নয়া দিগন্ত ডেস্ক
টানা বৃষ্টি, শিলাবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় গাজীপুর, নেত্রকোনা ও ময়মনসিংহের বোরো ধানসহ বিভিন্ন ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। কোথাও কাটা ধানে চারা গজিয়ে নষ্ট হচ্ছে, কোথাও পানির নিচে তলিয়ে গেছে বিস্তীর্ণ ফসলের ধান। শ্রমিক সঙ্কট ও অনুকূল প্রতিকূল আবহাওয়ায় ধান ঘরে তুলতেও হিমশিম খাচ্ছেন কৃষকরা। এতে এই তিন জেলার হাজারো কৃষক চরম অনিশ্চয়তা ও আর্থিক সঙ্কটে পড়েছেন। কৃষি বিভাগ ক্ষয়ক্ষতির কথা স্বীকার করে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা প্রস্তুতের কাজ শুরু করেছে।
গাজীপুর প্রতিনিধি জানান, জেলার বিভিন্ন এলাকায় পানিতে তলিয়ে গেছে পাকা ধানক্ষেত। এ দিকে কেটে আনা ধান শুকাতে না পেরে সেগুলোও পচে যাচ্ছে। জমিতে ডুবে যাওয়া ধানের শীষেও চারা গজিয়ে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এতে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন এ অঞ্চলের কৃষকরা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর জানিয়েছে, এ বছর জেলায় বোরো আবাদ হয়েছিল ৫৮ হাজার ১০ হেক্টর জমিতে, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি। তবে সাম্প্রতিক দুর্যোগে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। শ্রীপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় শিলাবৃষ্টি ও অতিবৃষ্টিতে অন্তত ৯৭ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দক্ষিণ নীলেরপাড়া এলাকার কৃষক সুজন বলেন, তার আবাদে প্রায় অর্ধেক জমির ধানই নষ্ট হয়ে গেছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক মো: রফিকুল ইসলাম খান বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে প্রায় ২০ শতাংশ আবাদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকতে পারে। পূর্ণাঙ্গ জরিপ শেষে প্রকৃত তথ্য জানা যাবে।’ তিনি আরো জানান, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে এবং সরকারিভাবে সহায়তার উদ্যোগ নেয়া হবে।
এ দিকে গাজীপুর-৪ (কাপাসিয়া) আসনের সংসদ সদস্য সালাউদ্দিন আইয়ুবী ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেছেন। তিনি কাপাসিয়ার নলী বিল এলাকায় কোমর পানিতে নেমে স্থানীয়দের সাথে ধান কাটায় অংশ নেন এবং এক হতদরিদ্র কৃষকের প্রায় এক বিঘা জমির ধান কেটে ঘরে তুলতে সহায়তা করেন।
তিনি বলেন, কৃষকরা দেশের অর্থনীতির প্রাণ। দুর্যোগের সময় তাদের পাশে দাঁড়ানো সবারই মানবিক দায়িত্ব।
খালিয়াজুড়ি (নেত্রকোনা) সংবাদদাতা জানান, হাওরাঞ্চল খালিয়াজুড়িতে টানা সাত দিনের বৃষ্টিতে মাঠ থেকে কেটে আনা ভেজা ধানে চারা গজিয়ে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। উপজেলার বিভিন্ন স্কুল-কলেজ মাঠ, মাদরাসা প্রাঙ্গণ, গ্রামীণ সড়ক ও উঁচু স্থানে কৃষকরা ভেজা ধান ও খড় শুকানোর চেষ্টা করছেন। পচা ধানের দুর্গন্ধে অনেক এলাকায় পরিবেশদূষণের অভিযোগও উঠছে।
নূরপুর বোয়ালী গ্রামের কৃষক আহসানুল হক ও মোফাজ্জল মিয়া জানান, তারা প্রত্যেকে প্রায় দুই একর জমিতে বোরো আবাদ করেছিলেন। এর মধ্যে অর্ধেকের বেশি ধান নষ্ট হয়ে গেছে। তারা বলেন, মাঠ থেকে ধান কেটে আনার পরও রক্ষা হয়নি। বৃষ্টিতে ধান ভিজে চারা গজিয়ে গেছে। এখন পরিবার নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, খালিয়াজুড়ির ৮৯টি হাওরে ২০ হাজার ২৩২ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছিল। এর মধ্যে প্রায় ৫৫ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে। তবে বাকি ফসলের বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কাটা ধানের প্রায় ১৫ থেকে ১৮ শতাংশে চারা গজিয়েছে বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো: দেলোয়ার হোসেন বলেন, এটি খুবই দুঃখজনক পরিস্থিতি। টানা বৃষ্টির কারণে কৃষকরা ধান শুকাতে পারছেন না। ভবিষ্যতে ড্রায়ার মেশিন স্থাপন করা গেলে এমন ক্ষতি অনেকটা কমানো সম্ভব হবে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাদির হোসেন শামীম বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তায় সরকারের কাছে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার আবেদন জানানো হবে।
গফরগাঁও (ময়মনসিংহ) সংবাদদাতা জানান, কালবৈশাখী ঝড়, শিলাবৃষ্টি ও কয়েক দিনের টানা বর্ষণে গফরগাঁও উপজেলার ১৫ ইউনিয়ন ও পৌর এলাকার বিস্তীর্ণ জমির বোরো ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। অনেক কৃষক সময়মতো ধান কাটতে না পারায় ক্ষতির মুখে পড়েছেন। শ্রমিক সঙ্কট ও অতিরিক্ত মজুরির কারণেও ধান ঘরে তোলা কঠিন হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ করেছেন কৃষকরা।
কৃষি অফিস জানায়, চলতি মৌসুমে উপজেলায় ২১ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে বোরো ধান ও শাকসবজির আবাদ হয়েছে। তবে অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় ধান, মরিচ, বাদাম ও শাকসবজিসহ বিভিন্ন ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শাকুরা নান্মী জানান, প্রাথমিক হিসাবে অন্তত ২২২ হেক্টর জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি বলেন, এবার বোরো ধানের ফলন ভালো হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু প্রাকৃতিক দুর্যোগে কৃষকদের বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।



