের আঁধারে আদালতের নির্দেশ কিংবা নিয়মনীতি অমান্য করে যারা অবৈধভাবে বালু কাটছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।



